চীন যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে দিতে চায়

· Prothom Alo

চলতি বছর চীনের কূটনৈতিক দিনপঞ্জির দিকে তাকালেই তাদের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রভাবের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, জর্ডানসহ বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক দেশের শীর্ষ নেতারাই বেইজিং সফর করেছেন।

Visit sportbet.rodeo for more information.

সম্প্রতি কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি বেইজিং সফর করেন। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলও চীন সফর করেছে। এসব সফর মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের প্রভাব ও পরিধি বৃদ্ধির বিষয়টিই নিশ্চিত করে।

ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা বজায় রেখে চলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে এই অঞ্চলে প্রতিযোগিতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা বাড়ার অর্থ এই নয় যে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে। বেইজিং মূলত বাণিজ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশীদারত্বের মাধ্যমে এগোচ্ছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক স্বার্থের সঙ্গে একদম মানানসই।

মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তাচাদর ফালাফালা, বাদশাহ-আমিরদের কী হবে

চীন কি মার্কিন মডেল অনুসরণ করতে চায়

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব এখনো সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে সামরিক দিক থেকে। ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, অস্ত্র সরবরাহ, নৌশক্তি এবং সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলের নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ হিসেবে রয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির মাপকাঠিতে চীনের সঙ্গে নিজের ক্ষমতার তুলনা করে আসছে। সে হিসেবে দেখলে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়া চীনের জন্য এখনো সুদূরপরাহত। তবে কৌশলী সাফল্যের পরিমাপের জন্য এটি ভুল মাপকাঠি।

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে চীনের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়নি। কারণ, এ অঞ্চলে ওয়াশিংটন যে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে রেখেছে, চীন মূলত তার প্রত্যক্ষ সুবিধা ভোগ করেছে।

কয়েক দশক ধরে মার্কিন নৌবাহিনী যে সমুদ্রপথ সুরক্ষিত রেখেছে, সেই পথ দিয়েই উপসাগরীয় জ্বালানি এশিয়ার বাজারে পৌঁছেছে। মার্কিন সামরিক শক্তির ফলে এই অঞ্চলে যে স্থিতিশীলতা বজায় ছিল, তারই সুযোগ নিয়ে চীনা কোম্পানিগুলো নিশ্চিন্তে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ ও জ্বালানি কেনাবেচা করতে পেরেছে।

চীন যে সাত কারণে ইরানের হয়ে যুদ্ধে জড়াবে নাইরান যুদ্ধে চীনের চুপ থাকার রহস্য কী

চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এ এক চমৎকার ব্যবস্থা—খরচ সামান্য, কিন্তু লাভ বিপুল। যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় নিজেকে নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী হিসেবে বসাতে গেলে চীনকে বিশাল রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক ঝুঁকি নিতে হতো, যা দেশটির স্বার্থের সঙ্গে মেলে না।

তাই চীন সামরিক খাতের দিকে না গিয়ে সেসব জায়গায় দৃষ্টি দিয়েছে, যেখানে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভাব শক্ত করতে পারে। তারা চায়, নিরাপত্তা খাতের জন্য ওয়াশিংটন যতটা অপরিহার্য, অর্থনৈতিক খাতের জন্য বেইজিং যেন ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজ উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবকাঠামো ও বন্দরগুলোতে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের খলিফা বন্দরের সিএসপি আবুধাবি টার্মিনাল পরিচালনাকারী যৌথ উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণকারী মালিকানা রয়েছে চীনের সিওএসসিও শিপিং পোর্টসের।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, ম্যানুফ্যাকচারিং, লজিস্টিকস, ইলেকট্রিক যানবাহন ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো যেসব খাত এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে, চীনা কোম্পানিগুলো সেগুলোতেও দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।

বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্টহাউসে চীন-আরব দেশগুলোর সহযোগিতা ফোরামে সম্মেলন। ৩০ মে, ২০২৪

ফাইন্যান্সিং, চুক্তি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাগুলো যখন একবার জড়িয়ে যায়, তখন সেখান থেকে নাম প্রত্যাহার করা বেশ কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। যুদ্ধজাহাজ সহজেই বন্দর ছেড়ে চলে যেতে পারে কিংবা সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে আনা যায়; কিন্তু বন্দর, কারখানা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া স্বার্থ এত সহজে ছেঁটে ফেলা সম্ভব নয়।

