সমিতির নেতাদের হাতেই জিম্মি পান রপ্তানি

· Prothom Alo

দেড় দশক ধরে পান রপ্তানি করে মাইশা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। গত ডিসেম্বরে ওমানের মাসকটে ১৫০ বক্স পান (প্রতি বক্সে ১৭ কেজি) পাঠাতে ঢাকার বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে নিয়ে আসে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই পান রপ্তানির জন্য পান রপ্তানিকারক সমিতির কাছ থেকে প্রত্যায়ন পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে তারা পান রপ্তানি করতে পারেনি। এতে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা লোকসান হয় তাদের।

Visit afnews.co.za for more information.

মাইশা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী কাউছার আহমেদ অভিযোগ করেন, ‘পান রপ্তানিকারক সমিতির নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ডিসেম্বরের পর আর পান রপ্তানি করতে পারছি না। রপ্তানি করতে হলে সমিতির সদস্যপদ থাকা বাধ্যতামূলক। গত বছর সদস্যপদ নিয়েছি, তবে টাকা জমা দিলেও সদস্যপদ নবায়ন করছে না সমিতি। কেন করছে না, সেটিও বলছে না।’

কাউছার আহমেদের মতো আরও বেশ কয়েকজন রপ্তানিকারক পান রপ্তানি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। তাঁদেরও অভিযোগ, এই খাতের সংগঠন বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির বিরুদ্ধে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। ফলে দেশ থেকে পান রপ্তানি কমে গেছে। এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের পানের বাজার চলে যাচ্ছে প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে।

ভুক্তভোগী রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় বাণিজ্য সংগঠন গঠিত হয়। অথচ পান রপ্তানিকারক সমিতির নেতারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতি বক্স পান রপ্তানির বিপরীতে নির্ধারিত হারে চাঁদা না দিলেই সমিতির সদস্যপদ থেকে তাদের বাদ দেওয়া হয়। তখন ওই প্রতিষ্ঠান আর পান রপ্তানি করতে পারে না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ কোটি ৪৮ লাখ মার্কিন ডলারের পান রপ্তানি হয়েছে। পরের অর্থবছর সেটি কমে হয় ২ কোটি ১৬ লাখ ডলার। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশ থেকে ৪২ লাখ কেজি পান রপ্তানি হয়েছে, যার রপ্তানিমূল্য ২ কোটি ২৮ লাখ ডলার। রপ্তানি হওয়া পানের বড় অংশই যায় মধ্যপ্রাচ্যে। গত অর্থবছর রপ্তানির ৯০ শতাংশ বা ২ কোটি ৬ লাখ ডলারের পান রপ্তানি হয় সৌদি আরবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর বলেন, সবজি রপ্তানিকারকেরাই মূলত পান রপ্তানি করতেন। পান রপ্তানিকারক সমিতির সদস্যপদ নেওয়ার শর্ত আরোপের পর পান রপ্তানি নিয়ে জটিলতা শুরু হয়েছে। এমন ব্যবস্থা কোথাও নেই। চরম অন্যায় হচ্ছে। মুক্তবাণিজ্যের অর্থনীতিতে এমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি বন্ধ হওয়া দরকার।

পান রপ্তানিতে সমস্যার শুরু

পান রপ্তানিকারক সমিতি ২০০২ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধন পায়। পরে এই সমিতির নিবন্ধন বাতিল চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করে বিএফভিএপিইএ। ২০০৫ সালে পান রপ্তানিকারক সমিতির নিবন্ধন বাতিল হয়। তখন আবার আবেদন করলে বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি নামে নতুন বাণিজ্য সংগঠনের নিবন্ধন দেয় মন্ত্রণালয়। আবার রিট করে বিএফভিএপিইএ। সেই রিটের নিষ্পত্তি হয় ২০২৩ সালে, সমিতির পক্ষে রায় দেন উচ্চ আদালত।

জানা গেছে, প্রথমবার নিবন্ধন পাওয়ার পর পান রপ্তানিকারক সমিতির তদবিরে ২০০৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশনা জারি করে যে সমিতির সদস্য ছাড়া কেউ পান রপ্তানি করতে পারবে না। তখন সমিতির বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় নির্দেশনাটি কার্যকর হয়নি। মামলা নিষ্পত্তি হলে সমিতির নেতারা তৎপর হয়ে ওঠেন। গত বছরের শুরুতে এনবিআর ২০০৩ সালের নির্দেশনা বলবৎ আছে কি না, সে বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চায়। মন্ত্রণালয় ইতিবাচক মত দিলে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা কাস্টম হাউস নির্দেশনা দেয়, পান রপ্তানিকারক সমিতির প্রত্যয়নপত্র ছাড়া পান রপ্তানির বিল অব এক্সপোর্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে না। যদিও মন্ত্রণালয়ের পুরোনো নির্দেশনা ছিল, সদস্যপদ থাকতে হবে।

