বাংলার প্যাঁচাদের রহস্যময় জগৎ
· Prothom Alo

নিশুতি রাতের সুনসান নীরবতা যখন বাংলার গ্রাম কিংবা বনাঞ্চলকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখনই এক মায়াবী জগতের পর্দা উন্মোচিত হয়। প্রকৃতির এই অন্ধকারে ডানা মেলে ওড়ে জীবজগতের অন্যতম রহস্যময় শিকারি প্যাঁচা। লোকগাথা আর কুসংস্কারের কুয়াশা সরিয়ে যদি এদের চেনা যায়, তবে দেখা মিলবে প্রকৃতির নিখুঁত বাস্তুতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরীদের। শিকার ধরার অদম্য কৌশল, নিঃশব্দ ওড়ার ক্ষমতা এবং প্রজাতিভেদে চমৎকার বৈচিত্র্যময় ডাক প্যাঁচাদের করেছে অনন্য।
Visit sportbet.rodeo for more information.
আন্তর্জাতিক পাখিবিষয়ক তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৭ থেকে ২০ প্রজাতির প্যাঁচার অস্তিত্ব রয়েছে। ক্ষুদ্র খুঁড়ুলে প্যাঁচা থেকে শুরু করে বনের বিশাল শিকারি হুতুম কিংবা মেছো প্যাঁচা—প্রতিটি প্রজাতিরই রয়েছে নিজস্ব রূপ, স্বভাব ও জীবনধারা।
প্যাঁচা কীভাবে নিঃশব্দে ওড়েসাধারণত পুরোনো জমিদারবাড়ি, প্রাচীন মন্দিরের চূড়া, পরিত্যক্ত অট্টালিকার ঘুলঘুলি, ধানের গোলা কিংবা শতবর্ষী বট-পাকুড়ের অন্ধকার কোটরে লক্ষ্মীপেঁচারা সংসার পাতে।
লক্ষ্মীপেঁচা ও সাউন্ড রাডার
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের বসতভিটা আর গ্রামীণ লোকবিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে নিশাচর পাখিটি, তা হলো লক্ষ্মীপেঁচা (Tyto javanica)। বাংলার চিরায়ত লোকসংস্কৃতিতে একে ধনসম্পদ ও শস্যের দেবী লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। পানের পাতা বা হৃৎপিণ্ডের মতো নিখুঁত সাদাটে মুখমণ্ডল, কাজলকালো মায়াবী চোখ এবং পিঠের ওপর সোনালি-বাদামি ও রুপালি-ধূসর পালকের মখমলের মতো কারুকাজ এদের দিয়েছে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। তবে এদের এই হৃৎপিণ্ডাকৃতির মুখমণ্ডল কেবল সৌন্দর্যের জন্যই নয়; এটি মূলত প্রাকৃতিক সাউন্ড রাডারের কাজ করে। মুখের পালকের এই বিশেষ বৃত্তাকারের কারণে অতি মৃদু শব্দও প্রতিফলিত হয়ে সরাসরি এদের মাথার দুই পাশে অসম উচ্চতায় থাকা কানের ছিদ্রে পৌঁছায়। ফলে ঘুটঘুটে অন্ধকারেও শুকনো পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা ইঁদুরের সামান্য খসখস শব্দ এরা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে।
বাংলার চিরায়ত লোকসংস্কৃতিতে লক্ষ্মীপেঁচাকে ধনসম্পদ ও শস্যের দেবী লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে কল্পনা করা হয়েছেডানার পালকের খাঁজকাটা গঠনের কারণে বাতাসে কোনো ডানা ঝাপটানোর শব্দ না করেই এরা ছায়ার মতো ভেসে বেড়ায়। সাধারণত পুরোনো জমিদারবাড়ি, প্রাচীন মন্দিরের চূড়া, পরিত্যক্ত অট্টালিকার ঘুলঘুলি, ধানের গোলা কিংবা শতবর্ষী বট-পাকুড়ের অন্ধকার কোটরে এরা সংসার পাতে। অন্য প্যাঁচাদের মতো গম্ভীর ‘হুম-হুম’ ডাকের বদলে এদের গলা থেকে বের হয় তীক্ষ্ণ, ফ্যাসফেসে চিৎকার, যা নিস্তব্ধ রাতে হঠাৎ শুনলে যে কারোরই গা ছমছম করে উঠতে পারে। তবুও রাতের আঁধারে মাঠের পর মাঠ ফসল বিনষ্টকারী ইঁদুর নিধন করে এরা কৃষকের যে উপকার করে, তার কোনো বিকল্প নেই। একজোড়া লক্ষ্মীপেঁচা ও তাদের ছানারা বছরে হাজারেরও বেশি ইঁদুর সাবাড় করে শস্যক্ষেতকে সুরক্ষিত রাখে।