চীনের এই কৌশলে উপসাগরীয় সরকারগুলোকে সম্পূর্ণ চীনপন্থী হতে হয় না। বেইজিংয়ের চাওয়া কেবল একটাই—কোনো দেশ যেন তাদের বিরোধী অবস্থান না নেয়। কারণ, সে অবস্থান নেওয়ার অর্থনৈতিক মূল্য হবে অত্যন্ত চড়া।

মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এখন ভেবে দেখা উচিত, তাঁরা কীভাবে তাঁদের আন্তর্জাতিক প্রভাবের পরিমাপ করবেন। এখন মূল প্রশ্ন এটি নয় যে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোনো দেশের কটি সামরিক ঘাঁটি আছে; বরং প্রশ্ন হলো, আঞ্চলিক ব্যবস্থা থেকে সেই দেশকে সরিয়ে দেওয়া কতটা কঠিন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব কৌশল

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য দুই পরাশক্তির সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার একদিকে যেমন মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতা ও উন্নত পশ্চিমা প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে চীনের বাজার, শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও এশীয় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায়।

তাদের মূল লক্ষ্য হলো কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না থাকা। বহুমেরুর বৈশ্বিক ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে তারা অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও কৌশলগত স্বাতন্ত্র্যের পথ বেছে নিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে নানা উত্তেজনার ফলে প্রণালিগুলোতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া কিংবা কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তাহীনতা দেখিয়ে দিয়েছে, কেন এই ভারসাম্যমূলক কৌশল এত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট কোনো একটি নিরাপত্তা প্রদানকারী দেশ, রপ্তানিবাজার, পরিবহনপথ, প্রযুক্তি কিংবা মূলধনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেকোনো দেশের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আধিপত্যকে ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা দেখা গেছে

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বাণিজ্য ও অংশীদারত্বের এই বহুমুখীকরণ মূলত কোনো পছন্দ নয়; বরং একধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা। তারা এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাবের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনই শেষ কথা নয়।

জ্বালানি খাতের বাইরে নিজেদের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন খাত, নবায়নযোগ্য শক্তি ও লজিস্টিকসের ওপর জোর দিচ্ছে।

সৌদি আরবের ‘হুমেইন’ কিংবা আমিরাতের ‘জি৪২’-এর মতো উদ্যোগগুলো এআই প্রযুক্তিতে তাদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এসব প্রযুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিশ্বমানের চিপ, ডেটা সেন্টার, জ্বালানি, কম্পিউটিং অবকাঠামো, মূলধন ও দক্ষ মানবসম্পদ।

এই বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি গড়ার পথে যারা প্রয়োজনীয় মূলধন, প্রযুক্তি ও শিল্প অংশীদারত্ব দিতে পারবে, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের সঙ্গেই হাত মেলাচ্ছে।

ইরান সদস্য, তবু ইরান যুদ্ধেই কেন নীরব ব্রিকস

উপস্থিতি আর প্রভাব এক কথা নয়

মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এখন ভেবে দেখা উচিত, তাঁরা কীভাবে তাঁদের আন্তর্জাতিক প্রভাবের পরিমাপ করবেন। এখন মূল প্রশ্ন এটি নয় যে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোনো দেশের কটি সামরিক ঘাঁটি আছে; বরং প্রশ্ন হলো, আঞ্চলিক ব্যবস্থা থেকে সেই দেশকে সরিয়ে দেওয়া কতটা কঠিন।

নিরাপত্তাচুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও কূটনৈতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

চীন সেখানে ভিন্ন ধাঁচের একটি ভিত্তি তৈরি করছে। বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে এমন দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে উঠছে, যা সাধারণ বাজার পরিস্থিতি বজায় রেখেও গভীর রাজনৈতিক প্রভাবে রূপ নিতে পারে।

সব খাতেই উপসাগরীয় দেশগুলোকে চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো একজনকে বেছে নিতে বাধ্য করার প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের নেই। অবশ্য উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, এআই, টেলিযোগাযোগ, স্পর্শকাতর তথ্য ও দ্বিমুখী ব্যবহারের প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ রয়েই যায়। সেসব খাতে স্পষ্ট সুরক্ষাকবচ থাকা প্রয়োজন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে চীনের সঙ্গে সামরিক নয়; বরং গঠনমূলক প্রতিযোগিতা করা। উন্নত প্রযুক্তি, বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন এবং শক্তিশালী শিল্প অংশীদারত্বের প্রস্তাব নিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরে বড় ভূমিকা রাখা যুক্তরাষ্ট্রের উচিত।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা আর সব খাতেই আধিপত্য বজায় রাখার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয় না।

  • খালিদ আল-জাবের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর নির্বাহী পরিচালক। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

Read full story at source