কোরবানির পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে পুরোনো ধারা
· Prothom Alo
যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতা-কর্মী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছেই কোরবানির পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ থাকে। কোথাও তাঁরা সরাসরি ইজারাদার হিসেবে থাকেন, আবার কোথাও নেপথ্যে থেকে হাট পরিচালনা করেন। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের বাইরে অন্য কেউ দরপত্র দাখিল করার সাহসও পান না। যদিও কাগজে-কলমে দেখানো হয়—নিয়ম মেনেই দরপত্রের মাধ্যমে হাটের ইজারা নেওয়া হয়েছে।
Visit moryak.biz for more information.
আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শাসনামলে রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল দলটির নেতা-কর্মীদের কাছে। গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই নিয়ন্ত্রণ এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠজনদের কাছে।
কে কত দর উল্লেখ করবেন, তা সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করে রাখা হতো। আওয়ামী লীগ বা দলটির ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বাইরে অন্য কেউ যাতে দরপত্র জমা দিতে না পারেন, সেই ব্যবস্থাও থাকত। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও পুরোনো সেই ধারা খুব বেশি বদলায়নি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় দলটির নেতা-কর্মীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমঝোতার মাধ্যমে দরপত্র দাখিল করতেন। আগেই ঠিক করা হতো কোন হাট কে ইজারা নেবেন। যদিও পুরো প্রক্রিয়াকে ‘প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ’ দেখানো হতো। একটি হাটে যাতে একাধিক দরপত্র জমা হয়, সেই ব্যবস্থা করতেন তাঁরা। কে কত দর উল্লেখ করবেন, তা সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করে রাখা হতো। আওয়ামী লীগ বা দলটির ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বাইরে অন্য কেউ যাতে দরপত্র জমা দিতে না পারেন, সেই ব্যবস্থাও থাকত। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও পুরোনো সেই ধারা খুব বেশি বদলায়নি।
এবার রাজধানীতে অস্থায়ী পশুর হাট বসবে ২১টি। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১১টি আর ঢাকা দক্ষিণে ১০টি। উত্তরের সব কটি অস্থায়ী হাট এবার ইজারা পেয়েছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা। কোথাও সরাসরি ইজারাদার হিসেবে রয়েছেন, কোথাও আবার হাট পরিচালনার নেপথ্যে আছেন তাঁরা। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণে অস্থায়ী ১০টি পশুর হাটের মধ্যে ৮টির ইজারাদার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। একটি হাটের ইজারা পেয়েছে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান। আরেকটি হাটের ইজারাদার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ী।
নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা। আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে চলেছে এখনো যদি সেভাবেই চলে, তাহলে পরিবর্তন হলো কোথায়? এবার কোরবানির পশুর হাটের ইজারার ক্ষেত্রে দেখা গেল প্রায় সব হাট ঘুরেফিরে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ইজারা নিয়েছেন। এসব ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
একটি হাটের ইজারা পেয়েছে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান। আরেকটি হাটের ইজারাদার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ী।
দক্ষিণের ৮টিতেই বিএনপি
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, কোনো হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে সরকারি দরের প্রায় চার গুণ বেশি মূল্যে। আবার কোনোটির ইজারামূল্য সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি। যেমন ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য সরকারি ইজারামূল্য ছিল ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায়। আবার সিকদার মেডিকেল কলেজ-সংলগ্ন এলাকায় অস্থায়ী হাটের ইজারামূল্য ছিল ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি দরে এই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মাওলা আওয়ামী লীগ আমলে হাট ইজারা নেওয়ার মতো অবস্থা অন্য কোনো দলের কারও ছিল না। এবার হাট ইজারার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছিল। ২ কোটি ৭১ লাখ টাকার হাট ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছি।পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পারের পশুর হাট ইজারা পেয়েছেন শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মাওলা। এই হাট ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এই হাট ইজারা নিতেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মইন উদ্দিন চিশতী; আর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় এই হাটের ইজারা পেয়েছিলেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মুহাম্মদ আলী নামের এক ব্যক্তি।
এই হাট ইজারা পাওয়া শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মাওলা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে হাট ইজারা নেওয়ার মতো অবস্থা অন্য কোনো দলের কারও ছিল না। এবার হাট ইজারার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছিল। ২ কোটি ৭১ লাখ টাকার হাট ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছি।’
উত্তর শাহজাহানপুরে মৈত্রী সংঘ ক্লাব-সংলগ্ন হাট ইজারা পেয়েছেন ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান। তিনি ৩ কোটি ১২ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা নিয়েছেন। আনিসুর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। গত বছরও এই হাটের ইজারা পেয়েছিলেন তিনি। এর আগে এই হাট ইজারা নিতেন আওয়ামী লীগের সাবেক কাউন্সিলর হামিদুল হক এবং শাহজাহানপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল লতিফ।
ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকার পশুর হাট ইজারা পেয়েছেন ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীন। ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন তিনি। গত বছরও এই হাটের ইজারা তিনি পেয়েছিলেন। এর আগে এই হাটের ইজারা নিতেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এস এম নেওয়াজ সোহাগ নামের এক ব্যবসায়ী।
ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের পাশের পশুর হাট ইজারা নিয়েছেন মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। তিনি মতিঝিল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। ৩ কোটি ১ লাখ টাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন তিনি।
রহমতগঞ্জ ক্লাবের পাশের হাট ইজারা পেয়েছেন রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির সভাপতি টিপু সুলতান। তিনি চকবাজার থানা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি। গত বছরও হাটটির ইজারা নিয়েছিলেন তিনি। এর আগে এই হাটের ইজারাদার ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান সেলিম।
ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের পাশের পশুর হাট ইজারা নিয়েছেন মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। তিনি মতিঝিল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। ৩ কোটি ১ লাখ টাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন তিনি।
গোপীবাগের সাদেক হোসেন খোকা খেলার মাঠের পাশে অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা পেয়েছেন কাজী ইমরান হোসেন। তিনি বিএনপি সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এই হাটের সরকারি ইজারামূল্য ছিল ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সরকারি দর থেকে ৫০ লাখ টাকা কমে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা দিয়েছে সিটি করপোরেশন।
গোলাপবাগ এলাকার হাট ইজারা পেয়েছে বারাকা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন এনসিপির এক নেতার ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে। ওই নেতা আগে বিএনপি করতেন। কিছুদিন আগে এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন।
বনশ্রী এলাকার হাট পেয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর গোলাম হোসেন। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পানির পাম্প-সংলগ্ন পশুর হাট ইজারা পেয়েছে কে বি ট্রেড। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. শামীম খান জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সিকদার মেডিকেল কলেজ এলাকার হাট ইজারা পেয়েছেন নাফিজ কবির। সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, নাফিজ বিএনপি সরকারের একজন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
সব মিলিয়ে এবার ঢাকা দক্ষিণের ১০টি অস্থায়ী হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে ২৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকায়। যদিও এসব হাটের জন্য সরকার নির্ধারিত ইজারা মূল্য ছিল ১৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
উত্তরে ‘অন্য কেউ নেই’
ঢাকা উত্তরের অস্থায়ী হাটগুলো থেকে নির্ধারিত সরকারি দরের বিপরীতে দ্বিগুণের বেশি টাকা ইজারামূল্য পাওয়া গেছে। অস্থায়ী ১১টি হাটের ইজারার জন্য সরকারি দর ছিল ১৬ কোটি ৬১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ইজাদারদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে ৩৩ কোটি ৩৯ লাখ ২৪ হাজার টাকা।
অস্থায়ী ১১টি হাটের মধ্যে ৯টি ইজারা পেয়েছেন বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের পদধারী নেতারা। বাকি দুটি হাটের ইজারাদার ব্যবসায়ী হলেও হাট পরিচালনায় যুক্ত আছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
অস্থায়ী হাটের ইজারা কীভাবে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা পেলেন—এমন প্রশ্নে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, দলীয় বিবেচনায় হাটের ইজারা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সবার জন্য অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছিল। সর্বোচ্চ দরদাতা ও শর্ত পূরণকারী ব্যক্তিকেই মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে। কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি।
উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউবাজার এলাকার পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান এসএফ করপোরেশন ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় এই হাট ইজারা নিয়েছেন।
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম। এই হাট পরিচালনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা বিএনপির সভাপতি আইনুল ইসলাম এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল আলম যুক্ত আছেন বলে জানিয়েছেন আমিনুল।
বাড্ডা থানার অন্তর্গত স্বদেশ প্রোপার্টিজ এলাকায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তুহিরুল ইসলাম। বড় বেরাইদ এলাকায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আতাউর রহমান।
পূর্ব হাজীপাড়া এলাকার ইকরা মাদ্রাসা–সংলগ্ন পশুর হাট ইজারা পেয়েছেন জিয়া মঞ্চ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং রামপুরা থানা বিএনপির সদস্য এম আসলাম।
কাঁচকুড়া বাজার-সংলগ্ন রহমান নগর আবাসিক এলাকায় যে হাট বসবে, সেটির ইজারা পেয়েছেন উত্তরখান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম সরকার। এই হাট পরিচালনায় আছেন উত্তরখান থানা যুবদলের সাবেক সভাপতি রুস্তম আলী ব্যাপারীসহ ওয়ার্ড বিএনপির কয়েকজন নেতা। তবে হাটটির জায়গা পরিবর্তন করে উত্তরখান তেরমুখ ইটভাটা এলাকায় নেওয়া হয়েছে বলে সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়।
