চেরনোবিলের যে রাত বদলে দিয়েছিল পারমাণবিক ইতিহাস

· Prothom Alo

রাত তখন গভীর। ইউক্রেনের ছোট্ট শহর প্রিপিয়াতের বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে। শহরটি তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি আধুনিক, পরিকল্পিত শহর; স্কুল, হাসপাতাল, দোকান ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করা হাজারো মানুষের ব্যস্ততায় গড়ে ওঠা। শহরের বাইরে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অবশ্য তখনো কাজ চলছে। ৪ নম্বর রিঅ্যাক্টরে একটি পরীক্ষা চলছিল। কেউ তখনো জানত না, কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে এমন একটি বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে, যার তেজস্ক্রিয় ছাপ শুধু একটি শহর বা একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বাতাসের সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়বে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে।

Visit milkshake.it.com for more information.

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলের সেই রাত শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে। চেরনোবিল দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টর ধ্বংস হয়, বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে লাখো মানুষের জীবন বদলে যায়। জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির মূল্যায়নে, দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৩০ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে এবং ১০০–এর বেশি মানুষ বিকিরণজনিত আঘাত পান।

কিন্তু সেই রাতের গল্প শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউক্রেনে, প্রিপিয়াত শহরের কাছে। কেন্দ্রটিতে আরবিএমকে–১০০০ ধরনের রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হতো। ৪ নম্বর ইউনিটটি ১৯৮৩ সালে চালু হয়। ১৯৮৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সেখানে একটি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাইরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে টারবাইন ঘুরতে থাকা অবস্থায় তার জড়তা থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ কিছু সময়ের জন্য জরুরি পাম্প ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালাতে পারবে কি না, সেটি পরীক্ষা করা। পরীক্ষাটি নিজে অস্বাভাবিক কোনো বিষয় ছিল না। সমস্যা তৈরি হয় পরীক্ষাটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং রিঅ্যাক্টরের কিছু নকশাগত দুর্বলতার কারণে। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, দুর্ঘটনাটিকে শুধু অপারেটরদের ভুল বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। আইএইএর পরবর্তী আইএনএসএজি–৭ বিশ্লেষণে রিঅ্যাক্টরের নকশাগত ত্রুটি, বিশেষ করে উচ্চ পজিটিভ ভয়েড কোএফিশিয়েন্ট ও কন্ট্রোল রডের নকশার সমস্যা, দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে বাষ্পের পরিমাণ বাড়লে শক্তি কমার বদলে আরও বাড়তে পারত।

২৫ এপ্রিল রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ধীরে কমিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডের চাহিদার কারণে পরীক্ষাটি কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে যায়। ফলে অপারেটরদের একটি দল অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর পরীক্ষাটি চালানোর প্রস্তুতি নেয়। এ সময় রিঅ্যাক্টরের অবস্থা আগের পরিকল্পনার তুলনায় জটিল হয়ে ওঠে। রিঅ্যাক্টরের শক্তি কমিয়ে একটি নিম্ন পর্যায়ে আনা হলে সেটি প্রত্যাশার মতো স্থিতিশীল থাকেনি। রিঅ্যাক্টরের ভেতরে জেনন পয়জনিংয়ের মতো প্রক্রিয়াও শক্তি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। শক্তি ধরে রাখতে অপারেটররা অনেক কন্ট্রোল রড বের করে আনেন। এর ফলে রিঅ্যাক্টরের নিরাপদ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেটিং রিঅ্যাকটিভিটি মার্জিন বা ওআরএম খুব কমে যায়। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, এই সীমা ও এর গুরুত্ব অপারেটরদের কাছে যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না এবং সেই সময়কার নকশা ও নির্দেশনায়ও গুরুতর দুর্বলতা ছিল।

তারপর আসে সেই কয়েক সেকেন্ড, যা ইতিহাস বদলে দেয়। ২৬ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা ২৩ মিনিটের দিকে পরীক্ষা শুরু হয়। টারবাইনের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমতে থাকায় পানির প্রবাহ ও রিঅ্যাক্টরের ভেতরের পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। আরবিএমকে রিঅ্যাক্টরের একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য তখন সামনে আসে, বাষ্পের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে রিঅ্যাক্টরের রিঅ্যাকটিভিটি বাড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করে। অপারেটররা জরুরি শাটডাউন ব্যবস্থা চালু করেন। কিন্তু এখানেও রিঅ্যাক্টরের নকশাগত একটি গুরুতর দুর্বলতা বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। কন্ট্রোল রডের নকশায় এমন গ্রাফাইট ডিসপ্লেসার ছিল, যার কারণে রড প্রবেশের শুরুর মুহূর্তে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিঅ্যাকটিভিটি কমার বদলে সাময়িকভাবে বাড়তে পারত। আইএইএর পরবর্তী বিশ্লেষণ এই নকশাগত ত্রুটিকে দুর্ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।

