নাঈমের মৃত্যুর পর মাহিন–ইকবাল, প্রতিবারই ময়লার গাড়ি চালাচ্ছিলেন অন্যজন

· Prothom Alo

৪ অক্টোবর রাত প্রায় পৌনে একটা। সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে এল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একটি ময়লার গাড়ি। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, চালকের আসনে বসা যুবক নথিতে থাকা চালক নন। গাড়িটি বরাদ্দ সরদার হুমায়ন কবিরের নামে। চালাচ্ছেন সাজু আহমেদ। তিনি বহিরাগত, সিটি করপোরেশনের কেউ নন। মাসে ১০ হাজার টাকায় সহকারীর কাজ করেন। ভারী গাড়ি চালিয়ে পাম্পে এলেও তাঁর দাবি, লাইসেন্স আছে হালকা গাড়ির।

Visit freshyourfeel.com for more information.

দায়িত্বপ্রাপ্ত চালক কোথায়, জানতে চাইলে সাজু প্রথমে বললেন, আশপাশে। আবার প্রশ্ন করলে জানালেন, তাঁর চাচা গোলাপবাগ মোড়ে আড্ডা দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর তেল না নিয়েই গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন তিনি। সাংবাদিকের উপস্থিতির খবরও জানিয়ে দিলেন অন্য চালকদের। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করেছি। করপোরেশনের আর একটি গাড়িও তেল নিতে আসেনি।

প্রায় পাঁচ বছর আগে ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারিয়েছিলেন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। সেই গাড়িও চালাচ্ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে অন্য একজন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নগর ভবন ঘেরাও, তদন্ত ও চালক বরখাস্তের পরও অন্যের হাতে গাড়ির চাবি দেওয়া বন্ধ হয়নি। পরে স্কুলছাত্র মাহিন আহমেদ ও লন্ড্রির দোকানের কর্মী ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাতেও পাওয়া যায় একই অনিয়ম।

দায়িত্বপ্রাপ্ত চালক কোথায়, জানতে চাইলে সাজু প্রথমে বললেন, আশপাশে। আবার প্রশ্ন করলে জানালেন, তাঁর চাচা গোলাপবাগ মোড়ে আড্ডা দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর তেল না নিয়েই গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন তিনি। সাংবাদিকের উপস্থিতির খবরও জানিয়ে দিলেন অন্য চালকদের। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করেছি। করপোরেশনের আর একটি গাড়িও তেল নিতে আসেনি।

দক্ষিণ সিটির বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি নিয়ে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ২২টি গাড়ি অন্যদের দিয়ে চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এমন গাড়ি অন্তত ৫৬টি। বরাদ্দপ্রাপ্ত চালকদের একাংশ নিজেরা গাড়ি না চালিয়েও বেতন নিচ্ছেন। গাড়ি চালাচ্ছেন তাঁদের রাখা সহকারী বা বাইরের লোক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বরাদ্দের জ্বালানি পুরোটা না তুলে বাকি অংশের টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় নিহত নটর ডেম কলেজছাত্র নাঈম হাসান

অনুসন্ধানে ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ১৫টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগের বছর বাসাবোয় এক দুর্ঘটনায় নিহত হন আরও দুজন। সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল থেকে ১৬টি দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত তিনটি ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে অন্য ব্যক্তির গাড়ি চালানোর তথ্য পাওয়া যায়।

অনিয়মের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেননি ডিএসসিসির পরিবহন চালক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে অন্যদের গাড়ি চালাতে দেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, ‘একদম যে ভালো, আমি এটা বলব না। ভুল তো অবশ্যই আছে।’ তবে সাংবাদিকের অনুসন্ধানের পর তাঁরা নিজেরাও নজরদারি শুরু করেছেন এবং এখন আর সহকারীদের গাড়ি চালাতে দেওয়া হচ্ছে না।