বাঁশপ্যাঁচা বা শিঙ্গেল প্যাঁচাঅন্য প্যাঁচাদের মতো গম্ভীর হুম-হুম ডাকের বদলে লক্ষ্মীপেঁচাদের গলা থেকে বের হয় তীক্ষ্ণ, ফ্যাসফেসে চিৎকার, যা নিস্তব্ধ রাতে হঠাৎ শুনলে যে কারোরই গা ছমছম করে উঠতে পারে।
মেঠো লক্ষ্মীপেঁচা বা ঘাসপেঁচা
লক্ষ্মীপেঁচার ঠিক ঘনিষ্ঠ জাতভাই দুর্লভ মেঠো লক্ষ্মীপেঁচা বা ঘাসপেঁচা (Tyto longimembris)। একই টাইটোনিডি পরিবারের সদস্য হওয়ায় এদের মুখের গড়নও লক্ষ্মীপেঁচার মতোই পানপাতার আকৃতির। তবে স্বভাব ও আবাসস্থলের দিক থেকে এরা একেবারেই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা। মানুষের কোলাহল বা ইটের দালানকোঠা এড়িয়ে এরা নিজেদের রাজত্ব গড়ে তোলে নদীর নির্জন চরাঞ্চল, হাওরের প্রান্তর এবং মাইলের পর মাইল বিস্তৃত দীর্ঘ কাশবন ও উলুখড়ের বনে। লক্ষ্মীপেঁচার তুলনায় এদের পিঠের রং অনেকটা গাঢ় চকলেট-বাদামি এবং ঘন ঘাসের ভেতর দিয়ে অনায়াসে চলাফেরার সুবিধার্থে এদের পাগুলো হয় তুলনামূলকভাবে বেশ লম্বা।
স্বভাব ও আবাসস্থলের দিক থেকে ঘাসপেঁচারা একেবারেই ভিন্ন মেরুর বাসিন্দাএদের জীবনযাত্রার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো বাসস্থান। গাছের কোটরের বদলে এরা সরাসরি মাটির ওপর ঘন ঘাসের জটলার নিচে সুড়ঙ্গের মতো গোল পথ তৈরি করে নিজেদের গোপন ডেরা সাজায়। সন্ধ্যার অন্ধকার নামলে এরা কাশবনের ঠিক ওপর দিয়ে বাতাসে ভেসে বেড়ায় এবং মাটির কাছাকাছি লুকিয়ে থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শিকারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। ঘাসের নিচে মেঠো ইঁদুর, ছুঁচো বা ব্যাঙের অস্তিত্ব টের পেলেই লম্বা পা বাড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাশবনের গহিনে।
সব পাখি কেন উড়তে পারে নালক্ষ্মীপেঁচার তুলনায় মেঠো লক্ষ্মীপেঁচা বা ঘাসপেঁচাদের পিঠের রং অনেকটা গাঢ় চকলেট-বাদামি এবং ঘন ঘাসের ভেতর দিয়ে অনায়াসে চলাফেরার সুবিধার্থে এদের পাগুলো হয় তুলনামূলকভাবে বেশ লম্বা।
খুঁড়ুলে প্যাঁচা
বসতবাড়ির আঙিনায় থাকা প্রবীণ আম, জাম, কড়ই কিংবা রেইনট্রি গাছের কোটরে সবচেয়ে বেশি শোরগোল ও চঞ্চলতা তৈরি করে যে ক্ষুদ্রাকার পাখিটি, তার নাম খুঁড়ুলে প্যাঁচা বা খুঁড়েপেঁচা (Athene brama)। আকারে শালিক বা ময়নার চেয়ে খুব একটা বড় নয় এরা, কিন্তু স্বভাবে বেশ ডানপিটে ও কৌতূহলী। এদের ধূসর-বাদামি শরীরের ওপর সাদা রঙের নিখুঁত ফোঁটা ফোঁটা দাগ, চোখের ওপরে সাদা ভ্রু-রেখা এবং উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ রঙের বড় দুটি চোখ যে কারোরই নজর কাড়ে।