রিঅ্যাক্টরের শক্তি অত্যন্ত দ্রুত বেড়ে যায়। একটি বিশাল বাষ্প বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আরেকটি বিস্ফোরণ বা শক্তিশালী ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটে বলে তদন্তে বিবেচনা করা হয়। রিঅ্যাক্টরের ছাদ ও কাঠামো ভেঙে যায়। ৪ নম্বর ইউনিট কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। রিঅ্যাক্টরের ভেতরের জ্বলন্ত গ্রাফাইট ও অন্যান্য পদার্থ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আকাশে উঠে যেতে থাকে তেজস্ক্রিয় ধোঁয়া ও কণা। কিন্তু তখন সেখানে থাকা অনেক মানুষ জানতেনই না যে তাঁরা কতটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। আগুন নেভাতে প্রথম যে মানুষগুলো ছুটে যান, তাঁদের অনেকেই ছিলেন অগ্নিনির্বাপণকর্মী। তাঁদের কাজ ছিল আগুন নিয়ন্ত্রণ করা। তাঁরা পারমাণবিক দুর্ঘটনার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না এবং তখনো বিকিরণের মাত্রা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা ছিল না। তাঁদের কেউ রিঅ্যাক্টরের ধ্বংসস্তূপের খুব কাছে চলে যান। উচ্চ মাত্রার বিকিরণের কারণে অনেকের শরীরে দ্রুত রেডিয়েশন সিকনেসের লক্ষণ দেখা দেয়। চেরনোবিলের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তাঁদের কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগুন আরও ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।

জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় সাইটে থাকা প্রায় ৬০০ কর্মীর মধ্যে ১৩৪ জন উচ্চ মাত্রার বিকিরণে তীব্র রেডিয়েশন সিকনেসে আক্রান্ত হন। তাঁদের মধ্যে ২৮ জন প্রথম তিন মাসে মারা যান।

এদিকে প্রিপিয়াত শহরে তখনো স্বাভাবিক জীবনের মতোই রাত কাটছিল। ২৬ এপ্রিল সকালে মানুষ জানালা দিয়ে ধোঁয়া দেখতে পায়। কিন্তু শহরের সবাই বুঝতে পারেনি আসলে কী ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ মানুষকে ঘরে থাকতে এবং দরজা–জানালা বন্ধ রাখতে বলে। স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু পূর্ণ মাত্রায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তখনো নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি বুঝতে সময় লাগছিল। বিকিরণ মাপার যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ছিল, দুর্ঘটনার প্রকৃত মাত্রা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল এবং সোভিয়েত প্রশাসনের মধ্যে তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতাও ছিল।

প্রিপিয়াত সেন্ট্রাল স্কয়ার

পরবর্তী জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির নথি অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল রাত থেকে প্রিপিয়াতে রেডিয়েশন লেভেল দ্রুত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২৭ এপ্রিল দুপুরে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বেলা দুইটার দিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। প্রায় ১ হাজার ২০০টি বাস ব্যবহার করা হয়। প্রিপিয়াতের মানুষদের বলা হয়েছিল, তারা কয়েক দিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। অনেকে তাই সঙ্গে খুব অল্প জিনিস নিয়েছিল।

সেই কয়েক দিন আর কখনো শেষ হয়নি। প্রিপিয়াত থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরও বিপদ শেষ হয়নি। আশপাশের আরও অনেক এলাকা খালি করা হয়। ১৯৮৬ সালে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষকে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় আরও প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়। অর্থাৎ বলা যায়, একটি রাত শুধু একটি শহরকে খালি করেনি; বরং মানুষের বাড়ি, জমি, চাকরি, প্রতিবেশী, পরিচিত পরিবেশ—সবকিছু থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। আর তখনো বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ জানত না, আসলে কী ঘটেছে।

চেরনোবিল দুর্ঘটনার তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসের সঙ্গে ইউক্রেনের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বেলারুশ, রাশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ শনাক্ত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিশ্বের অন্য দেশগুলো নিজেদের রেডিয়েশন মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মাত্রা শনাক্ত করতে শুরু করে। তখন দুর্ঘটনাটি আর গোপন রাখা সম্ভব ছিল না। সুইডেনে অস্বাভাবিক রেডিওঅ্যাকটিভিটি শনাক্ত হওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক মনোযোগ সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যায়, কোনো পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ পরে দুর্ঘটনার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে।

