বিএনপি কি সরকারে মিশে যাচ্ছে

· Prothom Alo

ঢাকায় এলেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) বাসায় একবার ঢুঁ মারেন মো. বাহরুল আলম। ব্যবসা, চিকিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত কাজ—যে কারণেই রাজধানীতে আসুন, এমপির সঙ্গে দেখা করা তাঁর অন্যতম কাজ। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আমানউল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের এই চেয়ারম্যান গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিএনপির সমর্থনে জয়ী হয়েছিলেন। এবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান তিনি। তাই নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করাও তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার বড় অংশ।

বাহরুল আলম গত শনিবার রাতে নিঃসংকোচে প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন করতে হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য (নোয়াখালী-৩) মো. বরকতউল্লা বুলুর সমর্থন লাগবে। ‘সে জন্য তিনি (এমপি) এলাকায় এলে দেখা করি, আমি ঢাকায় গেলে তাঁর বাসায় যাই।’

Visit rouesnews.click for more information.

বিএনপির স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন, মহাসচিব– মন্ত্রিসভায় নতুন কারা আসছেন

শুধু বাহরুল আলম নন, বিএনপির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যস্ততার চিত্রও এমন। ঢাকায় এসে এমপি-মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করা, নিজের অবস্থান জানান দেওয়া এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ খুঁজছেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরছেন বা সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন।

ফলে প্রায় ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দলটির নেতা-কর্মীদের একটি অংশ সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিএনপির সামনে তাই এখন বড় সাংগঠনিক প্রশ্ন—

দল সরকারকে সহযোগিতা করবে, নাকি ধীরে ধীরে সরকারের ছায়ায় আড়াল হয়ে যাবে?

ঢাকায় এসে এমপি-মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করা, নিজের অবস্থান জানান দেওয়া এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ খুঁজছেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরছেন বা সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন।

সরকারের ছায়ায় দল

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিএনপির সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দীর্ঘদিনের সংগঠনকে সক্রিয় রাখা। ছয় মাস পূর্তির সময় দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততায় দলীয় রাজনীতি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। দলের নেতারাই স্বীকার করছেন, এ সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল সীমিত। দিবসভিত্তিক কর্মসূচির বাইরে মাঠে দলটির তৎপরতা খুব একটা দেখা যায়নি; বরং বিরোধী দলগুলোই সংসদের ভেতরে-বাইরে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছে।

এর কিছু বাস্তব কারণও আছে। বিএনপির মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একটি বড় অংশ এখন সংসদ সদস্য, অনেকে মন্ত্রী। জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বেও আছেন দলের নেতারা। ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তৃণমূলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতাও শুরু হয়েছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—কে দলের সমর্থন পাবেন। এ অবস্থায় মাঠের রাজনীতির একটি অংশের কাছে এমপি-মন্ত্রীরা হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রধান কেন্দ্র।

ফলে মাঠের নেতৃত্বের একটি বড় অংশ এখন সরকারি দায়িত্বে যুক্ত। আর যাঁরা কোনো পদ পাননি, তাঁদের অনেকের নজর পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দিকে। এ বছরের মধ্যেই সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানিয়েছে সরকার। তাই তৃণমূলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতাও শুরু হয়েছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—কে দলের সমর্থন পাবেন। এ অবস্থায় মাঠের রাজনীতির একটি অংশের কাছে এমপি-মন্ত্রীরা হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রধান কেন্দ্র।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দল যখন সরকারে যায়, তখন দল সরকারের কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। তার মানে এই নয় যে দল সরকারে ঢুকে গেছে। তবে সরকার গঠনের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা ঢেলে সাজাতে পারিনি, এটা সত্য। এখন আমরা অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠনসহ দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করছি।’

