চোরতন্ত্র আর ব্যাংক ডাকাতির আখ্যান

· Prothom Alo

নিকট অতীতে এই অঞ্চলে অনেক ডিক্টেটরের দেখা পাই। যেমন পাকিস্তানের আইয়ুব খান, দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং হি, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান হি, ইন্দোনেশিয়ার মুহাম্মাদ সুহার্তো এবং ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস। আইয়ুব, সুহার্তো আর চুন ক্ষমতা নিয়েছিলেন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। লি আর মার্কোস নির্বাচনে জিতে সরকারপ্রধান হয়েছিলেন। সবাই ছিলেন ডিক্টেটর। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একটা বড় অমিল আছে।

গত কয়েক দশকে দক্ষিণ কোরিয়া আর সিঙ্গাপুর যে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে, তার পেছনে এই দুজনের অনেক অবদান আছে। দেশের মানুষের কাছে তাঁদের পরিচয় ‘ডেভেলপমেন্টাল ডিক্টেটর’ হিসেবে। তাঁরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁদের দেশকে ইউরোপের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।

Visit newsbetsport.bond for more information.

অন্যদিকে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া আর ফিলিপাইন তার কাছাকাছিও যেতে পারেনি। এর কারণ, তাদের শাসকেরা শুধু ডিক্টেটর ছিলেন না, তাঁরা একই সঙ্গে ছিলেন দুর্নীতিবাজ। নিজ নিজ দেশে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চোরতন্ত্র। নিজেরা হয়েছিলেন অঢেল সম্পদের মালিক।

ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর পরিহাস। আইয়ুবের নামে পাকিস্তানে কোনো স্থাপনা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল নিতান্ত পরিত্যক্ত অবস্থায়। সুহার্তো আর মার্কোস গণ–অভ্যুত্থানে উৎখাত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমৃত্যু ছিলেন ফেরারি।

ব্যাংক খাতে ‘লাইসেন্স টু লুট’, বাংলাদেশ সংস্করণ

এরপরও আমরা অনেক ডিক্টেটরের দেখা পাই। আমাদের দেশে হাল আমলে ছিলেন শেখ হাসিনা। ক্ষমতায় থাকার জন্য হেন অপরাধ নেই, যা তিনি করেননি। তাঁর সঙ্গে জুটেছিল একদল লুটেরা আর দলদাস। তারা দেশটা চুষে, নিংড়ে ছোবড়া বানিয়ে দিয়েছে। দগদগে ঘা নিয়ে ধুঁকছে দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক খাত তার অন্যতম।

১২ জুন বাজেট–উত্তর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ বক্তব্যে বলেছেন, ‘ব্যাংক খাতের এক-তৃতীয়াংশ টাকা চুরি হয়েছে।’ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যত অপরাধবিষয়ক বিদ্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতিটি স্তরেই ‘চুরি’ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই বিদ্যার গুরুত্ব মহিমান্বিত হয়েছে ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা’ প্রবচনের মাধ্যমে। 

কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসকে তাঁদেরই দেশ অভিশংসনের মুখোমুখি করেছিল। তাঁদের প্রকাশ্যে বিচার হয়েছিল। অন্যতম অভিযোগ ছিল, তাঁরা বাংলা ও ভারতের সম্পদ লুট করেছিলেন। ‘যাদের জন্য করল চুরি, তারাই বলে চোর’—এ রকমই ঘটেছিল। আর আমরা চুরি হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রাখলাম। আরও পরিতাপের বিষয়, খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিচার হয়নি। তাহলে চোরতন্ত্রই কি অব্যাহত থাকবে?

