বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই শক্তিশালী ও সমন্বিত অংশীজন
· Prothom Alo
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস (১৩ অক্টোবর) উপলক্ষে ‘বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই শক্তিশালী ও সমন্বিত অংশীজন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১২ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে। এই বৈঠকের আয়োজন করে ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) ও প্রথম আলো। সহযোগিতায় ছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন, স্টার্ট বাংলাদেশ হাব ও ইডিএম।
নুরুন আখতার
Visit h-doctor.club for more information.
অতিরিক্ত সচিব, ত্রাণ কর্মসূচি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশ বিশ্বের দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে নবম। যুগের পর যুগ দুর্যোগ মোকাবিলা করতে করতে এ দেশের মানুষ দুর্যোগ মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলতে পেরেছে। শুধু সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় এত বড় বড় দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব হতো না, যদি মানুষ নিজেরাই ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য অর্জন না করত। তবে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সরকার পর্যাপ্ত সহায়তা বরাদ্দ দিলেও অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্বহীনতার কারণে তা সকল ক্ষেত্রে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায় না। এ সমস্যা দূর করতে সরকারি সহায়তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকার ও জনগণ—উভয়কেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তাকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করা জরুরি। এ লক্ষ্যে তিনটি জেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এখন ৬৪ জেলায় আগাম সতর্কবার্তা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও বজ্রপাতের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, এনজিও ও জনগণের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। সহায়তা বিতরণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা এবং একই ব্যক্তি বারবার সহায়তা না পেয়ে সকলেই যেন পান, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী আমরা ঘর থেকেই দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ে তুলবো। যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের মধ্য দিয়েই শক্তিশালী ও সমন্বিত অংশীজনের মাধ্যমে বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব।
মো. রাসেল সাবরিন
যুগ্মসচিব ও পরিচালক–ত্রাণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের ধরন প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। সরকারও সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। স্বাধীনতার পর ভোলার ঘূর্ণিঝড়ে আনুমানিক ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর সিডরসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। সিডরের সময় আমি পটুয়াখালীর গলাচিপায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলাম। তখন দুর্যোগের ভয়াবহতা নিজের চোখে দেখেছি। চর হেয়ারে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ জন জেলে ছিলেন। সেখানে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র ছিল না। ঘূর্ণিঝড়ে পুরো চরটি ধ্বংস হয়ে যায়, একজন মানুষও বেঁচে ছিলেন না।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার নিয়মিত প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের সহায়তায় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এ বছরও কম্বল ও শীতবস্ত্র কেনার প্রক্রিয়া চলছে। দুর্যোগের সময় তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য সরকারের মজুত রয়েছে শীতবস্ত্র, শিশুখাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাবার।
শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম পদক্ষেপ নিতে ইএসডিওর সহায়তায় সরকার আগাম কার্যক্রমের প্রটোকল তৈরির কাজ শুরু করেছে। আশা করছি, এ বছরই এটি সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে দুর্যোগের সময় সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজনের দায়িত্ব ও কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সময়মতো সহায়তা পৌঁছাতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ১৭–১৮ কোটি মানুষের দেশে কিছু সমস্যা থাকতেই পারে। তবে বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে সমস্যার সমাধান সহজ হবে।
সানজিদা ইয়াছমিন
উপসচিব, ত্রাণ প্রশাসন ও সেবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়
দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা আগাম প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করি। দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার পরই ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। এতে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন। তবে পূর্বাভাস পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছানো জরুরি।
বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ১৯টি জেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য আগাম আর্থিক ও খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল ঘরবাড়িতে বসবাসকারী দরিদ্র পরিবার, নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি দুর্যোগের আগে করণীয় সম্পর্কে তাঁদের সচেতন করতে হবে, যাতে তাঁরা নিজেদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো তাদের প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার পরিকল্পনা তুলে ধরে। এসব পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে তা কমিয়ে আনা। এ জন্য পূর্বাভাসের ভিত্তিতে দ্রুত সহায়তা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
মুহম্মদ শহীদ উজ জামান