বনরূপা আবাসিক প্রকল্পে পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।
মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের (ইস্টার্ন হাউজিং) খালি জায়গায় বসবে পশুর হাট। এই হাটের ইজারা পেয়েছেন সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা পদপদবি নেই; তিনি ব্যবসায়ী।
তবে স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিরাজুল ইসলামের নামে ইজারা নেওয়া হলেও এই হাট পরিচালনার দায়িত্বে আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম এবং রূপনগর থানা বিএনপির সদস্য এম আশরাফুল ইসলাম।
মিরপুরের কালশী বালুর মাঠ এলাকায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন ব্যবসায়ী রেদোয়ান রহমান। এই হাট পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব আনোয়ার হোসেন পল্লবী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
খিলক্ষেতের পশ্চিম পাড়া এলাকায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন খিলক্ষেত থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন। তবে ঢাকা উত্তর সিটির সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবার বলছেন, জামানতের টাকা দিলেও ইজারাপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পর বিল্লাল হোসেন আর কোনো টাকা জমা দেননি। তাঁর জামানত বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া চলছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আকতার হোসেনআওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো হাটের ইজারা নেওয়ার সুযোগ তিনি পাননি; বরং মামলা ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, কারাগারে যেতে হয়েছে।এ বিষয়ে বিল্লাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ওই জায়গায় স্থানীয়দের বসতবাড়ি থাকায় হাট বসানোর মতো পরিস্থিতি নেই। বিষয়টি সিটি করপোরেশনের কাছে লিখিতভাবে তিনি জানিয়েছেন।
৩০০ ফুট সড়কসংলগ্ন ডুমনি মৌজায় পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আকতার হোসেন। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো হাটের ইজারা নেওয়ার সুযোগ তিনি পাননি; বরং মামলা ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, কারাগারে যেতে হয়েছে।
আকতার হোসেন বলেন, একাধিক ব্যক্তি হাট ইজারা নিতে দরপত্রে অংশ নিয়েছেন এবং নিয়ম মেনেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির একমাত্র স্থায়ী হাট গাবতলী পশুর হাট এ বছর ইজারা নিয়েছেন হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ। তিনি বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
শর্ত মানেন না কেউ
এর বাইরে রাজধানীতে স্থায়ী পশুর হাট আছে দুটি। একটি গাবতলীতে, যা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন। আরেকটি ডেমরার সারুলিয়ায়, এই হাট ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন। স্থায়ী হাট দুটিতে সারা বছর পশু কেনাবেচা চলে।
অস্থায়ী হাটগুলোতে পশু কেনাবেচা হয় কোরবানির ঈদের সময় পাঁচ দিন। আগামীকাল রোববার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির অস্থায়ী হাটগুলোতে কোরবানির পশু কেনাবেচা শুরু হবে, যা চলবে ঈদের দিন (বৃহস্পতিবার, ২৮ মে) পর্যন্ত। ইতিমধ্যে কয়েকটি হাটে কোরবানির পশু আসতে শুরু করেছে।
কোরবানির পশুর হাট ঘিরে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সমন্বয় সভা করেছে। সেখানে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন হাটের ইজারাদার বা তাঁদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পশুর হাটকেন্দ্রিক নিরাপত্তা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ইজারাদারদের করণীয়, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, পাচার রোধ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সেই সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়েছে।
সমন্বয় সভার পর ডিএমপির পক্ষ থেকে কিছু নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগে হাট না বসানো, হাটের চৌহদ্দি না ছাড়ানো, কন্ট্রোল রুম, ওয়াচ টাওয়ার, সিসি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলো, জাল নোট শনাক্তের মেশিন ও ব্যাংকিং-সুবিধা পশুর হাটগুলোতে রাখতে হবে।
প্রতিবছরই দেখা যায়, হাট সীমানা ছাড়িয়ে সড়ক, ফুটপাত ও আবাসিক এলাকার ভেতরে ঢুকে পড়ে। পশুবাহী ট্রাক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে যানজট বাড়ে, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি হয়।
ডিএমপি বলেছে, পশু কোন হাটে যাবে, তা ব্যবসায়ীরাই ঠিক করবেন; এক হাটের পশু অন্য হাটে নামানো যাবে না। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অজ্ঞান পার্টি ও অবৈধ প্রভাব বিস্তার রোধে পশুর হাটগুলোতে পুলিশের নজরদারি থাকবে।
সাধারণত ইজারাদারদের শর্ত দেওয়া হয়—আবাসিক এলাকায় হাট বসানো যাবে না, প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল করা যাবে না, যান চলাচলে বাধা দেওয়া যাবে না, নির্ধারিত সীমানার বাইরে হাট বাড়ানো যাবে না এবং পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করতে হবে। তবে প্রতিবছরই দেখা যায়, হাট সীমানা ছাড়িয়ে সড়ক, ফুটপাত ও আবাসিক এলাকার ভেতরে ঢুকে পড়ে। পশুবাহী ট্রাক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে যানজট বাড়ে, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি হয়।
কেউ শর্ত ভঙ্গ করে পশুর হাট বসালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রথম আলোকে জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ইজারাদারের কারণে মানুষের চলাচল ও যানজটের যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য পুলিশকে তৎপর থাকতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনও সামর্থে৵র মধ্যে যতটুকু সম্ভব, ততটুকু করার চেষ্টা করবে।