একাধিক পান রপ্তানিকারক জানান, কাস্টম হাউসের নির্দেশনার পর পান রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ২৫ হাজার টাকা ফি দিয়ে সমিতির সদস্য হয়। তারপর প্রতি চালানে এক হাজার টাকা ফি দিয়ে সমিতির কাছ থেকে পান রপ্তানির প্রত্যয়নপত্র নিতে হয়। তবে গত বছরের শেষ দিকে প্রতি বক্স পান রপ্তানির প্রত্যয়নপত্র নিতে বাড়তি অর্থ আদায় করতে শুরু করেন সমিতির নেতারা।

অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে ইপিবি

১৭ জন পান রপ্তানিকারক চলতি বছরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে (ইপিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেন, পান রপ্তানিকারক সমিতি পানের রপ্তানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিষয়টি তদন্ত করে ইপিবি অভিযোগের সত্যতাও পায়।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ এনবিআরের গত বছরের নির্দেশনা সংশোধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, রপ্তানির প্রতি চালানের আগে প্রত্যয়নপত্র ইস্যুর বাধ্যবাধকতার কারণে সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানিকারকেরা অহেতুক বিড়ম্বনায় পড়ছেন। পান রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।

ইপিবির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ৮ এপ্রিল পান রপ্তানি সহজ, বাধা দূর ও নির্বিঘ্ন করতে ২০২৩ সালের নির্দেশনাটি বাতিল করে। এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করে পান রপ্তানিকারক সমিতি। শুনানির পর আদালত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে সেই স্থগিতাদেশ এক বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

জানা যায়, উচ্চ আদালত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার পর থেকে পান রপ্তানির জন্য সমিতির সদস্যপদ বাধ্যতামূলক করে ঢাকা কাস্টম কর্তৃপক্ষ। তার পর থেকেই কিছুদিন পরপর সদস্যদের নতুন নতুন তালিকা পাঠাতে শুরু করে পান রপ্তানিকারক সমিতি। গত ২৫ মে ৫৫ জন সদস্যের একটি তালিকা ঢাকা কাস্টমে দেয় সমিতি। তার ছয় দিন পর নতুন করে আবার ৫৭ জনের আরেকটি তালিকা দেয় তারা। সেখানে আগের তালিকার ছয় প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল না। একইভাবে ২৩ ও ২৭ জুলাই নতুন তালিকা দেয় সমিতি।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ডলফিন ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সৌদি আরবে পান রপ্তানির জন্য আমার কাছে সমিতির প্রতিনিধিরা বক্সপ্রতি ৫০০ টাকা দাবি করেন। আমি কোনো টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানাই। তার পর থেকে আমার প্রতিষ্ঠানের নাম সমিতির সদস্যপদের তালিকায় দেওয়া হয় না। গত ২৫ জুনের পর আর পান রপ্তানি করতে পারিনি।’

৪ জুন সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল কার্যালয়ের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পান রপ্তানির সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি রোধের ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, পান রপ্তানিকারক সমিতি সৌদি আরবে পান রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় এই খাত সংকটের মুখে পড়েছে।

কাদের হাতে সমিতি

পান রপ্তানিকারক সমিতির জন্মলগ্ন থেকেই সাধারণ সম্পাদক এ আর এস জেনারেল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী জামাল উদ্দিন সিকদার। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, গত তিন অর্থবছরে এই প্রতিষ্ঠান এক ডলারের পানও রপ্তানি করেনি। একইভাবে সমিতির সভাপতি এমরামুল করিমের প্রতিষ্ঠান মেট্রোপলিটন ট্রেডার্স এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হোসাইনুল কবির চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান এম এইচ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিংয়েরও গত তিন অর্থবছর একটি পানও রপ্তানির কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পান রপ্তানির প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার বিপরীতে বক্সপ্রতি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সিকদার গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই অভিযোগ মিথ্যা। আমরা অর্থ নিয়েছি, কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। প্রত্যয়নপত্র নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের পান রপ্তানি করায় আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে একটি চালানের জন্য তালিকা থেকে বাদ দিই। সে কারণে অনেক সময় তালিকায় কয়েকজন সদস্যদের নাম থাকে না।’ রপ্তানি না করেও সমিতির শীর্ষ পদে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘মামলা চালাতে গিয়ে আমি ব্যবসা করতে পারিনি। আমাদের (সমিতির শীর্ষ নেতৃত্ব) উদ্দেশ্য হলো ঝামেলাগুলো শেষ করে আমরা ব্যবসা করব।’

সমিতির প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডের কারণে পান রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই অর্থবছর ধরে কমছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭২টি প্রতিষ্ঠান পান রপ্তানি করেছে। পরের বছর সেটি কমে হয় ৬১, যা গত অর্থবছর আরও কমে ৪৪টিতে নেমে যায়।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, যেসব অভিযোগ এসেছে তাতে স্পষ্ট, সমিতির নেতারা রপ্তানিকারকদের জিম্মি করেছেন। পান রপ্তানিতে হয়রানি বন্ধে সরকারি হস্তক্ষেপ দরকার। সমিতির আয়-ব্যয়সহ অন্যান্য কার্যক্রমের নিরীক্ষা করতে হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। সেখানে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনগতভাবেও দ্রুত মীমাংসার উদ্যোগ লাগবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য পণ্যের মতো পান রপ্তানিতেও একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন করতে হবে।

Read full story at source