এখানে চেরনোবিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। সেটা হলো, তথ্য গোপন করার সংস্কৃতি। দুর্ঘটনার প্রকৃত মাত্রা বুঝতে ও দ্রুত জনগণকে সতর্ক করতে সময় লেগেছিল। পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৎকালীন সোভিয়েত ব্যবস্থায় নিরাপত্তা, তথ্য আদান–প্রদান ও কর্তৃপক্ষের কাছে সমস্যার কথা প্রকাশ করার সংস্কৃতিতে গুরুতর দুর্বলতা ছিল। চেরনোবিলের পর ‘সেফটি কালচার’ ধারণাটি পারমাণবিক নিরাপত্তা আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে চেরনোবিলের গল্প শুধু ব্যর্থতার গল্প নয়। বিপর্যয়ের পর কয়েক লাখ মানুষ উদ্ধার ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত হন। তাঁদের বলা হয় লিকুয়িডেটর। সেনাবাহিনীর সদস্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী, অগ্নিনির্বাপণকর্মী, পুলিশ, প্রকৌশলী, নির্মাণকর্মী বিভিন্ন পেশার মানুষ এই বিশাল অভিযানে অংশ নেন। তাঁদের কাজ ছিল তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা, দূষিত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা, মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং ধ্বংস হওয়া রিঅ্যাক্টরের ওপর একটি অস্থায়ী সুরক্ষার কাঠামো তৈরি করা। এই মানুষদের অনেকেই জানতেন যে তাঁরা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। তবু তাঁদের কাজ করতে হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোয় তাঁদের অনেকের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়।

তবে চেরনোবিল নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, দুর্ঘটনার পর বহু মানুষকে বিকিরণের কারণে মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি মৃত্যুর মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান রয়েছে। বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সরাসরি প্রমাণিত মৃত্যু ও ভবিষ্যতে সম্ভাব্য রেডিয়েশন–ইনডাসড ক্যানসারের মধ্যে পার্থক্য করে। চেরনোবিলের স্বাস্থ্যগত প্রভাবের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণগুলোর একটি হলো থাইরয়েড ক্যানসার। বিশেষ করে দুর্ঘটনার সময় শিশু ও কিশোরদের মধ্যে রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন গ্রহণের কারণে ঝুঁকি বেড়ে যায়। দূষিত দুধ ও খাবারের মাধ্যমে আয়োডিন–১৩১ শরীরে প্রবেশ করতে পারত এবং থাইরয়েড গ্রন্থিতে জমা হতো।

আয়োডিন–১৩১–এর অর্ধেক জীবন মাত্র আট দিন হলেও দুর্ঘটনার প্রথম সময়ে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০০৬ সালের ডব্লিউএইচও মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের দুর্ঘটনার সময় শিশু–কিশোরদের মধ্যে পরবর্তী বছরগুলোয় হাজার থাইরয়েড ক্যানসারের ঘটনা শনাক্ত হয়। তবে সব স্বাস্থ্যের সমস্যাকে সরাসরি বিকিরণের কারণে হয়েছে বলা যায় না। ডব্লিউএইচও ও ইউএনএসসিইএআর উভয়েই মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, স্থানান্তর, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার মতো বিষয়কে চেরনোবিলের বড় মানবিক প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পরিবেশের ওপরও এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন, সিজিয়াম–১৩৪ ও সিজিয়াম–১৩৭ সহ বিভিন্ন রেডিওনিউক্লাইড ছড়িয়ে পড়ে। বাতাস ও বৃষ্টির মাধ্যমে দূষণ একেক এলাকায় একেক মাত্রায় জমা হয়। কৃষিজমি, বন, নদী ও বসতিপূর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সব জায়গায় একই মাত্রার বিকিরণ ছিল না। দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকায় প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি, আর দূরের অনেক ইউরোপীয় দেশে গড় রেডিয়েশন ডোজ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সময়ের সঙ্গে কিছু রেডিওনিউক্লাইড ক্ষয় হয়ে গেছে, কিছু দূষণ প্রাকৃতিকভাবে কমেছে। কিন্তু সিজিয়াম–১৩৭–এর মতো দীর্ঘ অর্ধ জীবন পদার্থের কারণে কিছু এলাকায় দূষণ দীর্ঘদিন ধরে থেকে গেছে। ফলে চেরনোবিলের প্রভাব শুধু ১৯৮৬ সালের একটি ঘটনা নয়, এটি বহু দশকের একটি বাস্তবতা।