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন: মির্জা ফখরুল

বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ (প্রিন্স) সরকারে দল মিশে যাওয়ার ঝুঁকি অস্বীকার করেন না। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা নেতা, তাঁরাই তো এমপি-মন্ত্রী। আবার অনেকে স্থানীয় সরকারে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। সে কারণে সরকারের কর্মকাণ্ডগুলো বুঝে নিতে একটু সময় লেগেছে। তবে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে খুব সতর্ক। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানে বলছেন সরকারের কাজে দলের সহযোগিতা লাগবে, কিন্তু সরকারের ভেতরে দলকে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদদল যখন সরকারে যায়, তখন দল সরকারের কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। তার মানে এই নয় যে দল সরকারে ঢুকে গেছে। তবে সরকার গঠনের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা ঢেলে সাজাতে পারিনি, এটা সত্য। এখন আমরা অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠনসহ দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করছি।

প্রতিশ্রুতি ও চাপ

সরকারের ভাষ্য, প্রথম ছয় মাস ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো সচল করা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির সময়। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেয়। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে থাকা পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানীসহ কয়েকটি কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। এপ্রিলে কৃষক কার্ডের প্রাক্-পাইলট কর্মসূচি চালু করে প্রাথমিকভাবে ২২ হাজারের বেশি কৃষকের কাছে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়। জুনে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়েছে।

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলোর বক্তব্য, গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের পতনের পর দীর্ঘদিন পরে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রশাসন স্বাভাবিক করা, অর্থনীতি সামলানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করাই ছিল সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।

গণমাধ্যমের ওপরও আগের মতো চাপ দেখা যাচ্ছে না। সংবাদপত্র সরকারের সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। নাগরিক সমাজও বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনভাবে মত দিচ্ছে। সেদিক থেকে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে তুলনামূলক স্বস্তি আছে।

রাজনীতি ও মতপ্রকাশে স্বস্তি

সরকারের প্রথম ছয় মাসের একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিক হলো রাজনৈতিক পরিসর তুলনামূলক উন্মুক্ত থাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দল ও ভিন্নমতের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগ ছিল। গুম, খুন, হামলা ও মামলার মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত করে রাখার অভিযোগও ছিল তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে।

বর্তমান সরকারের ছয় মাসে বিরোধী দল ও মতের ওপর সে ধরনের রাজনৈতিক নিপীড়নের চিত্র দেখা যায়নি। বিরোধী দলগুলো সরকার, ক্ষমতাসীন দল ও এর নেতাদের সমালোচনা করছে; প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যও তুলে ধরছে। সংসদের ভেতরে-বাইরে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে গিয়ে আগের মতো দমন-পীড়নের অভিযোগও সামনে আসেনি।

গণমাধ্যমের ওপরও আগের মতো চাপ দেখা যাচ্ছে না। সংবাদপত্র সরকারের সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। নাগরিক সমাজও বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনভাবে মত দিচ্ছে। সেদিক থেকে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে তুলনামূলক স্বস্তি আছে।

সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শক্তিরও ঘাটতি নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সরকারের ইচ্ছা ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে সংস্কার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।

সংস্কার ও নিয়োগে প্রশ্ন

তবে সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে সংস্কার একটি বড় অস্বস্তির জায়গা। গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার ও নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার নিয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। বিএনপিও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর কোন সংস্কার দ্রুত করবে, কোনটি পরে করবে এবং কোনটির জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন—এ নিয়ে দলটির অবস্থানের সমালোচনা করছে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য প্রশ্নটি শুধু সংস্কার বাস্তবায়নের নয়, গণ-অভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরকারের আচরণের দূরত্ব কতটা, সেই উত্তর দেওয়ারও। নির্বাচনে বিজয় বিএনপিকে সরকার গঠনের বৈধতা দিয়েছে আর গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা দলটির ওপর রাজনৈতিক দায় তৈরি করেছে। সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শক্তিরও ঘাটতি নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সরকারের ইচ্ছা ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে সংস্কার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্ব, কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়োগ দেওয়াকে কেউ কেউ দলীয় নেতাদের ‘পুনর্বাসন’ হিসেবে সমালোচনা করছেন।

অবশ্য বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে বলেছেন, ‘যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এরা কিন্তু কেউ অযোগ্য না। সব যোগ্যতা তাদের মধ্যে আছে।...আমি সরকারে, আমার লোকজন থাকবে না?’

