ব্রাজিলকে কাঁদানো ইতালির সেই ‘সোনার ছেলে’র পাপমোচন
· Prothom Alo

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের স্কোরবোর্ডটার দিকে যদি তাকান, আপনি কেবল একটা ফুটবল ম্যাচের ফলই জানবেন। ইতালি ৩, পশ্চিম জার্মানি ১। কিন্তু সেই সংখ্যার আড়ালে যে এক অবিশ্বাস্য গল্প লুকিয়ে ছিল, তার খোঁজ স্কোরবোর্ড দেবে না।
Visit bettingx.club for more information.
সেই গল্পের নায়কের নাম পাওলো রসি। যে মানুষটি দুই বছর আগে ছিলেন দেশের চোখে এক ‘ভয়ংকর এক পাপী’, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের খলনায়ক, তিনিই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সবুজ মাঠ ছাড়লেন ইতালির আরাধ্য দেবতা হয়ে।
১৯৮০ সালের দিকে ইতালির রোম শহরে একটা কৌতুক খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। চায়ের কাপে আড্ডা থেকে শুরু করে সেলুনের গুঞ্জনে মানুষ হাসাহাসি করে বলত, ‘এবারের সিরি আ জেতার সবচেয়ে বড় দাবিদার হলো রেজিনা কোয়েলি!’
ফুটবলপ্রেমী, অথচ এই ক্লাবের নাম কখনো শোনেননি? চট করে গুগলে খোঁজার দরকার নেই। রেজিনা কোয়েলি কোনো ফুটবল ক্লাব নয়, ওটি হলো রোমের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সুরক্ষিত কারাগারের নাম। সেই বছর ইতালির ফুটবলকে কাঁপিয়ে দেওয়া ‘তোতোনেরো’ নামের কুখ্যাত ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অপরাধে সিরি ‘আ’র ১১ জন তারকা ফুটবলারকে গ্রেপ্তার করে এই জেলেই পোরা হয়েছিল।
সারা দেশ যখন টেলিভিশনের পর্দায় স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল ড্রেসিংরুম থেকে ফুটবলারদের হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছে, ২৩ বছরের এক তরুণ স্ট্রাইকার হয়তো ঘরের কোণে বসে চিবুক ছুঁয়ে ভাবছিলেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কথা। তাঁর নাম পাওলো রসি।
১৯৭৮ বিশ্বকাপে ইতালির জার্সিতে দ্যুতি ছড়ানো, ভিচেনজার হয়ে দুই মৌসুমে ৪৫ গোল করে দলকে সিরি ‘আ’তে টেনে তোলা রসি তখন ইতালির ফুটবল আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সবচেয়ে দামি তারকাদের একজন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস। কয়েক দিন পর রসির কাছেও এল আদালতের সমন। তাঁকেও দাঁড়াতে হলো কাঠগড়ায়।
পাওলো রসিতোতোনেরো কেলেঙ্কারির নেপথ্যের কারিগর ছিলেন রোমের দুই ব্যবসায়ী—এক রেস্তোরাঁ মালিক আলভারো ত্রিনকা এবং এক দোকানদার মাসিমো ক্রুচিয়ানি। তারা একটা অবৈধ সিন্ডিকেটের সঙ্গে মিলে বড় বড় ম্যাচগুলোতে বাজি ধরতেন এবং ফল নিজেদের পক্ষে আনতে ফুটবলারদের টাকা খাওয়াতেন।
কিন্তু জুয়াড়িদের হিসাব তো আর সব সময় মেলে না। এক ম্যাচে ফুটবলাররা টাকা নিয়েও চুক্তি অনুযায়ী খেললেন না, মানে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। ব্যস, এই আনাড়ি জুটি অন্ধকার সিন্ডিকেটের কাছে রাতারাতি ১.৫ বিলিয়ন (দেড় শ কোটি) লিরার বিশাল দেনায় ডুবে গেল। সিন্ডিকেটের গুন্ডাদের হাত থেকে বাঁচতে তারা বুদ্ধি খাটাল। সোজা গিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করল এবং ড্রেসিংরুমের যেসব ‘ভদ্দরলোক’ ফুটবলার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল, তাদের নামও ফাঁস করে দিল।
রসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মারাত্মক। পেরুজিয়াতে ধারে খেলার সময় আভেলিনোর বিপক্ষে একটি ম্যাচ ২-২ গোলে ড্র করার জন্য ক্রুচিয়ানি ও ত্রিনকার কাছ থেকে তিনি নাকি ২০ লাখ লিরা (তৎকালীন সময়ে প্রায় ১,০০০ পাউন্ড) ঘুষ নিয়েছিলেন! রসি অবশ্য প্রথম দিন থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। অপরাধ আদালতেও তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ ছিল বড্ড দুর্বল। ফলে ফৌজদারি আদালত তাঁকে ‘গুরুতর জালিয়াতি’র অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।
কিন্তু ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন হাঁটল অন্য পথে। তারা আসলে বড় কোনো তারকাকে শাস্তি দিয়ে একটা উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছিল, কিংবা হতে পারে রসি তাঁর সতীর্থদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি হননি বলেই ফেডারেশন ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ যেটাই হোক, ফেডারেশন রসিকে তিন বছরের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করে দিল।
ব্রাজিলকে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছিলেন পাওলো রসিনিজের আত্মজীবনী ‘আই মেড ব্রাজিল ক্রাই’-এ রসি সেই অন্ধকার সময়ের কথা লিখেছিলেন বেশ ক্ষোভের সঙ্গে, ‘হঠাৎ করেই পুরো মহাবিশ্ব, যেখানে এত দিন আমাকে প্রায় অর্ধ-দেবতার আসনে বসিয়ে রাখা হয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। একটা ভুল এবং কাপুরুষোচিত রায়ের মাধ্যমে আমার পিঠে ছুরি মারা হলো।’
ম্যারাডোনার কান্না এবং আর্জেন্টিনার প্রথম মুকুটইতালির জাতীয় দলের চুরুটপ্রেমী কোচ এনজো বিয়ারজোত এই রায়ে আকাশ থেকে পড়লেন। সামনেই ১৯৮০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ, নিজেদের মাঠে খেলা। আর সেখানে দল নামাতে হবে প্রধান স্ট্রাইকারকে ছাড়াই! সেই টুর্নামেন্টে ইতালি চতুর্থ হয়ে শেষ করার পর ফিসফাস আর পর্দার আড়ালের নানামুখী সমীকরণে রসির শাস্তি তিন বছর থেকে কমিয়ে দুই বছর করা হলো। হিসাব কষে দেখা গেল, ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে মুক্তি পাবেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞার সেই নির্বাসিত জীবনেই জুভেন্টাস ১৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডের বিশাল অঙ্কে রসিকে দলে ভেড়ায়। আর নিষেধাজ্ঞা কাটতেই বিয়ারজোত কোনো ম্যাচ প্র্যাকটিস ছাড়াই রসিকে সরাসরি বিশ্বকাপের দলে ডেকে নিলেন। ইতালির সংবাদমাধ্যম খেপে লাল! মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি ম্যাচ খেলা একজন ‘ম্যাচ ফিক্সার’কে কোন আক্কেলে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে!