ব্যাংকের চুরি হওয়া টাকা হলো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীদের। উচ্চবিত্তেরা টাকা ব্যাংকে অলস ফেলে রাখেন না। চুরি হয়েছে আমানতকারীদের টাকা। ‘চাহিবা মাত্র ফিরে পাবে’ বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রেখেছিল। রাষ্ট্র ও সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিবৃতি থেকে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠানটি কেবল ঘটে যাওয়া অপরাধের বিবরণ দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখল। চুরি হয়েছে ঘোষণা দিলেন গভর্নর, কিন্তু চুরির জন্য চোরদের বিরুদ্ধে চুরির মামলা হয়েছে কি না, সে তথ্য দিলেন না।

যেসব ব্যাংকের টাকা চুরি হয়েছে, এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা চুরি হওয়ার বিভিন্ন কাহিনি পত্রিকার মাধ্যমে পাঠকেরা জানতে পেরেছেন। সেসব প্রতিবেদনে যে বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে ব্যাংকটির মালিকানা পরিবর্তনের অপরাধটি ফৌজদারি আইনের ‘চুরি’র (পেনাল কোডের ৩৭৮ ও ৩৭৯ ধারা) সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না; বরং বিবরণের উপাদান ‘ডাকাতি’র সংজ্ঞার (পেনাল কোডের ৩৯১ ও ৩৯৫ ধারা) সঙ্গে মেলে।

হাসিনার লুটপাটতন্ত্র যেভাবে সুশাসন ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিল

অপরাধের নাম চুরি হোক বা ডাকাতি হোক, যাঁদের হেফাজত থেকে আমানতকারীদের টাকা লোপাট হয়েছে, তাঁরা কেউ তো এ অপরাধের জন্য কোনো প্রকার চুরি-ডাকাতির মামলা করেছেন বলে শুনিনি। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে ব্যাংকের কর্মকর্তা বা মালিকেরা জানতেন না যে আমানতকারীদের টাকা চুরি হলে চোরদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে মামলা করতে হয়!

কেউ কেউ বলতে পারেন, টাকা লোপাট নিয়ে ইতিমধ্যে মামলা হয়েছে এবং আদালত অন্তত একটিতে শাস্তিও দিয়েছেন। আমি বলতে চাচ্ছি, চুরি ও ডাকাতির অভিযোগে মামলা হয়নি। মামলা হয়েছে অন্য রকমের অপরাধের জন্য।

আমি এখানে সবার কাছে পরিচিত দুটি গুরুতর অপরাধ চুরি ও ডাকাতি নিয়ে কথা বলছি। চুরি-ডাকাতি কী এবং কাকে বলে, তা এ দেশের মানুষকে বোঝানোর দরকার নেই। তাঁরা ভালোভাবেই জানেন।

হাসিনা আমলে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিবর্তনের যে রোমহর্ষ বিবরণ পত্রিকায় এসেছে, সেটি সঠিক হলে সে ঘটনা নিয়ে ডাকাতি মামলা না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। সে ঘটনার ভিকটিম তৎকালীন চেয়ারম্যান তখন থেকে এখন পর্যন্ত ডাকাতি মামলা করেছেন মর্মে কোনো সংবাদ দেখিনি। একইভাবে পরবর্তী গভর্নররা কেউ চুরি-ডাকাতির মামলা করেছেন বলে জানা নেই।

ব্যাংকমালিক হয়ে আমানত লুণ্ঠনের যত কায়দাকানুন

যেসব ব্যাংক থেকে টাকা চুরি বা ডাকাতি হলো, সেসব ব্যাংকের কর্মকর্তা ও বোর্ডের সদস্যরা কেউ নিজেদের আইনি দায়িত্ব সম্পাদন করার সূত্রে চুরি-ডাকাতির মামলা করেছেন বলেও শুনিনি।

প্রচলিত আইন বলছে, যাঁরা চুরি-ডাকাতি হওয়ার তথ্য জানা সত্ত্বেও মামলা করেননি, তাঁরা সবাই পেনাল কোডের ১৭৬ ধারার আলোকে জেল-জরিমানার শাস্তি পাওয়ার অপরাধ করে ফেলেছেন। পাঠক, মনে রাখবেন, ফৌজদারি আইনের অধীনে কৃত অপরাধের অভিযোগ-তদন্ত-বিচারের জন্য কোনো ‘টাইম বার’ নেই।

