দিনমজুরি করেও চালিয়েছেন পড়াশোনা, আজ তিনি সফল এক্সিকিউটিভ
· Prothom Alo

প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে’। এই আয়োজনে আমরা সেই অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে কথা বলি যিনি তাঁর আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন সফল হয়েছেন, নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এমনই একজন অদম্য মেধাবীকে নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল ২০২৬, শনিবার, বেলা ৩টায় আয়োজন করা হয় এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের এ পর্বের অতিথি ছিলেন সাঁকো-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার দক্ষিণ আমুরখাই গ্রামের অদম্য মেধাবী মো. মাহামুদুল হাসান। তিনি হাজীদানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গণিত বিভাগে থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি ঠাকুরগাঁওয়েরটেনস এগ্রো লিমিটেড সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত। অনুষ্ঠানটির মধ্য দিয়ে তাঁর দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প ওঠে আসে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবাসুলতানা। সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।
Visit moryak.biz for more information.
মাহামুদুল হাসান, আপনাকে আমাদের অনুষ্ঠানে স্বাগতম। কেমন আছেন?
মো. মাহামুদুল হাসান: আলহামদুলিল্লাহ, আমি খুব ভালো আছি। আপনার মাধ্যমে আমি সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং ধন্যবাদ জানাচ্ছি প্রথম আলো ট্রাস্টের অদম্য মেধাবী তহবিলকে। আমাদের মতো প্রত্যন্ত গ্রামের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পাশে অভিভাবক হিসেবে দাঁড়ানোর জন্য। আমি প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের কাছে চিরঋণী।
আপনি অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে আমাকে বলছিলেন যে, বর্তমানে আপনি আপনার দ্বিতীয় কর্মস্থলে আছেন। একটি দীর্ঘ যুদ্ধের পর এখন আপনি সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। আপনার বর্তমান পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা সম্পর্কে জানার আগে আমি একটু পেছনে ফিরতে চাই। সেই ছোটবেলার মাহামুদুলকে নিয়ে আপনার স্মৃতিগুলো কেমন?
মো. মাহামুদুল হাসান: আপু, আমার ছোটবেলার গল্পটা অনেকের চেয়ে আলাদা। আমি যখন মাত্র আড়াই বছরের শিশু, তখনই আমি আমার মাকে হারাই। মা মারা যাওয়ার পর বাবা যখন দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেন, তখন থেকেই আমি আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমার শৈশব কেটেছে নানির কাছে। আমি যখন আড়াই বছরের, তখন আমার নানির বয়স ছিল প্রায় ৬৫ বছর। আমার নানা ছিলেন না, তাই এক প্রকার নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধা মহিলার কাছেই আমি বড় হতে থাকি। যে কুঁড়েঘরটাতে আমি বড় হয়েছি, আজ সেটির কোনো অস্তিত্ব নেই। ২০২৩ সালে নানি মারা যাওয়ার পর সেই ঘর এবং জায়গা-সবই হারিয়ে গেছে।
আপনার শৈশব কেটেছে অনেক না পাওয়া আর প্রিয়জন হারানোর হাহাকারের মধ্যে দিয়ে। সেই অবস্থায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কি প্রায় অসম্ভব ছিল না?
মো. মাহামুদুল হাসান: ঠিক তাই আপু। গ্রামের ফ্রি সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়াটা কোনোমতে সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মতো সামর্থ্য আমার নানির ছিল না। নানি মানুষের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতেন। নানি চাইতেন আমি যেন পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হই। নানির সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য আমি নিজেও তখন অন্যের খেতে দিনমজুরের কাজ শুরু করি। কাজ করে নিজের ভর্তির টাকা জোগাড় করে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই। এভাবে স্ট্রাগল করতে করতে ২০১৩ সালে আমি কামারপুকুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাই। কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্তেও আমার পাশে অভিনন্দন জানানোর মতো কোনো অভিভাবক ছিল না। মনে হচ্ছিল স্বপ্নটা ওখানেই থেমে যাবে।সেই সংকটময় মুহূর্তে আপনি কীভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেলেন?
সেই সংকটময় মুহূর্তে আপনি কীভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেলেন?