স্পেনের মাটিতে বিশ্বকাপের প্রথম কয়েক ম্যাচে সমালোচকদের কথাই ঠিক বলে মনে হচ্ছিল। মাঠে রসিকে দেখাল বড্ড ক্লান্ত, বলের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিলেন, চেনা ছন্দের ধারেকাছেও ছিলেন না। পেরুর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে যখন তাঁকে তুলে নেওয়া হলো, রসি নিজে হতাশ হয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি শুরু থেকেই বলছি, একটা মানুষ একা দল বদলে দিতে পারে না।’
ডাচদের টোটাল ফুটবল এবং জার্মান-যন্ত্রের জয়ইতালি কোনোমতে ধুঁকতে ধুঁকতে প্রথম পর্ব পার হলো। রসি নিজেই সেই নারকীয় পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘পোল্যান্ড, পেরু আর ক্যামেরুনের সঙ্গে তিনটা ড্র। গোল পার্থক্যের জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে পরের পর্বে যাওয়া। সমালোচনা আর বিতর্কের শেষ নেই—রসি গোল পাচ্ছে না, রসি একটা বিপর্যয়, রসি মাঠে নামছে নাকি ঘুমাচ্ছে!’
এই ঘোর হতাশার পরেই ফুটবল ইতিহাস দেখল তাঁর জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় মোড়। দ্বিতীয় পর্বে ইতালির সামনে তখন টুর্নামেন্টের হট ফেবারিট, জিকো-সক্রেটিস-ফ্যালকাওদের সেই জাদুকরি ব্রাজিল। সেমিফাইনালে যেতে হলে ইতালিকে জিততেই হতো।
বিয়ারজোতের জেদেই গোলহীন রসি সেদিনও মাঠে নামলেন। আর ম্যাচের ঠিক পঞ্চম মিনিটে যেন রসির ভেতরের কোনো গোপন সুইচ অন হয়ে গেল। আন্তোনিও কাব্রিনির ক্রসে লাফিয়ে উঠে দারুণ এক হেডে বল জালে জড়ালেন। রসি পরে লিখেছিলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে মধুরতম স্মৃতি হিসেবে এটা মনে থাকবে। গোলটা করার পর নিজেকে এতটাই হালকা লাগছিল, ঠিক যেন কেউ ভেজা স্যাঁতসেঁতে জামাকাপড় শরীর থেকে এক ঝটকায় খুলে ফেলেছে!’
বিরাশির বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে ইতালির রসিসেদিন আর রসিকে থামানো যায়নি। জিকোর ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলকে একাই খুন করলেন হ্যাটট্রিক করে। ইতালি জিতল ৩-২ ব্যবধানে। সেমিফাইনালে পোল্যান্ডের বিপক্ষে আবার রুদ্রমূর্তি, এবার করলেন জোড়া গোল। আর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির রক্ষণ ভেঙে প্রথম গোলটি তো তাঁরই করা।
এক অদ্ভুত রূপকথা! যে রসি প্রথম চার ম্যাচে ছিলেন খলনায়ক, টুর্নামেন্ট শেষে তিনিই ইতালির হাতে বিশ্বকাপ এনে দিয়ে জিতলেন সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘গোল্ডেন বুট’ এবং সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’। সেই বছরের শেষভাগে তাঁর হাতে যখন ‘ব্যালন ডি’অর’ তুলে দেওয়া হলো, তখন তিনি একই সঙ্গে বিশ্বকাপ, গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল ও ব্যালন ডি’অর জেতা ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ‘গোল্ডেন কোয়ার্টেট’ পূর্ণ করলেন।
তবে স্পেনের সেই জাদুকরি গ্রীষ্মের পর রসির ক্যারিয়ারের গ্রাফ আর কখনো অতটা উঁচুতে ওঠেনি। ১৯৮৫ সালে হেয়সেল স্টেডিয়ামের সেই ট্র্যাজিক ফাইনালে জুভেন্টাসকে ইউরোপিয়ান কাপ জেতাতে সাহায্য করলেও হাঁটুর চোট তাঁর ক্যারিয়ারকে ঝাঁজরা করে দিয়েছিল। মাত্র ৩১ বছর বয়সে ফুটবলকে বিদায় জানাতে বাধ্য হন ইতালির সোনার ছেলে ‘পাবলিতো’।
১৯৭০ মেক্সিকো: পেলের অমরত্ব এবং জুলে রিমে ট্রফির চিরতরে ব্রাজিলের হয়ে যাওয়া