আকারে শালিক বা ময়নার চেয়ে খুব একটা বড় নয় খুঁড়েপেঁচারা, কিন্তু স্বভাবে বেশ ডানপিটে ও কৌতূহলীঅন্য অনেক প্যাঁচার মতো এরা একাকী নিভৃতচারী নয়; বরং জোড়ায় জোড়ায় কিংবা চার-পাঁচটির ছোট পারিবারিক দলে গাছের পুরোনো কোটর বা দালানের ফাঁকফোকরে গাদাগাদি করে থাকতেই বেশি ভালোবাসে। পুরোপুরি নিশাচর হলেও বিকেলের মৃদু রোদে কিংবা ভোরের আলোয় কোটরের মুখে বসে এদের প্রায়ই রোদ পোহাতে দেখা যায়। গোধূলির আলো মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গেই এদের কর্কশ ‘চিরর-চিরর-খিক-খিক’ হাসির মতো ডাক আর অবিরাম চ্যাঁচামেচিতে গ্রামের নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে যায়।
পাখি টানা কতদিন আকাশে উড়তে পারেখুঁড়ুলে প্যাঁচা বা খুঁড়েপেঁচাদের ধূসর-বাদামি শরীরের ওপর সাদা রঙের নিখুঁত ফোঁটা ফোঁটা দাগ, চোখের ওপরে সাদা ভ্রু-রেখা এবং উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ রঙের বড় দুটি চোখ যে কারোরই নজর কাড়ে।
খয়েরি মেছো প্যাঁচা ও এর জ্ঞাতি ভাইয়েরা
জলাভূমি ও নদীমাতৃক বাংলাদেশের জলের কিনারে রাজত্ব করা সবচেয়ে রাজকীয় ও প্রভাবশালী নিশাচর শিকারি খয়েরি মেছো প্যাঁচা বা ভূতুম প্যাঁচা (Ketupa zeylonensis)। আকারে বেশ বড়সড়, পেশিবহুল এবং ভারী গড়নের এই প্যাঁচাদের গায়ের রং উজ্জ্বল তামাটে-বাদামি। বুকজুড়ে থাকে সুস্পষ্ট কালচে খাড়া ডোরাকাটা দাগ। এদের চেহারায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ভীতিজাগানিয়া দিক হলো মাথার দুই পাশে ঝুলে থাকা বা খাড়া হয়ে থাকা পালকের দীর্ঘ দুটি কান-ঝুঁটি এবং অন্ধকারে জ্বলজ্বল করা প্রকাণ্ড হলুদ চোখ। সুন্দরবনের গহিন খাঁড়ি, হাওরাঞ্চল এবং গ্রামের শতবর্ষী দিঘির পাড়ের ঝুলে থাকা মোটা গাছের ডালে এরা মূর্তির মতো চুপচাপ বসে থাকে। মাছ ও জলজ প্রাণী শিকারের জন্য প্রকৃতি এদের শরীরে দিয়েছে এক অনন্য অভিযোজন। সাধারণ প্যাঁচাদের পা পালকে ঢাকা থাকলেও মেছো প্যাঁচার পায়ের নিচের অংশ থাকে সম্পূর্ণ পালকহীন, যাতে পানিতে ছোঁ মারার সময় পালক ভিজে শরীর ভারী না হয়ে যায়।
আকারে বেশ বড়সড়, পেশিবহুল এবং ভারী গড়নের এই ভূতুম প্যাঁচাদের গায়ের রং উজ্জ্বল তামাটে-বাদামিনিশুতি রাতে জলমহাল বা নদীর ধার থেকে ভেসে আসা এদের গম্ভীর, ফাঁপা ‘বুম-ও-বুম’ বা ‘হুম-হুম’ ডাক চারপাশের অন্ধকারে এক আদিম ও গা ছমছমে আবহ তৈরি করে। বাংলাদেশে এই মেছো প্যাঁচার আরও দুটি দুর্লভ জ্ঞাতি ভাই রয়েছে, যার একটি হলো সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় বনে বসবাসকারী মেটে মেছো প্যাঁচা (Ketupa ketupu)। অন্যটি সিলেট ও চট্টগ্রামের গহিন পাহাড়ি ছড়া ও খরস্রোতা নদীর ধারে লুকিয়ে থাকা উজ্জ্বল কমলা-বাদামি রঙের তামাটে মেছো প্যাঁচা (Ketupa flavipes)।