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে একজনের মৃত্যুও কেন হবে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, লাইসেন্স ছাড়া কাউকে গাড়ি চালাতে না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সহকারীকে গাড়ি চালাতে দিলে সংশ্লিষ্ট চালকের পাশাপাশি তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রায় পাঁচ বছর আগে ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারিয়েছিলেন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। সেই গাড়িও চালাচ্ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে অন্য একজন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নগর ভবন ঘেরাও, তদন্ত ও চালক বরখাস্তের পরও অন্যের হাতে গাড়ির চাবি দেওয়া বন্ধ হয়নি। পরে স্কুলছাত্র মাহিন আহমেদ ও লন্ড্রির দোকানের কর্মী ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাতেও পাওয়া যায় একই অনিয়ম।

চালক আড্ডায়, গাড়ি সহকারীর হাতে

রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সের উল্টো দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারান আহসান কবির খান। ঢামেক মর্গে নিহত ব্যক্তির স্বজনের আহাজারি। ঢাকা, ২৫ নভেম্বর

বহিরাগতদের দিয়ে গাড়ি চালানোর তথ্য যাচাই করতে ৪ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে যাই। করপোরেশনের নিজস্ব এই পাম্প থেকে সংস্থাটির গাড়িগুলো জ্বালানি নেয়। বাইরের গাড়িও এখান থেকে তেল কিনতে পারে। গাড়ির নম্বর ও চালকের পরিচয় মিলিয়ে দেখার জন্য সেখানে অপেক্ষা করি। রাত পৌনে একটার দিকে আসে ১১-৪৩০৩ নম্বরের গাড়িটি।

করপোরেশনের নথিতে গাড়িটি ভারী গাড়িচালক সরদার হুমায়ন কবিরের নামে বরাদ্দ। চালকের আসনে বসা সাজু আহমেদ জানান, তিনি করপোরেশনের কেউ নন। সহকারী হিসেবে মাসে ১০ হাজার টাকা পান। তাঁর চাচা গাড়ি চালান। তবে তখন চাচা গাড়িতে ছিলেন না। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স সম্পর্কে জানতে চাইলে সাজু হালকা গাড়ির লাইসেন্স থাকার কথা বলেন।

তাঁর দাবি, চালকদের কখনো ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, চালকেরা দিন–রাত মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালান।

সাজু চলে যাওয়ার পর পাম্পের কর্মকর্তা ও স্থানীয় কয়েকজন এগিয়ে এসে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। তাঁদের একজন গাড়ির বরাদ্দের তেল কম তুলে পুরো টাকা নেওয়ার বর্ণনা দেন। পাম্পে দাঁড়িয়েই গাড়িটির দায়িত্বপ্রাপ্ত চালক সরদার হুমায়ন কবিরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করি। তিনি ফোন ধরেননি। ফলে গাড়ি অন্য ব্যক্তিকে চালাতে দেওয়ার বিষয়ে তখন তাঁর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ওই রাতে পাম্প ছেড়ে আসার প্রায় আধা ঘণ্টা পর আবার গাড়ি আসা শুরু হয় বলে পরে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান। হুমায়ন কবির ইউনিয়নের কোনো পদে আছেন কি না, জানতে চাইলে সভাপতি শাহ আলম তালুকদার বলেন, তিনি কমিটিতে নেই। তবে তাঁর সঙ্গে থাকেন, তাঁর ঘনিষ্ঠ। অন্যদের গাড়ি চালাতে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে ইউনিয়ন সভাপতি দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কথা বলেন। তাঁর দাবি, চালকদের কখনো ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, চালকেরা দিন–রাত মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালান।

পরদিন ৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে যাই সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পাশে করপোরেশনের গাড়ি রাখার আরেকটি গ্যারেজে। পদ্মা সেতুর দিকে যাওয়া রেললাইনের কাছের এ জায়গায় আগে ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক ছিল। সেখান থেকে একের পর এক গাড়ি বর্জ্য পরিবহনের জন্য বের হচ্ছিল। তবে ১১-৪২৭০ ও ১১-৪৩০৭ নম্বরের গাড়ি দুটি বের হচ্ছিল না।

