আত্মার শুদ্ধতার পথে অনন্য এক যাত্রা: মক্কা পর্ব-১

· Prothom Alo

(ঢাকা থেকে মদিনা যাত্রা ও মদিনার অভিজ্ঞতা নিয়ে আগের পর্বে লিখেছি। এই পর্বে লিখছি মদিনা থেকে মক্কা যাত্রা নিয়ে)।

Visit newsbetsport.bond for more information.

মদিনা ছাড়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, মন ততই বিষণ্নতায় ছেয়ে যাচ্ছিল। ভীষণ মিস করব এই মসজিদ, এর বাইরের চত্বরের কবুতরগুলোকে, এর সকালে খোলা আর সন্ধ্যায় বন্ধ হওয়া ছাতাগুলোকেও। ভীষণ মিস করব এর ভেতরের সেই বেহেশতি পরিবেশ। আর সবচেয়ে বেশি মিস করব, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর রওজা মোবারকের কাছেই বসে মন খুলে ইবাদাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার সেই সুবর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে মদিনা ছেড়ে আসার দিন ফজরের ওয়াক্তে হারানো চশমা পরবর্তী সময়ে ফিরে পাওয়ার অলৌকিক ঘটনা আমাকে আপ্লুত করবে আজীবন। তার বিস্তারিত বর্ণনায় যাচ্ছি না।

মহানবী (সা.) মক্কাবাসীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে ও ইসলামের প্রচারণা আরও জোরদার করতে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসেছিলেন।

আর তার প্রায় ১৪৪৭ বছর পর (১ জিলহজ) আমরা চলেছি উল্টো পথে, মদিনা থেকে আমাদের যাত্রা মক্কার পথে, পবিত্র হজের নিয়তে। অধিকাংশ হাজি শুরুতে মক্কায় যান, পরে মদিনায় আসেন। আমি একটু বিপরীত পরিকল্পনা করেছি সময়ের স্বল্পতার জন্য। ৫ দিন মদিনায় থাকার পর আমাদের কাফেলা যাত্রা করল মক্কার দিকে।

আত্মার শুদ্ধতার পথে অনন্য এক যাত্রা: হজের মদিনা পর্ব

নিয়মানুযায়ী, আমরা মিকাত (হারাম শরিফের সীমানা) অতিক্রম করে ইহরাম পরার জন্য একটি নির্দিষ্ট মসজিদে ঢুকলাম। ইহরামের দুই টুকরা কাপড় গায়ে জড়িয়েই আমরা হোটেল থেকে বাসে উঠেছিলাম, নামাজ পড়ে শুরু হলো হজের উদ্দেশ্যে যাত্রা। এই নিয়ত শুধু বাহ্যিক নয়, আত্মিক। সব পঙ্কিলতা, পার্থিব লেনদেন, চাওয়াপাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার প্রতিই সবার ফোকাস তৈরি হয় ইহরামের নিয়ত করার সঙ্গে সঙ্গে। অন্যদের কথা জানি না, আমার মনে হলো, এই ইহরাম পরার সঙ্গে সঙ্গে জাগতিক সব কিছু থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। তাই, কাফেলার কেউ কেউ যখন ভিডিও কলে পরিবারের লোকেদের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত, বা দাপ্তরিক কলে উচ্চ স্বরে কথা বলছিলেন, আমার বিরক্ত লাগছিল। তবে এই যাত্রা এক অনন্য যাত্রা। এখানে কথা ও কাজে অনেক সংযমী হতে হয়। তাই বাইরের দৃশ্য দেখায় মন দিলাম। পাহাড় কেটে তৈরি এই মহাসড়ক৷ মাঝেমধ্যে মরুভূমির ভেতর দিয়ে ছুটে চলা। চোখে পড়ছিল পাহাড়ের চূড়ায় বসানো মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার। উপত্যকায় নির্মিত বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। আমার চাকরিজীবনের ২২ বছরের ১৮ বছরই কেটেছে টাওয়ারের সঙ্গে। তাই অন্য সব বাদ দিয়ে হয়তো এগুলোই আমার দৃষ্টিকে টানছিল। তবে মন বারবার ফিরে যায় মদিনায়। বাসে বসে কিছু বই পড়ছিলাম আর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম রাতে ওমরাহ করার। ঊষর মরুর প্রান্তর আর রুক্ষ পাহাড় দেখে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ কত ভাগ্যবান। আমাদের নদী, আমাদের উর্বর জমি, আমাদের মৌসুমি জলবায়ু—সবই আমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামত, অথচ আমরা তা উপলব্ধি করি না। মক্কায় এখন ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ভাবা যায়!