পেঙ্গুইন কেন উড়তে পারে নাভূতুম প্যাঁচাদের চেহারায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ভীতিজাগানিয়া দিক হলো মাথার দুই পাশে ঝুলে থাকা বা খাড়া হয়ে থাকা পালকের দীর্ঘ দুটি কান-ঝুঁটি এবং অন্ধকারে জ্বলজ্বল করা প্রকাণ্ড হলুদ চোখ।
হুতুমপেঁচা
প্যাঁচাদের রাজ্যে সবচেয়ে রাজকীয়, দাপুটে আর গা ছমছমে উপস্থিতি হলো হুতুমপেঁচা বা মেঠো হুতুমপেঁচার (Bubo bengalensis)। এদের প্রকাণ্ড ও ভারী দেহ, লোহার সাঁড়াশির মতো পেশিবহুল থাবা, জ্বলজ্বলে কমলা-হলুদ চোখ এবং মাথার ওপর শিংয়ের মতো খাড়া হয়ে থাকা দুটি দীর্ঘ পালকের ঝুঁটি এদের চেহারায় এনে দেয় এক দুর্ভেদ্য ও ভূতুড়ে গাম্ভীর্য। লোকালয়ের কোলাহল এড়িয়ে গ্রামের প্রান্তের নির্জন শ্মশানঘাট, প্রাচীন বট-অশ্বত্থের মগডাল, পরিত্যক্ত ভাঙা জমিদারবাড়ি কিংবা গহিন বাঁশঝাড়েই এরা নিজেদের একচ্ছত্র রাজত্ব গড়ে তোলে।
প্যাঁচাদের রাজ্যে সবচেয়ে রাজকীয়, দাপুটে আর গা ছমছমে উপস্থিতি হলো হুতুমপেঁচারনিশুতি রাতের আকাশে এরা যখন বিশাল ডানা মেলে নিঃশব্দে ছায়ার মতো নেমে আসে, তখন বড় আকারের ধেড়ে ইঁদুর, বুনো খরগোশ, সাপ এমনকি মাঝারি আকারের অন্য পাখিরও এদের তীক্ষ্ণ নখর থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকে না। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে আসা এদের ভরাট, গম্ভীর ও দীর্ঘ ‘বুম-বুম’ ডাক চরাচরের বুক কাঁপিয়ে মুহূর্তেই যে কারোর শিরদাঁড়ায় হিমশীতল স্রোত বইয়ে দেয়।
বিদ্যুতের তারে পাখি বসলে শক লাগে না কেনলোকালয়ের কোলাহল এড়িয়ে গ্রামের প্রান্তের নির্জন শ্মশানঘাট, প্রাচীন বট-অশ্বত্থের মগডাল, পরিত্যক্ত ভাঙা জমিদারবাড়ি কিংবা গহিন বাঁশঝাড়েই হুতুমপেঁচারা নিজেদের একচ্ছত্র রাজত্ব গড়ে তোলে।
পাহাড়ি হুতুমপেঁচা ও বনের অন্যান্য পেঁচা
সিলেটের লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরসবুজ পাহাড়ি অরণ্য আরও কিছু বিরল ও মায়াবী প্যাঁচার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এদের মধ্যে অন্যতম ভয়ংকর সুন্দর শিকারি হলো পাহাড়ি হুতুমপেঁচা (Bubo nipalensis)। সাদাটে পেটের ওপর হৃৎপিণ্ডাকৃতির কালো ছোপ এবং ধূসর-বাদামি পালকের বিন্যাস এদের বনের প্রাচীন গাছের গুঁড়ির সঙ্গে এমন নিখুঁতভাবে মিশিয়ে রাখে যে দিনের আলোতেও এদের আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। শক্তিশালী এই শিকারিরা বনের ভেতর বনমোরগ, কাঠবিড়ালিও শিকার করতে সক্ষম।
পাহাড়ি হুতুমপেঁচাএই গহিন বনের ছায়াঘেরা পরিবেশেই দেখা মেলে কান-ঝুঁটিহীন, গোলগাল ও মসৃণ মুখাবয়বের দাগি বনপেঁচা (Strix ocellata) এবং বাদামি বনপেঁচার (Strix leptogrammica)। এদের কাজলকালো বড় চোখ আর মুখের চারপাশের চক্রাকার পালকের বিন্যাস বেশ মনোমুগ্ধকর। দিনের বেলা উঁচু বৃক্ষের ঘন পাতার আড়ালে জোড়ায় জোড়ায় লুকিয়ে থাকা এই প্যাঁচারা আঁধার নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাতের নির্জনতায় একটানা করুণ ও কাঁপা সুরে শিস দিয়ে বনের পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
