আধুনিক গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সম্প্রসারণে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ জরুরি

· Prothom Alo

প্রতিবছর ২৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস পালিত হয়। এ দিবসের লক্ষ্য হলো ব্যক্তি ও দম্পতিকে সঠিক তথ্য, নিরাপদ ও মানসম্মত গর্ভনিরোধক পদ্ধতির সুযোগ এবং স্বাধীন ও সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা—সব গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং তরুণ-তরুণীদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞানভিত্তিক ও সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে তোলা।

এ ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার পরিকল্পনা হলো ব্যক্তি ও দম্পতির স্বাধীন ও সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ—তাঁরা সন্তান নেবেন কি না, কখন নেবেন, কতজন সন্তান নেবেন এবং গর্ভধারণের মধ্যে কতটা ব্যবধান রাখবেন এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, সেবা ও পদ্ধতিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

Visit afsport.lat for more information.

বাংলাদেশের বর্তমান পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘অধিকতর গর্ভনিরোধক পদ্ধতি-পছন্দ নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তবে এখানে বিনিয়োগ বলতে শুধু গর্ভনিরোধকসামগ্রী কেনার বাজেট বৃদ্ধি নয়; বরং পদ্ধতির বৈচিত্র্য, মানসম্মত সেবা, প্রশিক্ষিত জনবল, সরবরাহ চেইন, কাউন্সেলিং, চাহিদা তৈরি এবং চূড়ান্ত প্রবেশগম্যতা—সবকিছুর ওপর বিনিয়োগকে বোঝায়।

বাংলাদেশের জন্য কেন এদিনটি গুরুত্বপূর্ণ

১. বর্তমানে দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ ৩০ বছরের নিচে—এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় তরুণ প্রজন্ম। দেশে প্রতি ৫ জনে ১ জন কিশোর–কিশোরী। ২০-২৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের প্রতি ২ জনের ১ জনের বিয়ে হয় ১৮ বছরের পূর্বে এবং প্রায় প্রতি ৪ জনে ১ জন কিশোরী মাতৃত্বের শিকার হন ১৯ বছরের মধ্যে। তাঁদের অবশ্যই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, যার মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা সেবাও অন্তর্ভুক্ত, পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে; পাশাপাশি নিজেদের জীবন সম্পর্কে সুস্থ, সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতাও অর্জন করতে হবে।

২. সর্বশেষ মিকস ২০২৫ (মাল্টিপল কাস্টার ইন্ডিকেটর সার্ভে)-এর জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট প্রজনন হার বেড়ে প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রজনন হার ২.১-এ পৌঁছানোর পরিবর্তে ২.৪ এবং একই সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৬২ শতাংশ থেকে ৫৮ শতাংশে (আধুনিক পদ্ধতি ৫৪.৬%)-এ হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদার হার বেড়ে হয়েছে ১৬.২ শতাংশে, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। তা ছাড়া মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির সরবরাহের ঘাটতিও ঘটেছে, যা সময়মতো সরকারি ক্রয় কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন না করার কারণে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল থেকে সৃষ্ট হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর বড় সময়ের ঘাটতি থাকার ফলে প্রজননস্বাস্থ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণসহ নানা বিরূপ প্রভাব পড়ছে ও সামনে পড়বে।

৩. পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতি ব্যবহারে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের অগ্রগতি থাকলেও গর্ভনিরোধক ব্যবহারকারীদের মধ্যে পদ্ধতি পরিত্যাগের হার এখনো বেশি। বাংলাদেশ জনমিতিক ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারে বিচ্ছিন্নতার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং পদ্ধতি–সংক্রান্ত ব্যবহার অভিজ্ঞতা। একই সঙ্গে বিভিন্ন গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারের সময় গর্ভধারণ এবং এক পদ্ধতি থেকে অন্য পদ্ধতিতে পরিবর্তনের ঘটনাও দেখা যায়।

৪. পরিবার পরিকল্পনা সেবার আওতাভুক্তি ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পাশাপাশি; এখন মানসম্মত ও পছন্দভিত্তিক সেবা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।

৫. পরিবার পরিকল্পনায় এক পদ্ধতি সবার জন্য নয়। ফলে নারীর বয়স, সন্তান সংখ্যা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা, মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোকালীন, ভবিষ্যৎ সন্তান নেওয়ার অভিপ্রায়, স্বামী/সঙ্গীর অবস্থান এবং জীবনযাত্রা অনুযায়ী পছন্দনীয় গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ভিন্ন হয়ে থাকে। তা ছাড়া পছন্দনীয় গর্ভনিরোধক পদ্ধতি—এ শিক্ষা, আর্থিক অবস্থান, শহর-গ্রামে অবস্থানের পার্থক্যও রয়েছে।

৬. বাংলাদেশ ২০২৫-২০৩০ মেয়াদের জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল পরিবার পরিকল্পনা সেবাকে আরও শক্তিশালী করা, অধিকার ও পছন্দকে নিশ্চিত করা। ওই কৌশল অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে হবে, কোথায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে?