মো. মাহামুদুল হাসান: হার না মানার মানসিকতা আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। আমাদের এলাকার একজন দানশীল ব্যক্তির সহায়তায় আমি কামারপুকুর ডিগ্রি কলেজে মাত্র এক হাজার টাকায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। কলেজ কর্তৃপক্ষ আমার মেধা আর অভাব বিবেচনা করে সেশন ফি ও পরীক্ষার ফি মওকুফ করে দিয়েছিল। ২০১৫ সালে এইচএসসিতেও আমি জিপিএ-৫ পাই। এরপর আসে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির যুদ্ধ। আমাদের তখন দুবেলা খাওয়ার টাকা ছিল না, সেখানে কোচিং করা ছিল বিলাসিতা। তবুও বন্ধুদের সহায়তায় নিজে নিজে প্রস্তুতি নিয়ে ২০১৭ সালে আমি হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাই। কিন্তু ভর্তির অনেক টাকা জোগাড় করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই সময় প্রথম আলোর সৈয়দপুর প্রতিনিধি এম আর আলম ঝন্টু সাহেবের মাধ্যমে আমি প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী তহবিলের সঙ্গে যুক্ত হই। ওনারা আমাকে সাহস দিয়েছিলেন, পাশে ছিলেন।
সাঁকো এবং প্রথম আলো ট্রাস্ট আমার কাছে শুধু একটি সংগঠন নয়, বরং পরিবারের মতো ছিল। বিশেষ করে নাজিম ভাইয়া এবং সাঁকোর বড় ভাইয়েরা আমাকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে যে সাপোর্ট দিয়েছেন, তা অবিশ্বাস্য। এমনকি করোনাকালীন সংকটের সময় যখন আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তাঁরা আমাদের স্কলারশিপের মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য খাবারের ব্যবস্থা পর্যন্ত করেছিলেন ওনারা। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার সময় সাঁকোর পক্ষ থেকে আমাদের প্রত্যেককে একটি করে ল্যাপটপ উপহার দেওয়া হয়েছিল।
আপনি যখন সাফল্যের খুব কাছে আসছিলেন, তখনই আপনার জীবনে আরেকটি বড় আঘাত আসে। আপনার নানির মৃত্যু। সেই সময়ের কথা যদি একটু বলতেন।
মো. মাহামুদুল হাসান: ২০২২ সালে আমার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়। স্বপ্ন ছিল বড় কোনো সরকারি অফিসার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি হওয়ার। কিন্তু সেই বছরই আমার নানি ক্যানসারে আক্রান্ত হন। আমার নানিই ছিলেন আমার সব। সাঁকো থেকে নানির চিকিৎসার জন্য সহায়তা করা হয়েছিল, কিন্তু ৮-৯ মাস লড়াই করার পর নানি মারা যান। আমি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। তখন নাজিম ভাইয়ারা আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে, নানি চলে গেলেও ওনার স্বপ্নটা আমার মাঝেই বেঁচে আছে। সেই সময় অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে আমি সরকারি চাকরির স্বপ্ন সরিয়ে রেখে করপোরেট সেক্টরে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ২০২৩ সালে আমি ‘এসিআই গ্রুপে’ এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দিই।
একজন গণিত বিভাগের ছাত্র হয়ে এগ্রো-কেমিক্যাল বা করপোরেট সেক্টরে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া কি কঠিন ছিল?
মো. মাহামুদুল হাসান: শুরুতে একটু চ্যালেঞ্জ ছিল, কিন্তু কাজ করতে গিয়ে আমি করপোরেট জগতের প্রতি ভালোবাসা খুঁজে পাই। এসিআই-তে থাকাকালীন আমি কাজের সূত্রে অনেকবার বিদেশ ট্যুর করার সুযোগ পেয়েছি। আমার কাজের পারফরম্যান্স দেখে ২০২৫ সালে ‘টেনস এগ্রো লিমিটেড’ আমাকে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় এবং বর্তমানে আমি ঠাকুরগাঁওয়ে কর্মরত আছি। এখন আমার স্বপ্ন হলো একদিন বড় কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সিইও বা এমডি হওয়ার।
আপনার এই অদম্য সাহসের কথা শুনলে গর্ব হয়। আমাদের সমাজে অনেক তরুণ আছে যারা ছোটখাটো ব্যর্থতাতেই হাল ছেড়ে দেয়। তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী? এই কঠিন সময়ে নিজের মনোবল ধরে রাখার সূত্রটা কী?
মো. মাহামুদুল হাসান: যখনই আমি ভেঙে পড়তাম, আমি আমার ৬৫ বছরের বৃদ্ধা নানির কথা ভাবতাম। তিনি যদি সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও লড়তে পারেন, তবে আমি কেন পারব না? এ ছাড়া প্রথম আলো ট্রাস্টের নাজিম ভাইয়া বা মাহবুবা আপুদের সঙ্গে কথা বলতাম। ওনারা সব সময় বলতেন, ‘তোমরা আলোর পথের যাত্রী, তোমাদের থেমে যাওয়া চলবে না’। আমি বর্তমানের অদম্য মেধাবীদের বলব, কোনো অবস্থাতেই দমে যাবেন না। অভাব হয়তো সাময়িক, কিন্তু পরিশ্রমের ফল চিরস্থায়ী।
চমৎকার বলেছেন মাহামুদুল। আপনি নানির কুঁড়েঘর থেকে আজ করপোরেট অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন-এটি একটি বিশাল উত্তরণ। আপনি যে করপোরেট লিডার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তার জন্য আপনার প্রস্তুতি কেমন?
মো. মাহামুদুল হাসান: আমি এখন নিজেকে তৈরি করছি। বিভিন্ন প্ল্যানিং, কোম্পানির গোল অ্যাচিভ করা এবং নতুন আইডিয়া ক্রিয়েট করার মাধ্যমে আমি দক্ষতা অর্জন করছি। আমার বিশ্বাস, যে ছেলেটি গ্রামে দিনমজুরি করে বড় হয়েছে, সে যদি চেষ্টা করে তবে একদিন অবশ্যই বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের এমডি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
আপনার এই অদম্য প্রাণের শক্তি আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে। আপনার নানি নিশ্চয়ই ওপর থেকে তার নাতির এই সাফল্য দেখছেন এবং আশীর্বাদ করছেন। আপনি আপনার পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে অনেক বড় হন, সফল হোন-প্রথম আলো পরিবারের পক্ষ থেকে সেই শুভকামনা সব সময় থাকবে।
মো. মাহামুদুল হাসান: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ আপু। আমার জন্য দোয়া করবেন।