ট্রাম্পের চাপই কি ব্রিকসের জন্য আশীর্বাদ

· Prothom Alo

ব্রিকসের প্রতি নিজের বিরাগ কখনোই গোপন করেননি এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি গত বছরই ঘোষণা দিয়েছিলেন, উদীয়মান অর্থনীতির এই জোটের ‘আমেরিকাবিরোধী নীতি’র সঙ্গে কোনো দেশ নিজেদের যুক্ত করলে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। সেই ঘোষণার পর থেকে তাঁর প্রশাসন জোটের অন্যতম প্রধান সদস্য ব্রাজিল, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর ওপর একের পর এক আগ্রাসী শুল্কারোপ করে চলেছে।

হোয়াইট হাউসের বার্তাটি এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট—যারা মার্কিন অর্থনৈতিক মোড়লপনাকে চ্যালেঞ্জ জানাবে, তাদের চড়া খেসারত দিতে হবে।

Visit casino-promo.biz for more information.

তবে চাপ সৃষ্টি করারও একটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। আজ নয়াদিল্লিতে যখন ব্রিকস নেতারা বৈঠকে বসছেন, ট্রাম্প তখন অজান্তেই এই জোটের আবেদন বাড়াতে রসদ জুগিয়ে চলেছেন। ওয়াশিংটন যত বেশি নিজ দেশের বাজার, আর্থিক ব্যবস্থা এবং ডলারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার বানাবে, বাকি বিশ্ব এসবের ওপর থেকে নির্ভরতা কমানোর তাগিদও তত বেশি অনুভব করবে।

ব্রিকস কি পশ্চিমের মোড়লগিরি ঠেকাতে পারবে

এর মানে কিন্তু এই নয় যে ব্রিকস রাতারাতি একটি মার্কিনবিরোধী জোটে পরিণত হচ্ছে। বিষয়টি একেবারেই তা নয়।

১১ সদস্যের এই ব্রিকস পরিবারে (ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) রয়েছে চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক আর বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করলেও এই দেশগুলোর নীতি, নিরাপত্তা চিন্তাভাবনা কিংবা ভূরাজনৈতিক অবস্থান এক নয়।

সাম্প্রতিক সময়ের নানা ঘটনা এই অভ্যন্তরীণ মতভেদকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার মধ্যে ইরান, সৌদি আরব ও ইউএই একদম বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। গত মে মাসেই নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মুখোমুখি বাগ্‌যুদ্ধে জড়ান ইরান ও আমিরাতের প্রতিনিধিরা। আবার ভারত ও চীনের সম্পর্ক ২০২০-২১ সালের প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষ কাটিয়ে কেবল গত দুই বছরে কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

ফলে ট্রাম্পের পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কোনো সম্মিলিত ভূরাজনৈতিক অক্ষ তৈরি করে ফেলতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

তবে তিনি ভিন্নমুখী স্বার্থের এই দেশগুলোকে একটি সাধারণ বিন্দুতে এনে দাঁড় করাচ্ছেন। সেটি হলো মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ থেকে নিজেদের সুরক্ষা দেওয়ার তাগিদ।

পশ্চিমা বলয়ের বাইরে থাকা দেশগুলোর জন্য মার্কিন কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি বড় ধরনের ঝুঁকি।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডলারের যে রাজত্ব, তা ওয়াশিংটনকে একচ্ছত্র কাঠামোগত সুবিধা দেয়। বিশ্বজুড়ে চলা আন্তর্জাতিক লেনদেনের বড় অংশই এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাত ঘুরে যায়, যা মার্কিন এখতিয়ারের অধীন। চাইলে যেকোনো দেশের মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার আটকে দেওয়া যায় কিংবা স্রেফ নিষেধাজ্ঞার খড়্গ ঝুলিয়ে সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়।

অবশ্য ব্রিকস দেশগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে বলেই যে রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলার তার রাজত্ব হারিয়ে ফেলবে, তা নয়। ব্রিকস সম্মেলন ঘনিয়ে এলেই ডলারের পতন ও নতুন ‘ব্রিকস মুদ্রা’ আসার যে চমকপ্রদ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, বাস্তবতার সঙ্গে তার যোগসূত্র খুব কম।

ভারতে ব্রিকস সম্মেলন: বিশ্বনেতাদের মধ্যে কেন চাপা দুশ্চিন্তা

মুদ্রাবাজারে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য এখনো সুদৃঢ়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেও বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫৭ দশমিক ১ শতাংশই ছিল ডলারে। তার বিপরীতে চীনা ইউয়ানের অবস্থান মাত্র ২ শতাংশ। এমনকি এই সময়ে ডলারের শেয়ার সামান্য বেড়েছে।

তবে ডলারকে পুরোপুরি ‘প্রতিস্থাপন’ করা আর এর ওপর ‘নির্ভরতা কমানো’—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

ব্রিকস মূলত দ্বিতীয় পথটিতেই হাঁটছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ইতিমধ্যেই চীনের ‘ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমে’ যুক্ত হয়ে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেন সারছে। ব্রাজিল ও চীন নিজ নিজ মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়িয়েছে। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রুপি ও দিরহামে লেনদেন নিষ্পত্তি করছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সিংহভাগই সম্পন্ন করছে জাতীয় মুদ্রায়।

একই সঙ্গে পুরো ব্রিকস জোট ধীরে ধীরে একটি নিজস্ব আর্থিক সংযোগ তৈরির পথে এগোচ্ছে।

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। নয়াদিল্লি, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গত বছরের সম্মেলনে ব্রিকস নেতারা একটি সীমান্ত পারাপার লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সদস্যদেশগুলোর পেমেন্ট সিস্টেমকে এক সুতোয় বাঁধার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চলতি বছরের আগস্টেই রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা নিশ্চিত করেছেন যে ব্রিকস দেশগুলো তাদের ফাস্ট-পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ও সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। ভারত নিজেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রুপির ব্যবহার বাড়াতে জোর দিচ্ছে।