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের প্রতিপাদ্য: ‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’–এর আলোকে আমাদের আলোচনার বিষয় ‘বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই শক্তিশালী ও সমন্বিত অংশীজন’। দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো, ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কার্যকর করতে সরকার, শিক্ষাবিদ, মাঠপর্যায়ে কাজ করা ব্যক্তি ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে আরও জোরদার করা যায়, সেটিই এ আলোচনার মূল লক্ষ্য। দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগীসহ সব অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণও জরুরি। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারের নেতৃত্বে বিভিন্ন অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্যোগ মোকাবিলায় বেশ অগ্রগতি হয়েছে। তবে দুর্যোগের ধরন ও ঝুঁকি পরিবর্তিত হওয়ায় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি তাপপ্রবাহ ও শৈত্যপ্রবাহের মতো দুর্যোগেও গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতের সাফল্যে সন্তুষ্ট না থেকে আমাদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে পূর্বাভাস পাওয়ার পর সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়া এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। আগাম সতর্কবার্তাকে দ্রুত কার্যক্রমে রূপান্তর করা এবং সরকারের নেতৃত্বে সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করাই আমাদের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নীতিগত সিদ্ধান্ত, গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে।
ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ
জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা, ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, বেসরকারি সংস্থা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীরা কাজ করে। মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। সমাজকল্যাণ, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থাও দুর্যোগের সময় কাজ করে। কিন্তু সহায়তা বণ্টনে সমন্বয় না থাকায় কোনো কোনো এলাকায় মানুষ বারবার সহায়তা পেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেকে খাবার ও পানিও পান না। তাই সমন্বয়ের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের নির্ভুল তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি।
আগাম পদক্ষেপের জন্য জেলা পর্যায়ে বরাদ্দ থাকলেও দুর্যোগের ঘটনা ঘটে মূলত গ্রাম ও উপজেলায়। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ পৌঁছাতে বিলম্ব হতে পারে। তাই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উপজেলা পর্যায়েও আগাম প্রস্তুতির জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে কারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন, তা চিহ্নিত করে সহায়তা বণ্টন আরও কার্যকর করা সম্ভব।
দুর্যোগের তাৎক্ষণিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধার ও টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও বিমাব্যবস্থার সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দুর্যোগে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারানোর মতো অ-অর্থনৈতিক ক্ষতিও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ ও তহবিলের সুবিধা পেতে আমাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হবে; গবেষক, শিক্ষাবিদ ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকর করা সম্ভব।
সৈয়দ আশরাফ উল ইসলাম
কমিউনিকেশন মিডিয়া স্পেশালিস্ট, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
আমরা প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ায় জাতীয় পর্যায়ে শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে আর্লি অ্যকশন প্রটোকল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। শীতের তীব্রতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে গন্য হতে পারে।
দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি করপোরেট সেক্টরের প্রযুক্তি, আর্থিক সামর্থ্য ও সরবরাহব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। মানবিক সহায়তা বিতরণে ঘাটতি ও পুনরাবৃত্তি এড়াতে দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলীতে (এসওডি) সমন্বয়ের বিধান রয়েছে। কোনো বেসরকারি সংস্থা দুর্যোগে মানবিক সহায়তা দিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করার নিয়ম আছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত কাজের চাপে অনেক সময় এই সম্বন্বয়ের ব্যত্যয় ঘটে। ফলে কোথাও অধিক সহায়তা পৌঁছায়, আবার প্রত্যন্ত কোনো এলাকার মানুষ মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়।
করপোরেট খাতের পরিবহন, সরবরাহকেন্দ্র ও বিতরণ নেটওয়ার্ক দুর্গম এলাকায় জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে কাজে লাগানো সম্ভব। শস্য, গবাদিপশু ও নৌযানের বিমার মতো আর্থিক উপকরণও দুর্যোগ ঝুঁকি সামলাতে সহায়ক।
বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিলের ২০ শতাংশ দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে ব্যয়ের নির্দেশনা দিয়েছে। এ উদ্যোগ অন্য খাতেও ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উচ্চপর্যায়ের কমিটিগুলোতে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর প্রতিনিধি রয়েছে। এখন সময় এসেছে করপোরেট খাতের অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়া, যাতে সরকার, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করতে পারে।
শফিউল আলম
কান্ট্রি ম্যানেজার, স্টার্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ
শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় আমরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি, শুধু কম্বল বিতরণই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের চারটি জেলায় মানুষের সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে, শীতের কারণে তিন-চার দিন কাজে যেতে না পারলে তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। তাই কম্বলের পাশাপাশি ওই কয়েক দিনের আয়-ক্ষতি পুষিয়ে দিতে নগদ অর্থসহায়তাও জরুরি। তাপপ্রবাহসহ অন্যান্য দুর্যোগের ক্ষেত্রেও মানুষের প্রয়োজন বুঝে সহায়তার ধরন নির্ধারণ করতে হবে।
আমরা শৈত্যপ্রবাহ, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন, ডেঙ্গু, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগে আগাম সহায়তা নিয়ে কাজ করেছি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মানুষ দুর্যোগের ঠিক আগে সহায়তা পেলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে সহায়তা পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় আগেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর তথ্যভান্ডার তৈরি এবং বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসের ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত অংশগ্রহণ জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করা এনজিওগুলো মানুষের কাছাকাছি থাকে এবং তাঁদের প্রয়োজন সম্পর্কে ভালো জানে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সম্পৃক্ততা ও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমরা ৪০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে স্টার্ট বাংলাদেশ হাবের মাধ্যমে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য দুর্যোগের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো।