মূল চালকের বদলে অন্যরা চালান বলে অনুসন্ধানে যেসব গাড়ির তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, তার মধ্যে এই দুটি ছিল। প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করি। একপর্যায়ে সাংবাদিকের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ে। অন্তত ৩৫ জন চালক জড়ো হয়ে আমার কাছে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। একপর্যায়ে করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় ফিরে আসি। গাড়ি দুটির চালকের সঙ্গে সেদিন আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এর আগের রাতে ১১-৪২৭৮ নম্বরের আরেকটি গাড়ির চালকের খোঁজও পাওয়া যায়নি। ৪ অক্টোবর রাত ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত গাড়িটি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এই গাড়িও অন্যদের দিয়ে চালানোর তথ্য আগে পাওয়া গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চালককে না পাওয়ায় ওই রাতে তাঁর পরিচয় যাচাই করা যায়নি।

অন্তত ৩৫ জন চালক জড়ো হয়ে আমার কাছে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। একপর্যায়ে করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় ফিরে আসি। গাড়ি দুটির চালকের সঙ্গে সেদিন আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।

চালকসংকটে অন্যরাও চালকের আসনে

ডিএসসিসির মোট যান ও যন্ত্রপাতি (এক্সক্যাভেটর, রোড রোলার, বুলডোজার ইত্যাদি) ৬০৮টি। এর বিপরীতে স্থায়ী চালক ২৫২ জন। এই হিসাবের মধ্যে বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি ছাড়াও করপোরেশনের অন্য যানবাহন ও যন্ত্রপাতি রয়েছে। চালকের ঘাটতি পূরণে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মশককর্মীসহ অন্য পদের কর্মীদেরও গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

স্থায়ী চালকের সংখ্যা ২৫২ বলে নিশ্চিত করেন ইউনিয়ন সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। তাঁর ভাষ্য, অন্য পদের কর্মীদের মধ্যে যাঁদের লাইসেন্স ও গাড়ি চালানোর দক্ষতা রয়েছে, কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে তাঁদের দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, বরাদ্দপ্রাপ্ত চালকেরাই নিজ দায়িত্বে অন্যদের দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিবহন শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে অনেকে এমন সুযোগ নেন।

চালক সংকটের বিষয়ে প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কিছু চালক নিয়োগ দিয়েছেন, আরও নেওয়া হবে। বিভিন্ন বিভাগে জনবলের প্রয়োজন জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে লোক বাড়ানোর সঙ্গে বেতন দেওয়ার সামর্থ্যের বিষয়টিও দেখতে হচ্ছে।

খিলগাঁওয়ে ডিএসসিসির ময়লার গাড়িচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহতখিলগাঁওয়ে ডিএসসিসির ময়লার গাড়িচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

বরাদ্দের তেল পাম্পেই বিক্রি

দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ির ময়লা প্রথমে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বা এসটিএসে আনা হয়। সেখান থেকে গাড়িতে করে নেওয়া হয় মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে। বর্জ্য পরিবহন ও ল্যান্ডফিলে ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে ব্যবহৃত হয় ২৩৭টি যান-যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে বর্জ্য বহনের গাড়ির পাশাপাশি ল্যান্ডফিলে ব্যবহৃত যন্ত্রও রয়েছে।

বর্জ্য বহনের জন্য ৩, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ টন ধারণক্ষমতার গাড়ি ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব গাড়ি প্রতি রাতে তিন থেকে চারবার এসটিএস থেকে মাতুয়াইলে যাতায়াত করে। তবে ইউনিয়ন সভাপতি শাহ আলম তালুকদারের দাবি, বর্জ্য পরিষ্কার করতে ন্যূনতম চারটি ট্রিপ প্রয়োজন হয়; কোনো গাড়ি পাঁচ ট্রিপও দেয়।