অথচ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। এসব নিয়োগ সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের পক্ষের যুক্তি হতে পারে, রাষ্ট্র পরিচালনায় আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া রাজনৈতিক সরকারের জন্য অস্বাভাবিক নয়। তবে বিএনপির সমস্যা হলো তারা সাড়ে ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দলীয়করণের অভিযোগ করেছে। এখন বিএনপি সরকারের প্রতিটি নিয়োগও মানুষ সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করছে।

অবশ্য বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে বলেছেন, ‘যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এরা কিন্তু কেউ অযোগ্য না। সব যোগ্যতা তাদের মধ্যে আছে।...আমি সরকারে, আমার লোকজন থাকবে না?’

শেখ হাসিনার চলে যাওয়া অলৌকিক মনে হচ্ছিল

অর্থনীতি ও জনজীবনের চাপও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব আদায়ের চাপের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের সমস্যাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। অবশ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি–সংকট তীব্র হওয়ার পেছনে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতজনিত জ্বালানি সরবরাহ–বিঘ্নের বড় ভূমিকা রয়েছে।

গ্যাসের ঘাটতি এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ–বিভ্রাট শিল্পকারখানার উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে চাপ তৈরি করছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় অংশ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট ও বাজারের চাপ সরকারের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

সংগঠন সচলের চেষ্টা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের পর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সরকারে দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রুহুল কবির রিজভীসহ চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এঁদের কারও কারও বিষয়ে নেতা-কর্মীদের একাংশে অসন্তোষ আছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

সরকার গঠনের পর এখন পর্যন্ত বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি। এ সময়ে স্থায়ী কমিটির সভা হয়েছে চারটি। সর্বশেষ সভায় রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়।

তবে ছয় মাস পূর্তির সময় দলকে নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। দলীয় সূত্র বলছে, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, শ্রমিক দলসহ অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ৪ জুলাই থেকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা জেলা এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে তৃণমূলে দলকে শক্তিশালী করা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির নেতাদের অনেকে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের ধারণা, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সংগঠন যে কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বও তা উপলব্ধি করছে। দলীয় সূত্রগুলোর মতে, মাঠের নেতাদের কাছে দলকে আবার রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। এমপি-মন্ত্রীদের বাসায় সাক্ষাৎ, সরকারি পদ-পদবি কিংবা স্থানীয় নির্বাচনে সমর্থন পাওয়ার প্রতিযোগিতার বাইরে তৃণমূলকে রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসম্পৃক্ততা ও সংগঠননির্ভর রাজনীতিতে ফেরাতে হবে।

বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি মাঠে নেই, বিষয়টা এমন নয়। প্রধানমন্ত্রী যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন নেতা-কর্মীরা ব্যাপকভাবে মাঠে ছিলেন। আমি যতটুকু জানি, খুব শিগগির বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হবে। সাংগঠনিকভাবে অঙ্গসংগঠনসহ বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে।’

সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই নিতে হবে; আবার দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাবও পড়বে সরকারের ওপর। তাই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে নেতা-কর্মীদের ব্যস্ততার বিপরীতে দলকে মাঠে সক্রিয় রাখাই এখন বিএনপির বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

বিএনপি সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কিছু কর্মসূচি শুরু করেছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজস্ব ছন্দ তৈরির চেষ্টা করছে। বিরোধী দল ও মতের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের তুলনামূলক উন্মুক্ত পরিবেশ প্রথম ছয় মাসের ইতিবাচক দিক। একই সময়ে সংস্কার ও নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, অর্থনৈতিক চাপ, বিদ্যুৎ–জ্বালানিসংকট এবং দলের সাংগঠনিক স্থবিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিদ্যুৎ-সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উগ্রবাদী তৎপরতা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসেও এসবের কয়েকটি দৃশ্যমান হয়েছে। সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই নিতে হবে; আবার দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাবও পড়বে সরকারের ওপর। তাই ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে নেতা-কর্মীদের ব্যস্ততার বিপরীতে দলকে মাঠে সক্রিয় রাখাই এখন বিএনপির বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

Read full story at source