হানিফের কিসমত

· Prothom Alo

হানিফ গরুটা বিক্রি করেছিল ৬০ হাজার টাকায়। প্রায় আড়াই বছর গরুটাকে পুষেছে সে। হানিফই ছিল একাধারে গরুটার মালিক, মা ও বাবা। দাম খারাপ পায়নি। ৪৫ হাজার টাকার ঋণ পরিশোধের বেড়াছেঁড়া মিটিয়ে যে ১৫ হাজার টাকা হাতে ছিল, বসে বসে মচমচিয়ে দুই মাস খরচ করেছে সে ছেলেমেয়ে আর বউকে নিয়ে। ঘরে চাল যেটুকু ছিল, গেল ফুরিয়ে।

ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে পুতুল চালের ড্রাম পর্যবেক্ষণ করে এসে বাবাকে বলল, ‘বাবা, আর তো এইদুলা চাউল আছে। আমরা ভাত খামু কিবায়?’

Visit afnews.co.za for more information.

হানিফ অনেক খুশি হলো। মেয়েটা তার লক্ষ্মী। এইটুকু ছোট্ট আবু, অথচ সংসার নিয়ে ভাবছে। সুখের সৌরভে তার বুক ভরে গেল। মনে মনে হানিফ সিদ্ধান্ত নিল, আবার গরু কিনে পালবে। পুতুলের মুখে পরিবার নিয়ে চিন্তা ও উদ্বেগ হানিফের কাছে আল্লাহ পাকের বিশেষ নিয়ামত হিসেবেই মনে হলো।

মেয়ের প্রশ্নের জবাবে নরম গলায় সে বলল, ‘আমি তরারে খাওয়াইতে পারবাম নারে মা; আল্লাই তরারে খাওয়াইব।’

পুতুল ক্লাস ওয়ানে পড়ে। বাবার এসব গ্রাম্য দার্শনিকতা বোঝার বয়স তার হয়ে গেছে। মেয়েটি খুব কষ্ট করে স্কুলে ক্লাস করে। এক অনতিক্রম্য বিড়ম্বনার ভেতর সে লেখাপড়া শেখে। স্কুলের শিক্ষক এবং বাচ্চারা তাকে হাটকালা ডাকে।

আরও কম বয়সে এক দাওয়ার সময় ওর কানের ভেতর একটা পাকা ধান ঢুকে গিয়েছিল। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পর ডাক্তাররা ওর কানে ইনজেকশন সিরিঞ্জের মাধ্যমে তীব্র বেগে পানি স্প্রে করে ধানটা ঠিকই বের করতে পেরেছিল, কিন্তু পুতুলের কানের ভেতর রয়ে যায় একবিন্দু জল। এতে মেয়েটা এক কানে শুনতেই পায় না।

হানিফ এবার অবশ্য মেয়ের চিকিৎসা করিয়েছে নেত্রকোনার বড় একজন কানের ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার পুতুলের কানের ভেতর একটা যন্ত্র বসিয়েছে। এতে মেয়েটা মনে হচ্ছে কানে শুনতে পাচ্ছে।

অঙ্কে মাথা ভালো তার। যোগ-বিয়োগ সে নির্ভুলভাবে করতে পারে। হানিফের মনে পড়ে, ছেলেবেলায় সে অঙ্কে বেশ ভালো ছিল। বিশেষ করে যোগ-বিয়োগ তার ভুল হতো না। এখনো হানিফ হাতে–কলমে বড় বড় অঙ্কের হিসাব ও যোগ-বিয়োগের কাজ করতে পারে। তবে ক্যালকুলেটর ছাড়া সে গুণ ও ভাগ করতে পারে না।

ভেবে খুশি হয় সে, মেয়েটাও তার মতো গণিতে ভালো। গর্বে হানিফের বুকের ভেতরে একটা চিলিক দিয়ে ওঠে। মনে মনে সে আরেকটা সিদ্ধান্ত নেয়। মেয়েটাকে লেখাপড়া শেখাবে। যত দূর সম্ভব পড়াবে। ভালো ভালো স্কুল-কলেজে পড়াবে। ভার্সিটির স্টুডেন্ট বানাবে।

ঘরের চাল যেদিন শেষ হলো, হানিফের ছেলে আড়াই বছরের আবদুল তার কাছে এসে বারবার বলতে লাগল, ‘আব্বা বিলো যাই। আব্বা বিলো যাই।’

