অসাধারণ শিল্পী, অসাধারণ গুরু

· Prothom Alo

শিল্পী মুর্তজা বশীর ছিলেন আমার গুরু। আজ তাঁর জন্মদিন। ছবি আঁকিয়ে হিসেবে আমার যতটুকু পরিচিতি, এর পেছনে আমার তিন গুরুর অবদানের কথা কখনোই ভুলব না। তাঁরা হলেন রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর ও দেবদাস চক্রবর্তী।

১৯৬৭ সালে ঢাকা চারু ও কারুকলা কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম; কিন্তু এক বছর পরই আমার পক্ষে আর তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সাধারণ শিক্ষায় আইএ–বিএ করার পর খবর পেলাম রশিদ চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় দুই বছরের এমএ কোর্স খুলেছেন। আমার ছবি আঁকায় শিক্ষা নেওয়ার বাসনা পূর্ণ করার সুযোগ এল। প্রথম দিকে চারুকলা শিক্ষা গ্রহণ না করলেও যার ছবি আঁকার হাত আছে, সাধারণ শিক্ষায় পাস করা তেমন শিক্ষার্থীদেরও ভর্তির সুযোগ দিয়েছিলেন রশিদ স্যার।

Visit lej.life for more information.

প্রথম দিন গিয়ে দেখি রুটিনে আছে শিল্পমাধ্যমের ক্লাস। ক্লাস নেবেন মুর্তজা বশীর স্যার। স্যারকে আগে কখনো দেখিনি। কিছুক্ষণ ক্লাসে বসে থেকে টিচার্স রুমে গিয়ে বশীর স্যারকে বললাম, আমাদের শিল্পমাধ্যমের ক্লাস আছে। তিনি ভীষণ বকা দিলেন। তাঁর বকা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। বুঝলাম, স্যারকে ভয় পেতে হবে। বিষয়টা আসলে তা ছিল না। স্যারের ভাবটা ছিল খুব রাশভারী, কিন্তু ভেতরে তিনি মোটেই তা নন। বরং অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ ও বন্ধুসুলভ।

ছবি আঁকার সময় বশীর স্যার বলতেন, ‘তোমার আঁকা মানুষ কিন্তু বাস্তব নয়। তাই তাদের গায়ের রং নীল, সবুজ, এমনকি বেগুনিও হতে পারে।’ ছবিতে ছায়া আঁকার সময় বাস্তবিক আলোর উৎস ছাড়াই যেকোনো জায়গায় ছায়া দেওয়া যায়।

ড্রয়িংয়ে ছিল স্যারের বিশেষ গুণ। তিনি বলতেন, ‘দেখো, পৃথিবীতে রেখা বলে কিছু নেই। একটা পাহাড়ের সামনে গাছ, গাছের সামনে ঘর, তার সামনে একজন মানুষ। এই সবকিছুকে ছবিতে আঁকতে গেলে পাহাড়ের সীমানা রেখা দিয়ে বোঝাতে হবে। গাছের ও ঘরের সীমানা আউটলাইন দিয়ে পৃথক করতে হবে। মানুষটাকেও একইভাবে সীমারেখা দিয়ে আলাদা করতে হবে। এই সীমারেখাই ড্রয়িং। মানুষটাকে যদি কেবলই সীমারেখা দিয়ে আলাদা করে আঁকি, তাহলে তার আসল দেহগঠন ফুটে উঠবে না। কোথায় শুরু, কোথায় শেষ, আবার তার পাশ দিয়ে কোথায় শুরু—সেগুলো ভালোভাবে দেখে তবেই ড্রয়িং করতে হবে। রেখা কখনো গাঢ়, কখনো হালকা করতে হবে। নইলে মানুষটার আসল রূপ ফুটে উঠবে না। মানুষটা স্থূল না কৃশ, বোঝা যাবে না। তার ওজন বা চরিত্র ফুটে উঠবে না।’

স্যারের গুণের কোনো শেষ ছিল না। তিনি একাধারে একজন ড্রয়িংমাস্টার, পেইন্টার, প্রিন্টমেকার, কবি, গল্পকার; আবার সিনেমার চিত্রনাট্যকার এবং সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন।

মুর্তজা বশীর স্যার এভাবে চমৎকার করে ড্রয়িং ক্লাস নিতেন। যেকোনো জিনিসের ড্রয়িংয়ে সীমারেখা ছাড়াও ভেতরের হাজারটা রেখা কীভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে, তা–ও ভালোভাবে শেখাতেন। ড্রয়িংয়ে স্যার ছিলেন ওস্তাদের ওস্তাদ। বলতেন, ‘নিজের হাতের নানা ভঙ্গির ড্রয়িং করো, শিখতে সুবিধা হবে।’ স্যারের কথামতো করতে গিয়ে বুঝলাম, সেটা কত কার্যকর। স্যার ড্রয়িং করার সময় ইরেজার রাখতে বলতেন। ভুল লাইন সেটা দিয়ে মুছে আবার ঠিক করে আঁকতে বলতেন। বারবার ভুল সংশোধন করতে করতে লাইনটা মুখস্থ হয়ে যেত। পরে মন থেকে ফিগার আঁকতে একটুও বেগ পেতে হতো না।

