বরিশাল বিভাগে তিন মাসে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে ছয় গুণ
· Prothom Alo
চলতি বছরের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বরিশাল বিভাগে গত বছর এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের ‘হটস্পট’ ছিল বরগুনা। এবার সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে পিরোজপুরে। নতুন করে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এই জেলা। আর গত তিন মাসের ব্যবধানে বিভাগে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ।
Visit newsbetting.bond for more information.
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভাগে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ২ হাজার ২৫ জন। এর পরের তিন মাসে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ৬৩৭। আর গতকাল ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে শনাক্ত হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৬৭৬।
গত রোববার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুতে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ২১৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ জনই পিরোজপুরের বাসিন্দা।
এই বিভাগে গত জুন মাসে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর জুলাইয়ে ৭ জন, আগস্টে ৯ জন ও সেপ্টেম্বরে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। আর চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম পাঁচ দিনে মারা গেছেন তিনজন। সব মিলিয়ে এ বছর বিভাগে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে (৫ অক্টোবর পর্যন্ত)। এর মধ্যে ১৮ জনই মারা গেছেন বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অন্য তিনজনের মৃত্যু হয়েছে পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে।
মো. লোকমান হাকিম, উপপরিচালক, বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগী অনেকটা বেড়ে গেছে এবং এখনো অব্যাহত আছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যাপারে সব ধরনের প্রস্তুতি আছে।বরগুনায় এবার ডেঙ্গু রোগী কমার বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, গত বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা থেকে চলতি বছর আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মানুষ যাতে আক্রান্ত না হন, সে জন্য বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
গতকাল দুপুরে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মেডিসিন ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের সঙ্গেই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলছে। এর ফলে রোগীর চাপে অনেকে শয্যা না পেয়ে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গতকাল সকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন ১৪৮ জন।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ঝালকাঠির সাহানুর বেগম। গতকাল হাসপাতালে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিট (বিছানা) খালি নাই, ফ্লোরে জায়গা পাইছি। থাকতে খুব কষ্ট অয়, কিন্তু করমু কী?’
সাত দিন ধরে জ্বর কমছিল না, তাই রোববার হাসপাতালে ভর্তি হন বরিশাল সদর উপজেলার বাসিন্দা সাকিব হাসান। তিনি বলেন, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে থেকে কারাতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
পিরোজপুরের পরিস্থিতি
বরিশাল বিভাগে এবার সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় পিরোজপুরে, ৩ হাজার ২২৬ জন। এরপর ঝালকাঠিতে ২ হাজার ৩২৭ এবং বরগুনায় ১ হাজার ৭০১ জন। ২০২৪ সালে পিরোজপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ১৫৩ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয় তিনজনের। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৫৪। তবে ওই বছর ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সে তথ্য পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২২৬। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে একজনের।
বরিশাল বিভাগে ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। এর আগে বিভাগে ডেঙ্গুর কোনো ইতিহাস ছিল না বলে জানায় বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর কয়েক বছরের ব্যবধানে রোগটি বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
পিরোজপুরে ডেঙ্গু রোগী বেশি শনাক্ত হওয়ার বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন মো. মতিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে আইইডিসিআরের একটি বিশেষজ্ঞ দল পিরোজপুরে কাজ করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মশার প্রজননস্থল হিসেবে সুপারি ও নারকেলগাছের গোড়া, নারকেলের খোসা, নির্মাণাধীন ভবন, সুপারি–নারকেল ও পেয়ারাবাগানের নালাসহ বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানির কথা উঠে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতার ঘাটতিও রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ দলটি জানিয়েছে।
অন্যদিকে গত দুই বছরের তুলনায় বরগুনায় চিত্র এবার ভিন্ন। ২০২৪ সালে এ জেলায় ২ হাজার ৪৫১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে মৃত্যু হয় চারজনের। ২০২৫ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৬৪৫। এর মধ্যে মৃত্যু হয় ১৫ জনের। একই বছর বরগুনাকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে স্বাস্থ্য বিভাগ। চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত বরগুনায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৭০১ জনের। এখন পর্যন্ত কারও মৃত্যুর তথ্য জানা যায়নি।
ডেঙ্গু বিস্তারের চিত্র
স্বাস্থ্য বিভাগের তিন বছরের হিসাবেও ডেঙ্গুর বিস্তারের পরিবর্তনটি স্পষ্ট। ২০২৪ সালে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৮ হাজার ৭৭৩ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয় ৬৪ জনের। ২০২৫ সালে রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৮১৫ জনে। এর মধ্যে মৃত্যু হয় ৫১ জনের।
বরিশাল বিভাগে ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। এর আগে বিভাগে ডেঙ্গুর কোনো ইতিহাস ছিল না বলে জানায় বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর কয়েক বছরের ব্যবধানে রোগটি বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. লোকমান হাকিম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগী অনেকটা বেড়ে গেছে এবং এখনো অব্যাহত আছে। তাঁরা পরিস্থিতি সামাল দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। হাসপাতালে আসা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যাপারে সব ধরনের প্রস্তুতি আছে।