হানিফ ছেলের কণ্ঠস্বরে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন খুঁজে পেয়ে সচকিত হয়ে দাঁড়ায়। কিসমতে আজ কী আছে যাচাই করতে ইচ্ছে করে তার। হানিফ বিলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

কর্ম থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থেকে প্রায় দুই মাস পর হানিফ মাছ ধরতে রুপসা বিলে নামছে। শতসহস্র শাপলা আর পদ্ম ফোটা এই বিরাট বিলটিই তার অন্নদাতা। বিলের ভেতর হানিফের পাঁচটি মাছের খৈন আছে। মূলত মাছ ধরেই সংসার চালায় সে।

হানিফদের উঁচু ভিটা থেকে নামলেই ধানখেত। তারপর খাল। খাল পেরিয়ে অনেক দূর হাঁটলে তবে বিল। হানিফের বাবা মোতালেব এই বিলেই মাছ ধরত। বিলে কীভাবে মাছ শিকার করতে হয়, সে বিদ্যা সে তার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছে। সরকারি খাসজমিতে মাছের অভয়াশ্রম বা খৈনগুলো সে পৈতৃক সূত্রেই পেয়েছে।

কত রকম মজার মজার মাছ আছে যে এই বিলে! শোল, বোয়াল, রুই, কাতলা, কালবাউশ, কই, পুঁটি, টেংরা। আহা! কী যে দারুণ স্বাদ তরতাজা এসব বিলের মাছের। এই গ্রামে হানিফের মতো অল্প লোকই আছে, বউ-বাচ্চার পাতে নিয়মিত অন্তত একটু মাছ তুলে দিতে পারে। সবাই তো আর তার মতো বিলের খেলোয়াড় নয়।

হানিফের ধানের জমি আছে আট কাঠা। এর মধ্যে পাঁচ কাঠা রেন্টে দেওয়া। এ বছরের মধ্যে এই পাঁচ কাঠা জমি উদ্ধারের চিন্তা রয়েছে তার। বাকি ৩ কাঠা জমির ধান দিয়ে ছয় মাসের খোরাকি চলে। তারপরই শুরু হয় চাল কেনার পালা। পাঁচ কাঠার জমিটা ছুটিয়ে ফেলতে পারলে হানিফ তার পরিবারের সারা বছরের খোরাকির ধান রেখে কিছু বিক্রিও করতে পারবে।

বিলে মাছ পেল না, তবু যা পেল, তাতে তার ১০০ টাকা রোজগার হলো। ৫০ টাকায় ১ কেজি চাল কিনে বাকি ৫০ টাকায় নিজের বিড়ি আর ছেলেমেয়ের জন্য মজা কিনে একজন সুখী মানুষের মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে বেশ প্রসন্ন মনে বাড়ি ফিরল সে।

রাতে, দশটার দিকে বিলে গিয়ে দেখে বড়শিতে মাছ লেগেছে। একটা বড় শোল মাছ, দাম ৪৫০ টাকা হবে। পাশের আরেক বড়শিতে আরেকটা ছোট শোল, ৫০ টাকা হবে। ছিপ দিয়ে সে পুঁটি ধরল ৩৫টি।

রাতে ১২টার দিকে ঘরে ফিরে একটা চমৎকার ঘুম দিয়ে ফজরের সময় আবার বিলে চলে এল হানিফ। এসে দেখে একটা বোয়াল লেগেছে। এক কেজি ওজন হবে। পাশের বড়শিগুলোতে আরও তিনটা শোল।

দুইটা শোল মাছ খাওয়ার জন্য বাড়িতে রেখে বাজারের দিকে ছুটল হানিফ। শুধু বোয়ালটাই বিক্রি হলো ৭৫০ টাকায়। অবিকল নিজের বড় মামির মতো দেখতে বেঁটেখাটো একজন মহিলার কাছে হানিফ মাছটা বিক্রি করল।

কেনার সময় মহিলা বলছিলেন, ‘একটা পলিথিনে দেও বাবা। আমি জ্যাতা মাছ ছাড়া কিনি না।’

হানিফ হাসিমুখে একটা পলিথিনে মাছটা ঢুকিয়ে দেয়।

Read full story at source