দুর্ঘটনার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত রিঅ্যাক্টরকে ঘিরে তৈরি করা হয় একটি বিশাল সারকোফ্যাগাস, যার উদ্দেশ্য ছিল ধ্বংসাবশেষ ও তেজস্ক্রিয় পদার্থকে আরও ছড়িয়ে পড়া থেকে নিয়ন্ত্রণ করা। পরে পুরোনো কাঠামোর ওপর আরও বড় ও আধুনিক নতুন নিরাপদ আবরণ কাঠামো নির্মাণ করা হয়। চেরনোবিলকে নিরাপদ অবস্থায় নিয়ে আসার কাজ তাই দুর্ঘটনার পরপরই শেষ হয়ে যায়নি; এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকৌশল ও পরিবেশগত প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। আজ প্রিপিয়াতের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও অদ্ভুত মনে হয়। একসময় যে শহরে শিশুরা স্কুলে যেত, পরিবারগুলো সন্ধ্যায় হাঁটত, দোকানপাট খোলা থাকত, সেই শহর এখন পরিত্যক্ত। ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে, মানুষের স্বাভাবিক জীবন নেই। কোথাও পুরোনো স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, কোথাও ভাঙা অ্যাপার্টমেন্ট, কোথাও পড়ে থাকা আসবাব—সবকিছু যেন একটি থেমে যাওয়া জীবনের চিহ্ন হয়ে আছে।

উপমহাদেশের অস্ত্রোপচার বিস্ময়: সার্জারির জনক সুশ্রুত

চেরনোবিলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই যে, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনা শুধু একটি যন্ত্রের ব্যর্থতা নয়। এর পেছনে থাকতে পারে নকশার দুর্বলতা, ভুল সিদ্ধান্ত, অসম্পূর্ণ নির্দেশনা, নিরাপত্তার প্রতি অবহেলা, তথ্য গোপন করার সংস্কৃতি ও মানুষের ভুল। চেরনোবিলের পর আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় এসব বিষয়কে নতুনভাবে দেখা হয়। আইএইএর পরবর্তী বিশ্লেষণও দেখিয়েছে, দুর্ঘটনার জন্য শুধু অপারেটরদের দোষ দেওয়া যথেষ্ট নয়, রিঅ্যাক্টরের নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটিও কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিল।

২৬ এপ্রিল ১৯৮৬–এর সেই রাতের কথা ভাবলে তাই শুধু একটি বিস্ফোরণের কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে প্রিপিয়াতের সেই পরিবারগুলোর কথা, যারা কয়েক ঘণ্টার নোটিশে ঘর ছেড়েছিল। মনে পড়ে সেই অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের কথা, যাঁরা বিপদের প্রকৃত মাত্রা না জেনেই আগুনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। মনে পড়ে হাজার উদ্ধারকর্মীর কথা, যাঁরা পরবর্তী মাস ও বছরগুলোয় দূষিত এলাকায় কাজ করেছেন। আর মনে পড়ে সেই ব্যবস্থার কথা, যেখানে সত্য প্রকাশ করতে দেরি হওয়াও একটি বিপর্যয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। চেরনোবিল হয়তো আমাদের কাছে এখন ইতিহাস। কিন্তু সেই ইতিহাসের ভেতরে আজও একটি সতর্কবার্তা আছে। পারমাণবিক শক্তি মানুষের জন্য বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই শক্তির সঙ্গে ভুলের সুযোগ খুব কম। একটি ছোট ভুল, একটি দুর্বল নকশা, একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা সত্য গোপন করার সংস্কৃতি—সবকিছু একসঙ্গে মিলে কখনো এমন একটি রাত তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব শেষ হতে কয়েক দশক লেগে যায়।

চেরনোবিলের রাত তাই শুধু একটি রিঅ্যাক্টরের ধ্বংসের গল্প নয়। এটি মানুষের প্রযুক্তির ওপর আস্থা, সেই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও ভুল থেকে শেখার প্রয়োজনের গল্প। যে শহরটি এক রাতে তার মানুষ হারিয়েছিল, সেটি আজও দাঁড়িয়ে আছে নীরবে। আর সেই নীরব শহর যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাগুলো অনেক সময় শুধু আমাদের কী ঘটেছিল তা শেখায় না, ভবিষ্যতে কীভাবে একই ভুল না করতে হয়, সেটাও শেখায়।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা

Read full story at source