গাড়ি ও যাত্রাপথ অনুযায়ী, প্রতি ট্রিপে ৮ থেকে ১৪ লিটার জ্বালানি বরাদ্দ থাকে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় ট্রিপপ্রতি তিন থেকে চার লিটার পর্যন্ত বেশি বরাদ্দের সুযোগ নিয়ে তেল সরানো হয়। বরাদ্দের পুরো তেল গাড়িতে না তুলে বাকি অংশ কম দামে পাম্পেই বিক্রি করে দেওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাম্পে কর্মরত একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, করপোরেশনের চালকদের কিছুটা কম দামে তেল বিক্রির বিষয়টি সবাই জানেন। এটা নিয়ে লুকোচুরির কিছু নেই।

পৌর ফিলিং স্টেশনে কথা হয় স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। লেনদেনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, কোনো ট্রিপে ১২ লিটার বরাদ্দ থাকলে চালক ৮ বা ৯ লিটার তেল নেন। বাকি তেলের জন্য টাকা জমা থাকে। পাম্পের লোকেরা কাগজে হিসাব লিখে রাখেন। মাসের মাঝামাঝি বা শেষে মূল চালককে টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, গাড়ি অন্য কেউ চালালেও টাকার হিসাব থাকে মূল চালকের নামে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় ট্রিপপ্রতি তিন থেকে চার লিটার পর্যন্ত বেশি বরাদ্দের সুযোগ নিয়ে তেল সরানো হয়। বরাদ্দের পুরো তেল গাড়িতে না তুলে বাকি অংশ কম দামে পাম্পেই বিক্রি করে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, এই অর্থের ভাগ পান কিছু চালক, ইউনিয়নের নেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে কার কাছে কত টাকা গেছে, সেই হিসাব পাওয়া যায়নি।

তেলের টাকা থেকে কমিশন পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন পরিবহন চালক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। তিনি বলেন, চাকরি করেন, বেতন পান এবং সেই আয়েই চলেন। কোন গাড়ি কত জ্বালানি খরচ করে, তার নির্দিষ্ট হিসাব তাঁর কাছে নেই। তাঁর বক্তব্য, কিছু গাড়িতে হাইড্রলিক ব্যবস্থা চালাতে ইঞ্জিন চালু রাখতে হয়। ফলে শুধু চলার দূরত্ব দিয়ে সব গাড়ির জ্বালানি খরচ একভাবে হিসাব করা যায় না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, মাসে গড়ে ৫ হাজার ৮৪২টি ট্রিপ হয়। প্রতিটি ট্রিপে ৩ লিটার করে সরানো হলে মাসে পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫২৬ লিটার। অক্টোবরের সরকারি খুচরা মূল্য প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা ধরে এই ডিজেলের বাজারমূল্য ২৩ লাখ ৬৬ হাজার ১০ টাকা। একই হারে এক বছর চললে এবং দাম অপরিবর্তিত থাকলে তা প্রায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

তেল বিক্রি ও ইউনিয়ন নেতাদের প্রশ্রয়ের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন করা কর্মীদের অধিকার। সেই অধিকার তিনি খর্ব করতে পারেন না। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করবেন। সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মৃত্যু, বরখাস্ত, আবার একই অনিয়ম

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে রাস্তা পার হওয়ার সময় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানকে চাপা দেয় দক্ষিণ সিটির ময়লার গাড়ি। পরদিন পুলিশ জানায়, গাড়ি চালাচ্ছিলেন রাসেল খান। তিনি করপোরেশনের নিয়মিত কর্মী ছিলেন না, তাঁর গাড়ি চালানোর লাইসেন্সও ছিল না। আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত হয়ে গাড়ি চালানোর সুযোগ পেয়েছিলেন বলে পুলিশের বক্তব্যে উঠে আসে।

