মাউন্ট এলব্রুসের পথে: চূড়ায় পৌঁছানোর গল্প
· Prothom Alo

বৈরী আবহাওয়া, বাতিল সামিট পুশ আর অনিশ্চয়তার পরও থামেননি ইকরামুল হাসান শাকিল। শেষ পর্যন্ত ভোরের আলো ফোটার আগেই অ্যালেক্সা ও হেদারের সঙ্গে ছুঁয়েছেন ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুসের চূড়া।
Visit rouesnews.click for more information.
দীর্ঘ কয়েকদিন শাকিলের কাছ থেকে কোনো খবর ছিল না। যোগাযোগ বন্ধ থাকায় মনে তৈরি হয়েছিল নানা আশঙ্কা। হয়তো অভিযান বাতিল হয়েছে, কিংবা এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার কারণে যোগাযোগ করাও সম্ভব হচ্ছে না। সেই উদ্বেগের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত আসে একটি ভয়েস নোট। তাতেই জানা যায়, ইকরামুল হাসান শাকিল পৌঁছে গেছেন মাউন্ট এলব্রুসের চূড়ায়। তবে এই সাফল্যের পেছনে ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক রোমাঞ্চকর গল্প।
যেদিন সব পরিকল্পনা বদলে গেল
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে সামিট পুশ করার কথা ছিল। তাই ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্রামের দিন। আগের দিনের হাইকিং ও অ্যাক্লিমাটাইজেশন শেষে শাকিল ও তাঁর সঙ্গীরা উঠে যান হাই ক্যাম্পে। পরিকল্পনা ছিল ২৪ তারিখ দিবাগত রাত ৩টায় শুরু হবে চূড়ায় ওঠার চেষ্টা।
কিন্তু পাহাড় সব সময় পরিকল্পনা মেনে চলে না। বিকেল থেকেই আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করে। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এমনকি তাঁবু থেকে বের হয়ে বাথরুমে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে রাত ৩টার নির্ধারিত সামিট পুশ বাতিল করতে হয়।
তখনও হাতে ছিল একটি রিজার্ভ ডে, ২৬ সেপ্টেম্বর। কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাসও আশাব্যঞ্জক ছিল না। সারারাত ও দিনের তুষারপাতের পর ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও কম ছিল, যাতে পরদিন সকালে নিরাপদে সামিট করা যায়।
উঁচু পর্বতে আবহাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, এ কথাই বারবার বলছিলেন শাকিল। এলব্রুস ও ককেশাস পর্বতমালার আবহাওয়া দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাই নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে শেষ পর্যন্ত গাইড ও এজেন্সি অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
তবুও মিরাকেলের অপেক্ষা
অভিযান বাতিলের খবরে স্বাভাবিকভাবেই মন ভেঙে যায় শাকিল ও হেদারের। তবু তাঁরা আশা ছাড়েননি। দুজনেই প্রার্থনা করছিলেন, যদি সামান্য কোনো সম্ভাবনাও তৈরি হয়!
সন্ধ্যার দিকে সেই সম্ভাবনাই যেন তৈরি হলো। গাইড এসে জানান, রাত সাড়ে ৮টায় ডিনারের পর আবহাওয়া কিছুটা অনুকূল হলে সামিট পুশের চেষ্টা করা যেতে পারে।
পরিস্থিতি খারাপ হলে যেকোনো মুহূর্তে ফিরে আসতে হবে, এটাই ছিল মূল শর্ত।
এই খবরেই আবার আশার আলো ফিরে আসে। ডিনারের পর শুরু হয় আলোচনা। এর মধ্যে আরও দুটি দলও তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার আগ্রহ জানায়। শেষ পর্যন্ত নতুন সিদ্ধান্ত হয়, রাত ২টায় সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা হবে সবাই।
রাতের অন্ধকারে চূড়ার পথে
রাত ২টা। তীব্র ঠান্ডা, বাতাস ও তুষারপাতের মধ্যেই ক্যাম্প ছাড়ে দলগুলো। কিন্তু খুব বেশি দূর এগোনোর পরই বাকি দুটি দল পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
শেষ পর্যন্ত পথে থেকে যান মাত্র তিনজন: শাকিল, তাঁর গাইড অ্যালেক্সা এবং হেদার।
চারপাশে তখন প্রায় শূন্য দৃশ্যমানতা। প্রচণ্ড বাতাসের সঙ্গে উড়ে আসছিল তুষার। শরীর ও পোশাকের ওপর জমছিল বরফ। এমন অবস্থায় অন্ধকারের মধ্যে পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া ছিল কঠিন এক পরীক্ষা। তবু থামেননি তাঁরা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার পর অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। রাশিয়ান সময় ভোর সাড়ে ৭টায় শাকিল, অ্যালেক্সা ও হেদার পা রাখেন মাউন্ট এলব্রুসের চূড়ায়।
অসম্ভব থেকে বাস্তব
কয়েক ঘণ্টা আগেও যে সামিট অসম্ভব মনে হচ্ছিল, সেটিই তখন বাস্তব। ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে শাকিল ও হেদারের সামনে যেন খুলে যায় পুরো অভিযানের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত।
চূড়ায় পৌঁছানোর পর নিরাপদেই নিচে নেমে আসেন তাঁরা। দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠিন আবহাওয়া, অনিশ্চয়তা এবং শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, সবকিছু পেরিয়ে এলব্রুসের চূড়া ছুঁতে পারা ছিল তাঁদের জন্য এক অনন্য অর্জন।
এই অভিযান শুধু একটি পর্বত জয়ের গল্প নয়। এটি ধৈর্য, প্রস্তুতি এবং সুযোগকে কাজে লাগানোরও গল্প। পাহাড়ের কাছে মানুষ যত ছোটই হোক, সঠিক সময়ের অপেক্ষা আর সাহস কখনো কখনো অসম্ভবকেও সম্ভব করে দিতে পারে।
এভাবেই শেষ হলো মাউন্ট এলব্রুস অভিযানের এই দিনলিপি। একটি যাত্রা, যার শুরু হয়েছিল অচেনা উচ্চতার পথে পা বাড়িয়ে, আর শেষ হলো ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর গর্বের মুহূর্তে।
ছবি: ইকরামুল হাসান শাকিল