ক্ষমা চাওয়া, দল বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত থেকে কেন সরে এসেছিল জামায়াত
· Prothom Alo

একাত্তরে ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার খসড়া তৈরি হয়েছিল। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা দফায় দফায় বৈঠকও করেছিলেন। কিন্তু কখনো নেতৃত্বের মত পরিবর্তন, কখনো দলীয় কমিটির বিরোধিতা, আবার কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে উদ্যোগ থেমে যায়।
Visit mchezo.life for more information.
জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগগুলোর এমন বিবরণ তুলে ধরেছেন দলটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তাঁর ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ের ‘রিফর্ম অ্যাজেন্ডা উইদইন জামায়াত’ অধ্যায়ে এসব ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। বইটি গত মাসে প্রকাশ করেছে ইউপিএল।
সেখানে তিনি লিখেছেন, ২০১৯ সালে একপর্যায়ে জামায়াতের নির্বাহী কমিটি একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা, দল বিলুপ্ত করা ও নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এর পরপরই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তিনি ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে যান। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত তিনি আর দেশে ফেরেননি। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২০১৯ সালে জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। পরে আত্মপ্রকাশ করা এবি পার্টির প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলেন তিনি। দেশে ফেরার পর ২০২৫ সালের ৪ মে তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান।
বইয়ে আবদুর রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে রুকন হন এবং ১৯৯১ সালের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরায় যোগ দেন। ২০০৩ সালে তাঁকে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল করা হয়। দলটির একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন চেষ্টা করেছিলেন।
গোলাম আযমের ‘দায়সারা’ ক্ষমা প্রার্থনা
বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ২২ জুন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রায় এক বছর আগে, ১৯৯৩ সালের ৪ জুলাই, জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান নিজামীকে চিঠি লিখেছিলেন আবদুর রাজ্জাক। নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পর গোলাম আযমের জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে একাত্তরের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
গোলাম আযমরায়ের পর ২৪ জুন ঢাকার বায়তুল মোকাররমে বিজয় সমাবেশ হয়। গোলাম আযমের বক্তব্য প্রস্তুতে একটি কমিটি করা হয়েছিল। আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, তাঁর যত দূর মনে পড়ে, তিনিও ওই কমিটির সদস্য ছিলেন। গোলাম আযমকে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
রাজ্জাকের মূল্যায়ন ছিল, সুদৃঢ় অবস্থানে থেকে ক্ষমা চাইলে তা আন্তরিক বলে বিবেচিত হতো এবং একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে কঠোর ও তাঁর ভাষায় ‘প্রায়শই অযৌক্তিক’ সমালোচনার অবসান ঘটাতে পারত। গোলাম আযম নীতিগতভাবে প্রস্তাবে একমতও হয়েছিলেন।
কিন্তু সমাবেশে গোলাম আযম কেবল বলেন, ‘অতীতে যদি আমি কোনো ভুল করে থাকি, দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন।’ রাজ্জাকের মতে, গণমাধ্যম মূলত বক্তব্যটি উপেক্ষা করেছিল। তিনি একে বড়জোর দায়সারা ক্ষমা প্রার্থনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে এটি ক্ষমা প্রার্থনাই ছিল না; গুরুতর একটি বিষয় মোকাবিলার অসংলগ্ন চেষ্টা ছিল।
খসড়া তৈরি হলেও ঘোষণা হয়নি
২০০১ সালের অক্টোবরে চারদলীয় জোটের নির্বাচনী বিজয়কে একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলার আরেকটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন আবদুর রাজ্জাক। ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই উদ্যোগ নেওয়ার জন্য দলের ভেতরে তৎপরতা শুরু করেন তিনি।
রাজ্জাক লিখেছেন, একটি বিবৃতির খসড়া তৈরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপক—আফতাব আহমেদ, এম মাহবুবউল্লাহ ও আবদুর রবের সহায়তা নেন। কয়েক সপ্তাহের চেষ্টায় খসড়া তৈরি হয়। এতে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে জামায়াতের অবস্থানের ব্যাখ্যা এবং একাত্তরের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ছিল। পাশাপাশি যুদ্ধকালীন বর্বরতায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকখসড়ার অনুমোদন নিয়ে প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী। উপস্থিত ছিলেন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও এ টি এম আজহারুল ইসলাম। পরে মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি উপকমিটি হয়।
বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, উপকমিটি অন্তত ছয়বার বৈঠক করে। বিজয় দিবসের আগে সংবাদ সম্মেলনের প্রাথমিক সিদ্ধান্তও হয়। মুজাহিদ, কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লা বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে আগ্রহী ছিলেন। তবে আজহারুল ইসলামের আপত্তি ছিল। একটি বৈঠকে মুজাহিদ তাঁকে মৃদু ভর্ৎসনা করেন। শেষ পর্যন্ত আজহারুল ইসলাম আপত্তি থেকে সরে আসেন।
খসড়াটি তৈরিতে প্রতিটি শব্দ ও বাক্য সতর্কতার সঙ্গে বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে লিখেছেন রাজ্জাক। তাঁর স্মরণে, সাতটির বেশি খসড়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত একটি বিবৃতি নিয়ে ঐকমত্য হয়। কিন্তু খসড়া সম্পন্ন হওয়ার পর মুজাহিদ তাঁকে জানান, তাঁর মনে হয়েছে, দলের প্রবীণদের একজনের পরামর্শে নিজামী হয়তো ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে মত পরিবর্তন করেছেন। মুজাহিদ ওই ব্যক্তির নাম বলেননি; রাজ্জাকও বিস্তারিত জানতে চাননি।
১৬ ডিসেম্বর পেরিয়ে গেলেও ঘোষণা আসেনি। রাজ্জাক আশা করেছিলেন, ২০০২ সালের ২৬ মার্চের আগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেটিও হয়নি। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, নিজামী মত পরিবর্তনের কারণ জানাননি। বরং বিষয়টি দলের ৩৫ থেকে ৪০ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটিতে তোলার কথা বলেন।
কণ্ঠভোটে প্রত্যাখ্যান
খসড়া তৈরির চার বছর পর, ২০০৫ সালের অক্টোবরে, বিষয়টি ওয়ার্কিং কমিটিতে ওঠে। রাজ্জাক লিখেছেন, সেখানে তিনি যুক্তি দেন, কোনো দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে—বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির নেই। বাংলাদেশে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে হলে জামায়াতকে একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে।
কিন্তু তাঁর প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রত্যাখ্যাত হয়। রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধিতা এত প্রবল ছিল যে সমর্থকেরা ভীত হয়ে নীরব হয়ে যান এবং নতিস্বীকার করেন।
বিরোধীদের কেউ যুক্তি দেন, জামায়াত মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে ছিল; এতে ভুল ছিল না। কারও যুক্তি ছিল, ভারতের আধিপত্যের আশঙ্কা থেকেই ওই অবস্থান এবং ইতিহাস তাঁদের কাজের যথার্থতা প্রমাণ করেছে। আবার কেউ বলেন, ক্ষমা চাইলেও আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা তা গ্রহণ করবে না।
দুই জ্যেষ্ঠ সদস্যের বক্তব্য তাঁকে বিশেষভাবে বিচলিত করেছিল বলে লিখেছেন রাজ্জাক। সাবেক এক সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমরা ক্ষমা চাইলে পাকিস্তান আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হবে।’ জামায়াতের শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন প্রধানের বক্তব্য ছিল, বিষয়টি বছরে দুবার—মার্চ ও ডিসেম্বরে—আলোচনায় আসে, পরে মিলিয়ে যায়। এটি নিয়ে ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচনা সময়ের অপচয়।
পাকিস্তান অসন্তুষ্ট হওয়ার যুক্তি সম্পর্কে রাজ্জাক লিখেছেন, পরবর্তী ঘটনাবলি তাঁকে নিশ্চিত করেছে যে ওই মূল্যায়ন সঠিক ছিল না।
একাত্তর নিয়ে প্রশ্ন, সিদ্ধান্তহীনতা
২০০৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১০ সালের জুনে নিজামীসহ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার আগপর্যন্ত ওয়ার্কিং কমিটি ও নির্বাহী কমিটিতে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়। রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এসব বৈঠকে তিনি বারবার প্রশ্ন তোলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন করা জামায়াতের জন্য রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সঠিক ছিল কি না। সঠিক মনে করলে দলকে তা প্রকাশ্যে বলতে হবে; অন্যথায় নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
রাজ্জাক লিখেছেন, একাত্তর নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ায় ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতের নেতৃত্বকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতাদের বিচার প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।
বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে জামায়াতের মজলিশে শুরার সর্বশেষ উন্মুক্ত অধিবেশন হয় ২০১১ সালের জুলাইয়ে, মগবাজারের আল-ফালাহ ভবনে। সেখানে রাজ্জাক আবারও একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন। বিশেষ করে তরুণ সদস্যদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অধিবেশনে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্যোগ না নিয়েও যদি আমরা আমাদের দুই নেতার গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়াতে পারি, তাহলে এটি নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ কী?’ রাজ্জাকের মতে, গুরুতর বিষয়টি মোকাবিলার যথাযথ পন্থা এটি ছিল না।