দাতানির্ভরতা কমাতে স্থানীয় ও জাতীয় সংস্থাগুলোর নিজস্ব তহবিল একত্র করে জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। সরকারের সক্ষমতা ও স্থানীয় অংশীজনদের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কার্যকর হবে।
শামীম আহমেদ
ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন বাংলাদেশ
হেলভেটাস বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩৩টি দেশে কাজের অভিজ্ঞতায়, দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো ও সহনশীলতা বাড়াতে চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সরকারি নেতৃত্ব, স্থানীয় সংগঠন, বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস ও উন্নয়ন সহযোগীদের কার্যকর ভূমিকা। এ চার উপাদান সমন্বিতভাবে কাজ করলে দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কার্যকর হয়।
প্রথমত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারকে নেতৃত্ব দিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলোকে সমন্বয়ের মূল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীরাও আলাদাভাবে কাজ না করে সরকারের নেতৃত্বে এসব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
দ্বিতীয়ত, দুর্যোগে প্রথম সাড়া দেয় স্থানীয় সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী দল, নারীদের দল ও উৎপাদক সংগঠনগুলো। তাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ প্রয়োজন, যাতে তারা ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সম্পদ সংগ্রহ ও জরুরি পরিকল্পনা প্রণয়নে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসের সঙ্গে আগাম পদক্ষেপের সমন্বয় জরুরি। দুর্যোগের ঝুঁকি নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছালে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা এবং পর্যাপ্ত সম্পদ থাকতে হবে। এর মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া, মানুষের সম্পদ রক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সহায়তা করা সম্ভব।
চতুর্থত, উন্নয়ন সহযোগীরা প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, অর্থায়ন ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ দিয়ে সরকারকে সহায়তা করতে পারে। নিয়মিত সমন্বয় ও তথ্যবিনিময়ের মাধ্যমে সরকারি উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, চারটি উপাদান সমন্বিতভাবে কাজ করলে দুর্যোগের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অভিযোজনক্ষমতাও বাড়ে।
খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, আইডিএমভিএস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ও নগরঝুঁকিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকার ভবন নির্মাণে ভূমিকম্পসহনশীল নকশা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের অগ্রগতির পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। আমার দীর্ঘদিনের গবেষণা ও কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, দুর্যোগ মোকাবিলায় নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ হাওর অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ায়। শিল্পকারখানার ঝুঁকি, অগ্নিকাণ্ড, রাসায়নিক দুর্ঘটনা ও ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায়ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও চিরায়ত জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের দুর্যোগবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা, বেসরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। দুর্যোগ ও জলবায়ুবিষয়ক শিক্ষা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে। অঞ্চল ও দুর্যোগের ধরন অনুযায়ী নিয়মিত মহড়া, স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া সহনশীল সমাজ গড়া সম্ভব নয়।
তিস্তা নদীর প্রকল্প ব্যবস্থাপনায়, নদী, খাল, নগর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় ইকোসিস্টেম, দেশীয় এক্সপার্ট, স্থানীয় অর্থনীতি, ও জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন কে সমন্বিত ভাবে বিবেচনা করতে হবে।
শামীমা আখতার
আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, ইডিএম
দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারী, কিশোরী ও শিশুদের স্বাস্থ্যকে জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট ও তীব্র তাপপ্রবাহ নারী ও কিশোরীদের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা এবং নিরাপদ শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগের অভাব তাঁদের মর্যাদা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিকভাবে পরিমাপ করা যায় না।
পানির সংকটে গর্ভবতী নারীরা নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করতে পারেন না। এতে মা ও গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতীয় নীতিতে নারী, কিশোরী ও শিশুর স্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
লবণাক্ত এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক পুনর্নির্মাণ এবং পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবার জন্য শয্যা, অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়েছি। সৌরবিদ্যুৎচালিত অ্যাম্বুলেন্সও দিয়েছি, যাতে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ সেবা পেতে পারেন। এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, এনজিও ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের মতামত শোনার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের সম্পৃক্ত করার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর সমন্বয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগই আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
মাহমুদুল ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা, সেন্টার ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (ডিএমইআরটি)
