নারীস্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রয়োজন আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি

· Prothom Alo

জন্মনিয়ন্ত্রণ বা গর্ভনিরোধক পদ্ধতি কেবল পরিবার পরিকল্পনার সাধারণ কোনো উপায় নয়। গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত প্রত্যেক নারীর নিজস্ব অধিকার। এটি তাঁর শারীরিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবে আধুনিক যুগেও জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা সমাজে একধরনের বাধা বা সংকোচন হয়ে আছে। বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এ নিয়ে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। পিল বা গর্ভনিরোধক ব্যবহার করলে নারী চিরতরে বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারেন, এমন অমূলক ভয় সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পৈতৃক পারিবারিক কাঠামো।

সেখানে সন্তানের সংখ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরুষেরা একাই নেন। ফলে নিজের শরীরের ওপর অধিকার থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীকে নীরব থাকতে হয়। উপরন্তু সঠিক প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষার অভাবে নারীরা সচেতন হতে পারছেন না। সামাজিক এই প্রতিবন্ধকতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি।

Visit tr-sport.click for more information.

নারীর স্বাস্থ্য রক্ষা ও জীবনমানের উন্নতির জন্য আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভূমিকা অপরিসীম। একটি পরিকল্পিত পরিবার মাতৃত্বকালীন নানা ঝুঁকি কমায়। এটি মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। সঠিক সময় ও ব্যবধান মেনে সন্তান নিলে নারীর শরীর স্বাভাবিক শক্তিতে ফিরে আসে। প্রসূতি মৃত্যুর আশঙ্কা এতে অনেক কমে যায়।

বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশে গত কয়েক দশকে মাতৃমৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমেছে। এর পেছনে সঠিক প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সহজলভ্যতা বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই সুযোগ নারীকে নিজের জীবন ও কর্মজীবনের পরিকল্পনা করার পথ দেখায়। এটি নারীর অগ্রযাত্রায় এক মজবুত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

ডা. আরিফা শারমিন মায়া সহকারী অধ্যাপক

বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিকায়নে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন স্ব-প্রয়োগযোগ্য বা ‘সেলফ-ইনজেকটেবল’ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। বহু নারীর জন্য দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকা ইনজেকশন এক সহজ সমাধান হিসেবে দেখা দিয়েছে। যেসব নারী প্রতিদিন নিয়ম করে পিল খেতে ভুলে যান, তাঁদের জন্য এটি খুব সুবিধাজনক। আবার কাজের ব্যস্ততায় যাঁরা নিয়মিত ওষুধ খেতে পারেন না, তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর ইনজেকশন নেওয়া অনেক সহজ। এতে প্রতিদিনের ওষুধ খাওয়ার মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর হয়।

এটি নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন আলো দেখাচ্ছে।

আধুনিক ইনজেকশন পদ্ধতির মধ্যে ইউনিজেক্ট ডিভাইসে তৈরি ‘ডিএমপিএ ১০৪ মি.গ্রা./মি.লি.’ বেশ আধুনিক সুবিধা দিচ্ছে। এটি মূলত ত্বকের নিচে বা সাবকিউটেনিয়াস পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা হয়। ত্বকের নিচে প্রয়োগ করা এই ওষুধ শরীরে ধীরে ধীরে শোষিত হয়। সাধারণ মাংসপেশিতে নেওয়া ইনজেকশন সাধারণত ১৩ সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যকর থাকে। কিন্তু ত্বকের নিচে দেওয়া এই নতুন পদ্ধতি প্রায় ১৪ সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে। এ ছাড়া এটি ত্বকের উপরিভাগে প্রয়োগ করা হয়। তাই শরীরের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয় থাকে না। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও অন্য পদ্ধতির চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম। ফলে এটি নারীদের জন্য একটি নিরাপদ স্বাস্থ্যবলয় তৈরি করে।

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে কর্মজীবী নারীদের ব্যস্ততা অনেক বেশি। একজন কর্মজীবী নারীকে একদিকে যেমন পেশাগত দায়িত্ব সামলাতে হয়, অন্যদিকে পারিবারিক জীবনের সমন্বয় করে সামলাতে হয়। তাই বারবার হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার ঝামেলা এড়ানো তাঁদের জন্য জরুরি কিংবা প্রতিদিন পিল খাওয়ার উদ্বেগ থেকে মুক্তি পাওয়া তাঁদের জন্য এক বড় মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি। তাই কর্মজীবী নারীদের জন্য এই আধুনিক প্রযুক্তিগুলো অত্যন্ত সুবিধাজনক ও সময়োপযোগী। আধুনিক ব্যবস্থা নারীদের সেই স্বাধীনতা ও স্বস্তি দিচ্ছে। সামাজিক কুসংস্কার কিংবা পারিবারিক বাধা পেছনে ফেলে নিরাপদ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন; যাতে প্রত্যেক নারীর শারীরিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। প্রজননস্বাস্থ্যের এই যুগান্তকারী উন্নয়ন নারীকে এগিয়ে যাওয়ার নতুন পথ ও সাহস জোগায়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

Read full story at source