নতুন নেতৃত্বেও থেমে যায় উদ্যোগ
বইয়ে আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, ২০১৬ সালে নেতাদের ফাঁসি কার্যকরের পর জামায়াতে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়। নতুন আমির নির্বাচিত হওয়ার পর একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং একটি কমিটি করা হয়। দলের সেক্রেটারি জেনারেল তাঁকে বিবৃতির খসড়া তৈরি করতে বলেন।
কয়েকজন ঘনিষ্ঠজন ও জামায়াতের তৎকালীন বিদেশি আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের সহায়তায় রাজ্জাক সংক্ষিপ্ত একটি খসড়া প্রস্তুত করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ছিল। পাশাপাশি জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে এবং রাষ্ট্র ও দেশের স্বার্থবিরোধী কাজে জড়ায়নি—এমন দাবি ছিল। দল বা তার নেতা-সদস্যদের যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্টতাও অস্বীকার করা হয়েছিল।
২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর আমিরকে ব্যক্তিগত চিঠি লিখে উদ্যোগটির প্রশংসা করেন রাজ্জাক। কমিটির সদস্যদের চিঠির অনুলিপিও দেন। তবে সেবারও উদ্যোগ এগোয়নি।
রাজ্জাকের মূল্যায়ন, যতবার ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ততবার জামায়াতের কাঠামোর ভেতরের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করে দলকে পিছিয়ে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নতুন আমিরও বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেননি। অতীতের মতো তা আবারও হিমঘরে চলে যায়।
দল বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসে
২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পরামর্শ চান। রাজ্জাক লিখেছেন, ওই সময় তিনি জানতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া আইনজীবীরা জামায়াতকে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি সরকার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার কথা বিবেচনা করছে বলে খবর আসে।
২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারির মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে—এমন গুঞ্জনের মধ্যে জামায়াতের নির্বাহী কমিটি জরুরি বৈঠক করে। রাজ্জাকের বর্ণনা অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত হয়, দল একাত্তরের বিষয়টি মোকাবিলা করবে, নিজেদের বিলুপ্ত করবে এবং এরপর নতুন দল গঠন করবে।
সেক্রেটারি জেনারেল তাঁকে ক্ষমা প্রার্থনার খসড়া ও দল বিলুপ্তির প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেন। ক্ষমা প্রার্থনার খসড়া আগে থেকেই থাকায় তিনি আইনজীবী দলের সহায়তায় দ্রুত দল বিলুপ্তির প্রস্তাব তৈরি করেন।
এরপর শুরা সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৩০০ সদস্যের নিয়মিত অধিবেশন করা সম্ভব হয়নি। ছোট ছোট দলে বৈঠকের মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ সদস্যের মতামত সংগ্রহ করা হয়। রাজ্জাক লিখেছেন, তাঁকে পরে জানানো হয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দল বিলুপ্তির পক্ষে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
কিন্তু ২১ জানুয়ারি জামায়াত নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবিত বিল মন্ত্রিসভায় ওঠেনি। রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর নির্বাহী কমিটি বৈঠকে বসে সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্ত নেয়—ক্ষমা চাওয়া হবে না, দলও বিলুপ্ত করা হবে না। এর পরপরই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র পাঠান।
‘সবচেয়ে বড় দুর্বলতা’
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার নিয়েও বইয়ে মূল্যায়ন রয়েছে। রাজ্জাক লিখেছেন, শফিকুর রহমান শান্ত, আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাপূর্ণভাবে গণমাধ্যমের প্রশ্ন সামলেছেন। কিন্তু অর্ধশতাব্দীর বেশি আগে পূর্বসূরিদের ভূমিকা নিয়ে বর্তমান জামায়াতের সুস্পষ্ট নীতি না থাকায় তাঁর উত্তরগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
আবদুর রাজ্জাকের মূল্যায়ন, ‘জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা এখনো তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।’ তিনি লিখেছেন, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই দশকে একাত্তরের বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের জন্য অর্ধডজনের বেশি বিবৃতি তৈরিতে সহায়তা করেছেন। কিন্তু সেগুলোর একটিও প্রকাশ করা হয়নি।