কাছাকাছি পৌঁছে দূর থেকে চিরচেনা উঁচু গাছটা দেখে যেমন মনে হয়, ‘আহ, এসে পড়েছি’, অনেকটা সেই রকম! ক্লক টাওয়ার একটি আধুনিক বাণিজ্যিক ভবন, এটি মাসজিদ আল হারামের খুব কাছে। এটা যে এত বিশাল, তা কোনো ছবি বা ভিডিও দেখে আন্দাজ করতে পারিনি।

মদিনা থেকে মক্কা প্রায় ৮ ঘণ্টার বাস যাত্রা শেষে মক্কার কাছাকাছি পৌঁছে আমরা তালবিয়া (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক) পড়তে শুরু করলাম। যখন দূর থেকে ক্লক টাওয়ারের চূড়া দেখা গেল, আবেগে তখন আপ্লুত কাফেলার সবাই। পাহাড় কেটে তৈরি করা এক টানেলে ঢুকে পড়ল আমাদের বাস। আর সেটা থেকে বের হয়ে মনে হলো ক্লক টাওয়ারের চূড়া আরও কাছে মনে হলো। বুকের ভেতর যেন উদ্বেল আবেগের ঢেউ! অনুভূতিটা অনেক দিন পর নিজের গ্রামের বাড়ির।

কাছাকাছি পৌঁছে দূর থেকে চিরচেনা উঁচু গাছটা দেখে যেমন মনে হয়, ‘আহ্‌, এসে পড়েছি’, অনেকটা সেই রকম! ক্লক টাওয়ার একটি আধুনিক বাণিজ্যিক ভবন, এটি মাসজিদুল হারামের খুব কাছে। এটা যে এত বিশাল, তা কোনো ছবি বা ভিডিও দেখে আন্দাজ করতে পারিনি।

সবার মুখে তখন ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিত হচ্ছে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

চোখের জল চলে আসে নিজের অজান্তে, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে আবেগে। আল্লাহর ঘর, যার সব দায়-দায়িত্ব যুগে যুগে আল্লাহ নিজে নিয়েছেন, আর তাঁর প্রিয় রাসুলদের ভার দিয়েছেন এর রক্ষণাবেক্ষণ, পুনর্নির্মাণ ও এর মহিমা সমুজ্জ্বল করার, সেই ঘরের খুব কাছে আমরা। এসেছি আত্মসমর্পণ করতে, আত্মাকে শুদ্ধ করতে। হাজির হয়েছি সেই মহান আল্লাহর একত্ববাদ, সার্বভৌমত্ব আর মহা পরাক্রমশীলতার প্রতি পূর্ণ আস্থা নিয়ে, তাঁর ক্ষমা ও করুণা লাভের আশায়।

রাসুলে কারিম মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে হজ আল্লাহ কবুল করেন, বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতিদান হলো জান্নাত!’

আল্লাহর ঘরের কাছে এসে তাই বারবার একটাই প্রার্থনা মনে আসে, যেন আমরা সবাই সঠিকভাবে হজ পালন করতে পারি।

যে দিনটা শুরু হয়েছিল ফজরের ওয়াক্তে চশমা হারিয়ে, তা শেষ হলো স্মরণীয় একটি ওমরাহ সম্পন্ন করে। চলবে...

*লেখক: কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী

Read full story at source