ওই ঘটনায় করপোরেশনের তদন্তে গাড়ির দায়িত্ব হাতবদলের একাধিক ধাপ পাওয়া যায়। গাড়িটি বরাদ্দ ছিল ইরান মিয়ার নামে। পরিবহন পুল থেকে সেটি দেওয়া হয় হারুনকে। হারুন আবার চালাতে দেন রাসেলকে। অর্থাৎ নথির চালকের কাছ থেকে গাড়ির চাবি একাধিক হাত ঘুরে পৌঁছায় লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তির কাছে।

নাঈমের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীরা গুলিস্তানে বিক্ষোভ করেন। ২৫ নভেম্বর নগর ভবন ঘেরাও করে বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবি জানান। তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস তাঁদের সামনে এসে বক্তব্য দেন। নাঈমের বাবার করা মামলায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বরখাস্ত চালক ইরান মিয়া, হারুন ও রাসেল। তখন ইরান মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়।

তবে এসব ঘটনায় মামলা, তদন্ত হলেও শেষ পর্যন্ত বিচার পান না স্বজনেরা। জানতে চাইলে নাঈম হাসানের বাবা শাহ আলম দেওয়ান গতকাল শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলা করার পরই শেষ। কেউ আর খবর নেয়নি। কত কষ্ট করে ছেলেকে নটর ডেম কলেজ পর্যন্ত নিলাম। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি বহু বছর ধরেই চলছে। এটা নিয়ে আর কী বলব!’

নাঈমের বাবার করা মামলায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বরখাস্ত চালক ইরান মিয়া, হারুন ও রাসেল। তখন ইরান মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়।

নাঈমের মৃত্যুর পর ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর নয়জন চালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, নিজেদের নামে বরাদ্দ গাড়ি নিজেরা না চালিয়ে অন্যদের চালাতে দেওয়া। তাঁদের সাতজন ময়লার গাড়ির চালক, দুজন হালকা গাড়ির। একজনের গাড়ি অন্যকে দেওয়ার অভিযোগে পরিবহন তত্ত্বাবধায়ক ফারুক আহমেদকেও চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে অবশ্য তাঁকে চাকরিতে বহাল করা হয়।

এর আড়াই বছর পর ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল মুগদার মদিনাবাগে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় মারা যায় মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মাহিন আহমেদ। করপোরেশনের আদেশে বলা হয়, ১১-৪২৮১ নম্বরের গাড়ির চালক কামাল নিজে না চালিয়ে রুবেলকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। চালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কেউ দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে ছিলেন না। দায়িত্বে অবহেলার জন্য তিনজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর যাত্রাবাড়ীর কলাপট্টিতে প্রাণ যায় লন্ড্রির দোকানের কর্মী ইকবাল হোসেনের। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় ময়লার গাড়ি তাঁকে ধাক্কা দেয়। পুলিশের ভাষ্য, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন চালকের সহকারী। তাঁকে আটক ও গাড়িটি জব্দ করা হয়। নাঈমের পর মাহিন, তারপর ইকবাল—তিনটি ঘটনায়ই দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে অন্যজন গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

৯ বছরে অন্তত ১৮ মৃত্যু

অনুসন্ধানে পাওয়া দুর্ঘটনার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে বাসাবো বৌদ্ধমন্দিরের সামনে ময়লার গাড়ির চাপায় রিমন ও শারিন নামের দুজন নিহত হন। ২০১৮ সালে আরও দুটি দুর্ঘটনায় মারা যান দুজন। ১২ মে দৈনিক বাংলা মোড়ে বাদশা মিয়া এবং ২৩ নভেম্বর বকশীবাজারে মোটরসাইকেল আরোহী নূরজাহান পুষণ নিহত হন। নূরজাহানের স্বামীও আহত হন।