আমি জাতিসংঘে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছি এবং দক্ষিণ সুদানে ১৪ বছর সরকারের উপদেষ্টা ছিলাম। নীলনদের পানি ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের তিস্তা নদী নিয়েও কাজ শুরু করি। এ উদ্দেশ্যে আমরা ‘তিস্তা ফোরাম’ নামে একটি থিঙ্কট্যাংক গঠন করেছি।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থা, বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিস্তা ও পদ্মার প্রতিবেশব্যবস্থা এক নয়, তাই তিস্তার জন্য পৃথক পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ জন্য প্রকল্পের কার্যালয় রংপুরে স্থাপন করা জরুরি, যাতে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ে।
২০২৪ সালে তিস্তা ফোরামের প্রথম সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়নের জন্য ‘তিস্তা বন্ড’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছি। এ প্রকল্পের অর্থায়নে দেশীয় উৎসকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগে স্থানীয় অর্থায়নের অভিজ্ঞতা থাকলে পরবর্তী পর্যায়ে বিদেশি দাতাদের ওপর নির্ভর করতে হবে কেন? দেশীয় অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাই করে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় রংপুর নগর, ঘাঘট, শ্যামাসুন্দরী, কেডি ও মাহিগঞ্জ খাল এবং নগরের পানিনিষ্কাশনব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা না করে এসব বিষয় উপেক্ষা করলে পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। তিস্তা ব্যবস্থাপনায় নদী, নগর, স্থানীয় অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠীকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
মনা আল আমিনে
হেড অব হেলথ প্রোগ্রামস ইডিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অধিকাংশ উদ্যোগে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোকে জলবায়ু সহনশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি জরুরি, তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে দেখলে চলবে না। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাঁরাই সরাসরি অনুভব করেন। দুর্যোগ মোকাবিলায় তাঁদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ইডিএম ও সহযোগী সংস্থা এসডোর মাধ্যমে আমরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কাজের কেন্দ্রে রাখার চেষ্টা করছি। অংশগ্রহণমূলক মূল্যায়নের মাধ্যমে পানির লবণাক্ততা, সংকটসহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। এর ভিত্তিতে প্রকল্পের কার্যক্রম নির্ধারণ করেছি। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎচালিত ভ্রাম্যমাণ অ্যাম্বুলেন্স ও স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।
স্বাস্থ্যশিক্ষার কার্যক্রম নির্ধারণে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতিকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে বর্ষা মৌসুম বা রোগের প্রাদুর্ভাবের আগেই প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম নিতে হবে, যাতে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনে নারী, বিশেষত গর্ভবতী নারী ও কিশোরীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই তাঁদের শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। কারণ, তাঁরাও সমাধানের অংশ।
আয়াতুল্লাহ আল-মামুন,
প্রজেক্ট, পার্টনারশিপ অ্যান্ড লোকালাইজেশন কো–অরডিনেটর, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকো-অপারেশন বাংলাদেশ
দুর্যোগে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর প্রভাব পড়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর। তাই দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উপকূলীয় জেলাগুলোয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সরকারের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও ডেলটা প্ল্যান ২১০০-তেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনা কার্যকর করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
হেলভেটাস বাংলাদেশ স্থানীয় সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে দুর্যোগের প্রস্তুতি, ঝুঁকি হ্রাস ও পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। আমাদের ‘এক্সেস’ প্রকল্পের আওতায় ৩৯ হাজার পরিবারের জন্য দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানো, কৃষকদের জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া এবং নিরাপদ আশ্রয় ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করছি। দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।
সুপারিশ
দুর্যোগ মোকাবিলায় সব অংশীজনের সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের নির্ভুল তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে।
ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সরকার ও জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দুর্যোগের আগে নগদ অর্থ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় করপোরেট খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
দুর্যোগ-পরবর্তী জীবিকা পুনরুদ্ধার ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে।
দুর্যোগবিষয়ক নীতিমালা বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে।
দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
অংশগ্রহণকারী:
নুরুন আখতার, অতিরিক্ত সচিব, ত্রাণ কর্মসূচি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মো. রাসেল সাবরিন, যুগ্ম সচিব ও পরিচালক, ত্রাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। সানজিদা ইয়াছমিন, উপসচিব, ত্রাণ প্রশাসন ও সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ, জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা, ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। সৈয়দ আশরাফ উল ইসলাম, কমিউনিকেশন মিডিয়া স্পেশালিস্ট, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। শফিউল আলম, কান্ট্রি ম্যানেজার, স্টার্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ। শামীম আহমেদ, ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন বাংলাদেশ। খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, আইডিএমভিএস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শামীমা আখতার, আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, ইডিএম। মাহমুদুল ইসলাম, প্রতিষ্ঠাতা, সেন্টার ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এডুকেশন, রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (ডিএমইআরটি)। মনা আল আমিনে, হেড অব হেলথ প্রোগ্রামস, ইডিএম। আয়াতুল্লাহ আল-মামুন, প্রজেক্ট, পার্টনারশিপ অ্যান্ড লোকালাইজেশন কো–অরডিনেটর, হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন বাংলাদেশ। সভাপতি: মুহম্মদ শহীদ উজ জামান, প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। সূচনা বক্তব্য: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।