দেশের চূড়ান্ত আইন হলো সংবিধান। আমাদের সংবিধানের ২১ ধারায় প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ‘জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা’ একটি নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যংকে জমা রাখা আমানতকারীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি জাতীয় সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে কি না, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে আলোচনা চলতেই পারে। চুরি-ডাকাতি হওয়া টাকা হলো অপরাধের আলামত।

গভর্নর বলেছেন, ব্যাংক থেকে চুরি-ডাকাতি হওয়া আমানতকারীদের দেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু এই টাকা তো দেশের ১৮ কোটি মানুষের করের টাকা। এ দেশে গরিব-গুর্বা সবাই ভ্যাট-ট্যাক্স দেন। এই সিদ্ধান্ত কতটুকু নৈতিক?

একসঙ্গে এত ব্যাংক লুট বিশ্বের কোথাও হয়নি

আমাদের দেশের সাক্ষ্য আইন (এভিডেন্স অ্যাক্ট) অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বক্তব্য চোর শনাক্ত করে তদন্ত বা বিচারের কাজটি পরিচালনা করার জন্য একটি শক্তিশালী ও উচ্চ মূল্যের সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। তিনি ও তাঁরই তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিশ্চয়ই চুরি এবং চোরদের ইতিমধ্যে শনাক্ত করেছেন। এখন শুধু আদালতে মামলা করে সাক্ষ্য দিলেই চোরেরা শাস্তির আওতায় চলে আসবে।

আমাদের ফৌজদারি আদালতের বিচারকেরা চাইলে নিজেরাই মামলাটি দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে পারেন। সে রকম কোনো উদ্যোগী বিচারক যদি অপরাধীদের দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতেন, তাহলে আমাদের কৃষক-মজুরের শ্রমে-ঘামে উপার্জিত টাকা থেকে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করার প্রয়োজন দেখা দিত না।

ব্যাংকের এক–তৃতীয়াংশ টাকা চুরি-ডাকাতি হওয়ার উদাহরণ খুব বেশি নেই। সরকার যদি নির্ধারিত ভূমিকা রাখত এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যদি রেগুলেটরি দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করত, তবে এ রকম চুরি-ডাকাতি হওয়ার কথা নয়। তৎকালীন সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের এ অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গটি সংগত কারণেই পরীক্ষার দাবি রাখে। চুরি-ডাকাতির মামলা হলে বিষয়টি আপনা থেকেই চলে আসবে।

রিজার্ভ চুরির জন্য বাংলাদেশকে কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল

বর্তমানে দেশে প্রচলিত বিচারব্যবস্থাটি একটি বিদেশি বাণিজ্যিক কোম্পানি চালু করেছিল। সেই কোম্পানিটি যে সেনাপতির নেতৃত্বে বাংলা দখল করেছিল, তাকে ‘ব্যাংকার অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ খেতাবধারী এ দেশের তখনকার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী কাজটি সম্পাদন করার জন্য এত বিপুল পরিমাণ টাকা দেন যে সেই কর্নেল ক্লাইভ সেই টাকা নিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার পর ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন বনে যান। 

ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেই জুয়েল এক কর্নেল সাহেব জয় করার পর অন্য যে বিলাতি শাসক সম্প্রসারণ ও স্থায়িত্ব দেন, তাঁর নাম ওয়ারেন হেস্টিংস। কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসকে তাঁদেরই দেশ অভিশংসনের মুখোমুখি করেছিল। তাঁদের প্রকাশ্যে বিচার হয়েছিল। অন্যতম অভিযোগ ছিল, তাঁরা বাংলা ও ভারতের সম্পদ লুট করেছিলেন। ‘যাদের জন্য করল চুরি, তারাই বলে চোর’—এ রকমই ঘটেছিল।

আর আমরা চুরি হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রাখলাম। আরও পরিতাপের বিষয়, খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিচার হয়নি। তাহলে চোরতন্ত্রই কি অব্যাহত থাকবে?

মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source