২০২১ সালে ছয়টি ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ২০ জানুয়ারি দয়াগঞ্জে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের কর্মী খালিদ, ১৬ এপ্রিল যাত্রাবাড়ীতে রিকশাচালক মোস্তফা এবং মে মাসে টিটিপাড়ায় ব্যাংক কর্মচারী স্বপন আহমেদ দিপু নিহত হন। ৯ আগস্ট রাতে দোলাইরপাড়ে মারা যান পোশাকশ্রমিক ফারুক হোসেন। এরপর ২৪ নভেম্বর নাঈম এবং ২৩ ডিসেম্বর ওয়ারীতে স্বপন কুমার সরকার নিহত হন।

২০২২ সালের ১ এপ্রিল খিলগাঁওয়ে নাসরিন খানম এবং ৩১ মে টিটিপাড়ায় নাজমা বেগম নিহত হন। ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর ভাঙ্গা প্রেস এলাকায় প্রাণ যায় নাজমা বেগম নামের আরেক নারীর। ওই ঘটনায় করপোরেশন তখন গাড়ির সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছিল। তবে পরবর্তী অনুসন্ধানে গাড়িটি দক্ষিণ সিটির বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

২০২৪ সালে মাহিনের পর ২০২৫ সালে দুটি ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়। ইকবাল ছাড়াও ১২ ডিসেম্বর ডেমরায় নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী গাজী ইরাম রিদওয়ান ও তাহসিন তপু। চলতি বছরের ৪ এপ্রিল দক্ষিণ বনশ্রীতে প্রাণ হারান ব্যবসায়ী সাজেদুল ইসলাম। এই হিসাবে ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১৬টি ঘটনায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর সংঘটিত দুর্ঘটনার পরই লাইসেন্স ছাড়া কাউকে গাড়ি চালাতে না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই নির্দেশের পর এমন ঘটনা আর ঘটেনি। পৌর ফিলিং স্টেশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে তাঁর আত্মীয়ের গাড়ি চালানোর তথ্য জানালে তিনি তা সুনির্দিষ্টভাবে পাঠাতে বলেন। তথ্য পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।

কর্মকর্তারা কেন তদারকি করছেন না, জানতে চাইলে প্রশাসক বলেন, কোনো ঘটনা তাঁর কাছে ধরা না পড়লে ঢালাওভাবে কিছু বলা যায় না। চালকদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কাউকে এভাবে গাড়ি দিলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামছুল হক বলেন, ময়লার গাড়ির চাপায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় শুধু চালককে দায়ী না করে মূল দায় সিটি করপোরেশনকেই নিতে হবে। সংস্কার নিজের ঘর থেকে শুরু হলেই সমাধান টেকসই হবে এবং গৃহীত উদ্যোগগুলো মানুষের আস্থা অর্জন করবে।

দায় সিটি করপোরেশনকেই নিতে হবে

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনের প্রশাসকেরা বর্তমানে নানা সাহসী উদ্যোগ নিলেও এ ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। অন্য কাউকে শাসন বা নিয়ন্ত্রণ করার আগে ‘নিজের ঘর সুশৃঙ্খল’ করতে হবে; নইলে এটি কেবল কর্তৃত্ব ফলানোর শামিল হয়ে দাঁড়ায়।

তাঁর প্রশ্ন, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলোর আদৌ ফিটনেস আছে কি না, চালকদের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে কি না কিংবা অনুমোদিত চালকের পরিবর্তে অন্য কেউ গাড়ি চালাচ্ছে কি না। তিনি বলেন, ময়লার গাড়ির চাপায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় শুধু চালককে দায়ী না করে মূল দায় সিটি করপোরেশনকেই নিতে হবে। সংস্কার নিজের ঘর থেকে শুরু হলেই সমাধান টেকসই হবে এবং গৃহীত উদ্যোগগুলো মানুষের আস্থা অর্জন করবে।

Read full story at source