আপনজনের সম্পদ কি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যায়

· Prothom Alo

রায়হান আল ইমরান 

“ওর জিনিস ব্যবহার করতে আবার জিজ্ঞেস করা লাগবে নাকি!” পরিবার, বন্ধুমহল কিংবা কর্মক্ষেত্রে এমন কথা আমরা প্রায়ই শুনি। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে অনেক সময় আমাদের মনে হয়, প্রিয়জনের জিনিস ব্যবহার করতে আবার আলাদা করে অনুমতি নেওয়ার কী প্রয়োজন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

কখনো বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে যায় যে, অনুমতি নেওয়ার কথাটিই আর মনে থাকে না।

কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়, সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা কখনো মানুষের অধিকার ও ব্যক্তিগত সীমারেখাকে মুছে দেয় না। বরং আপনজনের হক রক্ষা করা, তার সম্পদ ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখানোই একজন মুমিনের উত্তম চরিত্রের পরিচয়।

অন্যের সম্পদ ব্যবহারে অনুমতির গুরুত্ব 

ইসলাম মানুষের সম্পদ, মালিকানা ও অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)

এই নির্দেশ শুধু চুরি, আত্মসাৎ কিংবা বড় ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; বরং এতে অন্যের সম্পদের প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষাও রয়েছে।

কারও মোবাইল, বই, পোশাক, ব্যাগ কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত সামগ্রী মূল্য যত কমই হোক না কেন, মালিকানা যার, সেটি ব্যবহারের অধিকারও মূলত তারই।

সামান্য সময়ের জন্য হলেও অনুমতি প্রয়োজন 

“শুধু দুই মিনিটের জন্য নিয়েছি, একটা কল করব, একটু দেখে আবার রেখে দেব।” দৈনন্দিন জীবনে এমন যুক্তি আমাদের খুবই পরিচিত। কিন্তু ব্যবহারের সময় অল্প হলেই অন্যের অনুমতির প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “কোনো মুসলিমের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া গ্রহণ করা হালাল নয়।” (সুনানে দারাকুতনি: ৩/২৬)

এই হাদিস মালিকের সন্তুষ্টি ও সম্মতিকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। তাই কারও সম্পদ স্থায়ীভাবে নিয়ে নেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি তার সম্মতি ছাড়া সাময়িকভাবে ব্যবহার করাকেও হালকা করে দেখা উচিত নয়।

কেউ তার গাড়ি আপনাকে একটি নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। এর অর্থ এই নয় যে আপনি গাড়িটি অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারবেন, নিজের ইচ্ছামতো অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারবেন
অন্যের ঘরে প্রবেশ: ইসলাম যেভাবে অনুমতি নিতে বলে

অনুমতির সীমারেখা 

কেউ কোনো জিনিস ব্যবহারের অনুমতি দিলেই সেই জিনিসের ওপর সীমাহীন অধিকার তৈরি হয় না। অনুমতিরও একটি সীমা ও পরিসর থাকে।

ধরা যাক, কেউ তার গাড়ি আপনাকে একটি নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। এর অর্থ এই নয় যে আপনি গাড়িটি অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারবেন, নিজের ইচ্ছামতো অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারবেন কিংবা নির্ধারিত সময়ের পরও নিজের কাছে রেখে দিতে পারবেন।

আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দেবে।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)

অন্যের কোনো জিনিস আমাদের হাতে এলে সেটি এক ধরনের আমানত। তাই মালিক যে উদ্দেশ্যে এবং যতটুকু ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন, ততটুকুই ব্যবহার করা উচিত।

ক্ষতি হলে দায় এড়ানো নয়

কারও কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কোনো কিছু ব্যবহার করার পর সেটি নষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিষয়টি গোপন করা উচিত নয়। বিশেষ করে নিজের অসতর্কতা, অবহেলা বা ভুলের কারণে ক্ষতি হলে মালিককে বিষয়টি জানানো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

নবীজি (সা.) বলেছেন,“ (অন্যের) ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবেও ক্ষতি করা যাবে না।” (সুনানে দারাকুতনি, ৩/৭৭)

ব্যবহারের সঙ্গে গোপনীয়তার প্রশ্ন 

বর্তমান সময়ে অন্যের জিনিস ব্যবহারের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত।

কারও ফোন ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া মানে তার ব্যক্তিগত কথোপকথন, ছবি, ই-মেইল, নোট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা দেখার অধিকার পাওয়া নয়।

ভাইয়ের অজান্তে মানিব্যাগ থেকে টাকা নেওয়া কি চুরিসুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।

একইভাবে, কারও ব্যাগ বা ডায়েরি ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও তার ব্যক্তিগত বিষয় পড়ার অনুমতি তৈরি হয় না।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

অর্থাৎ, কোনো জিনিস ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া আর সেই জিনিসের ভেতরে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য বা গোপনীয় বিষয় দেখার অনুমতি পাওয়া দুটি এক বিষয় নয়।

ভুল হয়ে গেলে করণীয়

মানুষ ভুল করতেই পারে। কখনো না বুঝে, কখনো অভ্যাসবশত, আবার কখনো অসতর্কতার কারণে কারও জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার হয়ে যেতে পারে।

ভুলটি বুঝতে পারার পর সবচেয়ে সুন্দর ও দায়িত্বশীল পথ হলো, ভুল স্বীকার করা, ক্ষমা চাওয়া এবং প্রয়োজন হলে ক্ষতিপূরণ করা।

নবীজি (সা.) বলেছেন,“যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের প্রতি তার সম্মানহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়...।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯)

শেষ কথা

অনুমতি ছাড়া অন্যের জিনিস ব্যবহার করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। একই সঙ্গে এটি একজন মুমিনের চরিত্র ও অন্যের অধিকারের প্রতি তার সম্মানবোধেরও পরীক্ষা।

তাই অন্যের কোনো জিনিস ব্যবহারের আগে ছোট্ট একটি প্রশ্ন করুন, “আমি কি এটা ব্যবহার করতে পারি?”

হতে পারে, এই ছোট্ট প্রশ্নটিই আপনাকে অন্যের হক নষ্ট করা থেকে বাঁচিয়ে দেবে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও সৌহার্দ্যময় ও টেকসই করে গড়ে তুলবে।

  • রায়হান আল ইমরান: আলেম, লেখক ও গবেষক

মালিক খুঁজে না পেলে অবৈধ সম্পদ থেকে দায়মুক্তির পথ কী

Read full story at source