ব্রিকসের প্রতিষ্ঠিত ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এনডিবি) উন্নয়ন অর্থায়নে পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নিজস্ব মুদ্রায় ঋণ দেওয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এতে ঋণগ্রহীতা দেশগুলো ডলারের ওঠানামা ও চড়া বিনিময় হারের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে।

অবশ্য এই সবকিছুই যে রাতারাতি বিকল্প বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলবে, তা নয়। অনেক উদ্যোগই এখনো পরীক্ষামূলক বা সীমিত পরিসরে আটকে আছে।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই রাশিয়ার তেল কিনছে এবং ব্রিকসে দর–কষাকষির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ব্রাজিল দীর্ঘদিন ধরে চীনা বলয়ে না ঢুকেও নিজের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইউএই পশ্চিমাদের সঙ্গে সুগভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক রেখেই চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।

তাই ব্রিকস কি ডলারের বিকল্প হয়ে উঠবে—এই বিতর্কে আটকে থাকলে আসল ছবিটা বাদ পড়ে যাবে। আসল ঘটনাটি ঘটছে পর্দার আড়ালে। একটি বিকল্প কাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে পশ্চিমা মধ্যস্থতাকারী ও ডলার বাদ দিয়েই দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজনীয় বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে।

আর ট্রাম্পের নীতি এই প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুত গতি দিচ্ছে।

ব্রাজিলের কথাই ধরা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যে ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও গত জুলাই মাসে ওয়াশিংটন ব্রাইটের একাধিক পণ্যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপায়। একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন ব্রাজিলের অত্যন্ত সফল ও তুমুল জনপ্রিয় তাৎক্ষণিক লেনদেন মাধ্যম ‘পিক্স’-এর ওপর নজরদারি বাড়ায়। কারণ, এটি আমেরিকান কার্ড-পেমেন্ট নেটওয়ার্কগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল।

আবার রাশিয়া ও ইরানের ওপর মার্কিন কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করেছে, একটু এদিক-ওদিক হলেই পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা কীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। আর তাই বাধ্য হয়েই তারা বিকল্প পেমেন্ট ও বাণিজ্যিক কাঠামোর দিকে ঝোঁক বাড়িয়েছে। ওয়াশিংটন এখন রাশিয়া থেকে জ্বালানি নেওয়া চীন বা ভারতের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পথ খুঁজছে।

১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বিভিন্ন দেশের নেতারা দিল্লিতে আসতে শুরু করায় কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। শহরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে হাজারো নিরাপত্তাকর্মী

এই মার্কিন নীতির বার্তা বুঝতে মস্কো বা তেহরানের সঙ্গে বন্ধুত্বের কোনো প্রয়োজন নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মোড়লপনা শুধু তার বিশাল অর্থনীতি বা ডলারের ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি টিকে আছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের এই বিশ্বাসের ওপর যে মার্কিন ব্যবস্থায় থাকাটা বিকল্প ব্যবস্থার চেয়ে বেশি লাভজনক।

কিন্তু ওয়াশিংটন যখনই সেই বিশ্বস্ত ব্যবস্থাকে শাস্তিমূলক হাতিয়ার বানাবে, বাকি দেশগুলোর কাছে বিকল্প ‘পালানোর পথ’ তৈরি করাই একমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াবে।

এর মানে এই নয় যে ব্রিকস দেশগুলো ওয়াশিংটনের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে বেইজিংয়ের দাসত্ব মেনে নেবে।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই রাশিয়ার তেল কিনছে এবং ব্রিকসে দর–কষাকষির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ব্রাজিল দীর্ঘদিন ধরে চীনা বলয়ে না ঢুকেও নিজের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইউএই পশ্চিমাদের সঙ্গে সুগভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক রেখেই চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।

তাদের মূল লক্ষ্য কোনো এক পরাশক্তিকে হটিয়ে অন্য কারও অধীনে যাওয়া নয়, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রেখে নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো।

ব্রিকসের হাত ধরে বদলাচ্ছে বিশ্ব, বাংলাদেশ কী করবে

এই পার্থক্যটা বোঝা খুব জরুরি। রুপি, ইউয়ান বা র‍্যান্ডে লেনদেন হওয়া একটি বড় চুক্তি কখনোই মার্কিন ডলারের সিংহাসন টলাতে পারবে না।

কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্তে এ ধরনের চুক্তি যখন বছরের পর বছর ধরে বাড়তে থাকবে, তখন ওয়াশিংটনের কোনো অনুচিত প্রস্তাবে ‘না’ বলার সাহস ও সক্ষমতা দেশগুলোর তৈরি হয়ে যাবে।

তাই ব্রিকসকে স্রেফ একটি ‘আমেরিকাবিরোধী হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করাটা ওয়াশিংটনের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। কারণ, বিকল্প খোঁজার অপরাধে বিশ্বকে যত বেশি শাস্তি দেওয়া হবে, বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তাদের কাছে ততটাই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

ট্রাম্প মার্কিন শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানোটাকে ব্যয়বহুল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দিন শেষে তিনি হয়তো মার্কিন শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকাটাকেই দেশগুলোর জন্য আরও বেশি ব্যয়বহুল করে তুলছেন।

  • ইলান কাপুর কানাডার টরন্টোর ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

Read full story at source