মুর্তজা বশীর স্যার এভাবে চমৎকার করে ড্রয়িং ক্লাস নিতেন। যেকোনো জিনিসের ড্রয়িংয়ে সীমারেখা ছাড়াও ভেতরের হাজারটা রেখা কীভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে, তা–ও ভালোভাবে শেখাতেন।

ছবি আঁকার সময় বশীর স্যার বলতেন, ‘তোমার আঁকা মানুষ কিন্তু বাস্তব নয়। তাই তাদের গায়ের রং নীল, সবুজ, এমনকি বেগুনিও হতে পারে।’ ছবিতে ছায়া আঁকার সময় বাস্তবিক আলোর উৎস ছাড়াই যেকোনো জায়গায় ছায়া দেওয়া যায়।

পাঠ দেওয়ার ক্ষমতা যে একজন ছবি আঁকিয়েকে কী সাংঘাতিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, সেটাই ছিল বশীর স্যারের গুণ। তিনি বলতেন, আঁকার আগে চোখের দেখাটাকে ঠিক করতে হবে। বলতেন, ‘মডেল তো তুমি পাবে না সব সময়। তাই আয়নার সামনে আত্মপ্রতিকৃতি আঁকো। অনেক কিছু শিখতে পারবে।’ তিনি নিজে তাঁর নানা বয়সের বহু আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন। অসাধারণ সব কাজ।

স্যার বলতেন, ‘গুরু ধরতে হলে লেওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলাঞ্জেলো, রাফায়েলদের মতো পুরোনো মাস্টারদের ধরো। ভালোভাবে তাঁদের কাজ অনুধাবন করো। চিত্রশৈলী নিয়ে কাজ করতে হলে পাবলো পিকাসোর কাছ থেকে শেখো।’ বলতেন, অনুকরণ নয়, তাঁদের কাজ অনুধাবন করতে হবে।

মুর্তজা বশীর স্যার নিজে রেনেসাঁপূর্ব শিল্পীদের অনুরাগী ছিলেন। তাঁদের কম্পোজিশন, ড্রয়িং, রঙের ব্যবহার নিয়ে তাঁর বেশ উৎসাহ ছিল। কারণ, অবয়বধর্মী স্টাইলিস্টিক কাজে সেখান থেকে বহু কিছু পাওয়ার ছিল। আবার প্রাচ্য শিল্পকলায়ও তাঁর জ্ঞান ও ধারণা ছিল গভীর। মোগল মিনিয়েচারে পরিপ্রেক্ষিত ব্যবহারের কায়দা বা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি আমাদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন। স্যারের শিক্ষাদানের কায়দার কথা বলে শেষ করা যাবে না। কত বিচিত্র আইডিয়া যে তাঁর মাথায় পাক খেত!

পাঠ দেওয়ার ক্ষমতা যে একজন ছবি আঁকিয়েকে কী সাংঘাতিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, সেটাই ছিল বশীর স্যারের গুণ। তিনি বলতেন, আঁকার আগে চোখের দেখাটাকে ঠিক করতে হবে।

আমরা তখন ছাত্র। ‘অক্ষয় বট’ নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার একটা দেয়ালচিত্র সৃষ্টি করলেন, ঝামা ইট দিয়ে। কী যে অসাধারণ! পৃথিবীর আর কোথাও ইট দিয়ে এতটা বড় অথচ সংযত দেয়ালচিত্র রচিত হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। মোজাইকের কাজে লাইন অনুসরণ করা যে একটা বড় বৈশিষ্ট্য, এই কাজে তা দেখা যায়। কাজটি করার সময় তাঁকে অসম্ভব মানসিক ও শারীরিক পরিশ্রম করতে দেখেছি। সৃষ্টি থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত মুদ্রার ইতিহাস তিনি যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়ালচিত্রে প্রকাশ করেছেন, তা–ও অতুলনীয়।

স্যারের গুণের কোনো শেষ ছিল না। তিনি একাধারে একজন ড্রয়িংমাস্টার, পেইন্টার, প্রিন্টমেকার, কবি, গল্পকার; আবার সিনেমার চিত্রনাট্যকার এবং সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান মুদ্রাবিশেষজ্ঞ। কত রকম জিনিসের যে সংগ্রাহক ছিলেন—নানা দেশের মুদ্রা, ডাকটিকিট, দেশলাইয়ের বাক্স। আবার সংসারের দায়িত্বও পালন করেছেন শতভাগ।

মুর্তজা বশীর স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম, আমি সত্যিই ভাগ্যবান ও গর্বিত।

  • নাজলী লায়লা মনসুর, চিত্রশিল্পী

Read full story at source