নকল ও নিম্নমানের জন্মনিরোধক সামগ্রী ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘সেবার আওতাভুক্তি সম্প্রসারণ’ বাড়ানোর পাশাপাশি ‘পছন্দ’ নিশ্চিত করা—একজন নারী বা দম্পতি যেন নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী পর্যাপ্ত তথ্য জেনে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত হয়ে এবং কোনো চাপ ছাড়াই পছন্দের পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগের প্রতিদান। ইউএনএফপিএ-এর এক হিসাবে জানা যায়, বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনায় প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ১৪ ডলার স্বাস্থ্য ও সামাজিক ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে; একই সঙ্গে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস বা কমানোর ক্ষেত্রেও এর বড় প্রভাব রয়েছে।

৭. বাংলাদেশের বর্তমান পরিবার পরিকল্পনা পরিস্থিতিতে গর্ভনিরোধকসামগ্রীর নিরাপত্তা/নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহকে শুধু ‘গুদামে পর্যাপ্ত পণ্য আছে কি না কিংবা নেই কেন’ এ প্রশ্নে দেখা যথেষ্ট নয়। সামগ্রী পণ্য আছে কি? নিয়মিত আছে কি? সব পদ্ধতি আছে কি? মানসম্মত ও নিরাপদ কি? সঠিক সময়ে সঠিক কেন্দ্রে আছে কি? ব্যবহারকারী নিজের পছন্দের পদ্ধতি পাচ্ছেন কি? স্টক আউট আগেই বোঝা যাচ্ছে কি? সরকারি ক্রয় কার্যক্রম সময়মতো হচ্ছে কি? জরুরি মজুত আছে কি? সংকট/দুর্যোগেও সরবরাহ থাকবে কি? এটিকে সঠিক পদ্ধতি, সঠিক মানে—সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে, সাশ্রয়ীভাবে এবং পছন্দের স্বাধীনতাসহ পাওয়া—এ পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা দরকার। গর্ভনিরোধকসামগ্রীর নিরাপত্তার পাঁচটি স্তর: ক. পর্যাপ্ততা, খ. নিরবচ্ছিন্নতা গ. পদ্ধতি-পছন্দের বৈচিত্র্য ঘ. গুণমান ও নিরাপত্তা ও ঙ. প্রবেশগম্যতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে সব সময়।

বাংলাদেশে বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবসের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক, কারণ এটি শুধু গর্ভধারণ প্রতিরোধের বিষয় নয়; বরং পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ দিবসের গুরুত্বে কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ জরুরি:

১. অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ প্রতিরোধে সঠিক ও সহজলভ্য গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ কমাতে সহায়তা করে এবং দম্পতিদের কাঙ্ক্ষিত পরিবার গঠনে সক্ষম করে তোলা।

২. মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গর্ভধারণের সঠিক সময় ও ব্যবধান নিশ্চিত করা মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে খুব অল্প বয়সে, ঘন ঘন বা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবার পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৩. কিশোরী ও তরুণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্ব এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস কিশোর-কিশোরীদের জন্য বয়স উপযোগী, বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য এবং যুববান্ধব প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে।

৪. নারীর ক্ষমতায়নে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের সুযোগ নারীদের কখন সন্তান নেবেন, কতজন সন্তান নেবেন এবং সন্তানদের মধ্যে কতটা ব্যবধান রাখবেন—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে।

৫. পরিবার পরিকল্পনায় অপূর্ণ চাহিদা পূরণে পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পদ্ধতি নির্বাচনের সুযোগ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক পরামর্শ, পদ্ধতি পরিবর্তনের সুযোগ এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।

৬. যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিত করতে গর্ভনিরোধক তথ্য ও সেবা নিশ্চিত-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দিবসটি স্বেচ্ছাভিত্তিক, অধিকারভিত্তিক এবং বৈষম্যহীন পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করার বার্তা প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

৭. সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী—যেমন গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নগর বস্তিবাসী, দরিদ্র পরিবার, কিশোর-কিশোরী, অভিবাসী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এ দিবসটির মাধ্যমে তুলে ধরা যায়।

৮. জনমিতিক পরিবর্তন বা রূপান্তরে প্রজনন হার এবং ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পরিবার পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জনসংখ্যার বার্ধক্য ও নির্ভরশীলতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

৯. টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে পরিবার পরিকল্পনা সরাসরি এসডিজি ৩.৭-এর সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, তথ্য ও শিক্ষায় সর্বজনীন প্রবেশাধিকারের কথা বলা হয়েছে। এসডিজি ৩ (সুস্বাস্থ্য), এসডিজি ৫ (জেন্ডারসমতা) এবং এসডিজি (অসমতা হ্রাস)-এর সঙ্গেও সম্পর্কিত। আর মাত্র ৪ বছর রয়েছে অভীষ্ট অর্জনের—ফলে জোরালো সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পরিশেষে বলতে চাই, বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস শুধু গর্ভধারণ প্রতিরোধের দিবস নয়; এটি প্রত্যেক নারী, পুরুষ ও দম্পতির তথ্যভিত্তিক, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রজনন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে পছন্দ ও অধিকার নিশ্চিতে মানসম্মত সেবার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগে গড়তে হবে সুস্থ পরিবার-সুস্থ বাংলাদেশ। আর পরিকল্পিত পরিবার মানেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

  • ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ এবং সাবেক ডিন (ভারপ্রাপ্ত), সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source