তবু থাকি নিজের বাসায়চকলেট-বাদামি পিঠ এবং সাদাটে বুকের ওপর লালচে-খয়েরি ফোঁটাযুক্ত সুগঠিত দেহের এই শিকরে প্যাঁচা পাখিটি লম্বাটে ডানা ও লেজের সাহায্যে দারুণ দ্রুতগতিতে উড়তে পারে।
কালপেঁচা বা শিকরে প্যাঁচা
পাহাড়ি ও পর্ণমোচী বনের পত্রপল্লবে নিঃশব্দে ওত পেতে থাকে আরেক ক্ষিপ্র ও কৌশলী শিকারি খয়েরি কালপেঁচা বা শিকরে প্যাঁচা (Ninox scutulata)। সাধারণ প্যাঁচাদের মতো এদের মুখের গোল ডিস্ক বা চাকতিটি স্পষ্ট নয়; বরং ছোট মাথা, বাঁকানো ঠোঁট এবং তীক্ষ্ণ হলুদ চোখের কারণে এদের দেখতে অবিকল শিকারি বাজপাখির মতো লাগে। চকলেট-বাদামি পিঠ এবং সাদাটে বুকের ওপর লালচে-খয়েরি ফোঁটাযুক্ত সুগঠিত দেহের এই পাখিটি লম্বাটে ডানা ও লেজের সাহায্যে দারুণ দ্রুতগতিতে উড়তে পারে।
সাধারণ প্যাঁচাদের মতো শিকরে প্যাঁচাদের মুখের গোল ডিস্ক বা চাকতিটি স্পষ্ট নয়; বরং ছোট মাথা, বাঁকানো ঠোঁট এবং তীক্ষ্ণ হলুদ চোখের কারণে এদের দেখতে অবিকল শিকারি বাজপাখির মতো লাগেসন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে এরা উঁচু গাছের মরা ডাল থেকে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে আকাশে উড়ন্ত বড় গুবরে পোকা, মথ, ব্যাঙ, এমনকি ক্ষিপ্র গতির বাদুড়ও মাঝ-আকাশে ছোঁ মেরে শিকার করে ফেলে। প্রজনন মৌসুমে এদের গলা থেকে ভেসে আসা তীব্র, সুরেলা অথচ তীক্ষ্ণ ‘উ-উক... উ-উক’ ডাক মুহূর্তেই শান্ত বনভূমিকে প্রকম্পিত করে তোলে।
বনের পাখির খাদ্য ও পুষ্টিসাধারণ প্যাঁচাদের মতো শিকরে প্যাঁচাদের মুখের গোল ডিস্ক বা চাকতিটি স্পষ্ট নয়; বরং ছোট মাথা, বাঁকানো ঠোঁট এবং তীক্ষ্ণ হলুদ চোখের কারণে এদের দেখতে অবিকল শিকারি বাজপাখির মতো লাগে।
খুদে শিকারি নিমপ্যাঁচা
আকারে চড়ুই বা শালিকের সমান অতি ক্ষুদ্র হলেও শিকারের চাতুর্য ও দক্ষতায় কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের বুনো কালপেঁচা বা দেশি নিমপ্যাঁচা (Otus bakkamoena) এবং ওরিয়েন্টাল স্কপস প্যাঁচা বা উদয়ী নিমপ্যাঁচা (Otus sunia)। প্রকৃতি এদের শরীরে দিয়েছে গাছের মরা ছাল-বাকল ও শুকনো পাতার মতো অবিশ্বাস্য ছদ্মবেশ।
ওরিয়েন্টাল স্কপস প্যাঁচা বা উদয়ী নিমপ্যাঁচাদিনের বেলা গাছের কোটরে বা ফাটলে শরীর টানটান করে, কান-ঝুঁটি খাড়া রেখে এবং চোখ আধবোজা করে এরা যখন স্থির হয়ে বসে থাকে, তখন মাত্র কয়েক হাত দূর থেকেও এদের গাছের শুকনো ডাল থেকে আলাদা করাই দায় হয়ে পড়ে। ফসলের ক্ষতিকর নিশাচর পোকামাকড়, ঝিঁঝিঁপোকা, ফড়িং ও মাকড়সা খেয়ে বেঁচে থাকা এই খুদে প্যাঁচাদের কণ্ঠস্বর কিন্তু দারুণ মায়াবী।
শহরের ফুসফুস আর পাখিদের অরণ্যআকারে চড়ুই বা শালিকের সমান অতি ক্ষুদ্র হলেও শিকারের চাতুর্য ও দক্ষতায় কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের বুনো কালপেঁচা বা দেশি নিমপ্যাঁচা এবং ওরিয়েন্টাল স্কপস প্যাঁচা বা উদয়ী নিমপ্যাঁচা।
বিরল ও যাযাবর প্যাঁচা
এদের বাইরেও বাংলাদেশের প্রান্তিক বনাঞ্চল ও চরাঞ্চলে আরও কিছু অনন্য প্রজাতির প্যাঁচার দেখা মেলে। সিলেট ও চট্টগ্রামের দুর্গম চিরসবুজ বনে কদাচিৎ দেখা মেলে পক্ষীপ্রেমীদের কাছে পরম আরাধ্য ও দুর্লভ রত্ন হিসেবে পরিচিত সোনালি লক্ষ্মীপেঁচার (Phodilus badius), যার কৌণিক বা ত্রিকোণাকৃতির মুখমণ্ডল, গভীর কালো চোখ এবং গাঢ় সোনালি-রুপালি ও খয়েরি পালকের জৌলুস এককথায় অতুলনীয়। অন্যদিকে উত্তরের গ্রামীণ ঝোপঝাড় এবং পূর্বাঞ্চলের মিশ্র বনাঞ্চলে দেখা মেলে শরীরজুড়ে সাদা-বাদামি ডোরাকাটা এশীয় বার্ড আউল বা ডোরা কাঠপেঁচার (Glaucidium cuculoides)। নিশাচর হয়েও এরা মেঘলা দিনে বা ভোরের মৃদু আলোছায়াতে শিকারের খোঁজে দারুণ সক্রিয় থাকে এবং এদের তীক্ষ্ণ ডাক শুনে অনেক সময় অন্য কোনো দিনচর পাখির ডাক বলে ভ্রম হয়।
এশীয় বার্ড আউল বা ডোরা কাঠপেঁচাআর শীতের হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করলেই সুদূর সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ার প্রান্তর থেকে আমাদের দেশের বিস্তীর্ণ হাওর, জলমহাল এবং পদ্মা-মেঘনার চরাঞ্চলের খোলা ঘাসবনে সাময়িক ডেরা বাঁধে পরিযায়ী ছোটকান প্যাঁচা (Asio flammeus)। উজ্জ্বল হলুদ চোখের চারপাশে কালো বলয় থাকা এই যাযাবর শিকারিরা গোধূলিবেলায় ঘাসবনের ঠিক ওপর দিয়ে ধীরগতিতে উড়ে উড়ে মেঠো ইঁদুর শিকার করে এবং বসন্তের শুরুতেই আবার পাড়ি জমায় নিজেদের উত্তরের আবাসে।
সুন্দর বাদামি প্যাঁচার কথানিশাচর হয়েও ডোরা কাঠপেঁচার মেঘলা দিনে বা ভোরের মৃদু আলোছায়াতে শিকারের খোঁজে দারুণ সক্রিয় থাকে এবং এদের তীক্ষ্ণ ডাক শুনে অনেক সময় অন্য কোনো দিনচর পাখির ডাক বলে ভ্রম হয়।
প্রকৃতির বাস্তুতন্ত্রে প্যাঁচাদের অবদান অপরিসীম হলেও নির্বিচারে পুরোনো গাছপালা কেটে ফেলা, বনাঞ্চল ধ্বংস, নগরায়ণ এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এদের অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করে তুলছে। লোকবিশ্বাস ও অন্ধ কুসংস্কারের শিকার হয়ে আজও অনেক ক্ষেত্রে এই নিরীহ ও উপকারী পাখিরা মানুষের রোষের মুখে পড়ে। নিশাচর জগতের এই নিঃশব্দ প্রহরীরা হারিয়ে গেলে প্রকৃতির ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। বাংলার রাতের আঁধারে উড়ে চলা এই চোখ ধাঁধানো প্রাণীগুলো বেঁচে থাকুক তাদের আদিম গৌরবে, মুখরিত রাখুক মেঠো পথ আর বনাঞ্চল।
লেখক: শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: বার্ডস অব দ্য ওয়ার্ল্ড, বাংলাপিডিয়া, আইইউসিএন, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং খান, রেজা (২০০৮)। বাংলাদেশের পাখি। বাংলা একাডেমি, ঢাকাঢাকা শহরের পাখি: লক্ষ্মীপ্যাঁচা