মহাবিপর্যয় এলে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ দেশ হবে কোনটি
· Prothom Alo
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচতে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো অস্ট্রেলিয়া। পারমাণবিক যুদ্ধ, আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ বা গ্রহাণুর আঘাতের মতো বিপদেও এই দেশ নিরাপদ থাকবে।
গবেষকেরা এমন কিছু জায়গা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন, যেগুলো মারাত্মক সব বিপদ সামলে টিকে থাকতে পারবে। এখানে মহাবিপর্যয় বলতে এমন সব ঘটনাকে বোঝানো হয়েছে, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব হ্যাগেনের গবেষক ফ্লোরিয়ান উলরিখ জেন এই গবেষণার প্রধান। তিনি জানান, এসব ভয়াবহ বিপদ খুব কম ঘটে। আর এ কারণেই এ ধরনের মহাবিপর্যয় নিয়ে গবেষণাও অনেক কম হয়েছে। মানুষও বিষয়টিকে খুব সহজে এড়িয়ে যায়।
তবে এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা ঘটা এখনো সম্ভব। আর তা ঘটলে পৃথিবীর কোনো দেশই এর প্রভাব থেকে রেহাই পাবে না। তবে কিছু কিছু অঞ্চল অন্যদের তুলনায় বেশি বিপদে পড়বে।
ভূমিধস কী, কেন, কীভাবেগত ২৩ আগস্ট ‘গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস’ জার্নালে এই নতুন গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এতে গবেষকরা খাদ্যনিরাপত্তা, জৈব অস্ত্র ও আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মতো নানা বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য মহাবিপর্যয়ের ঝুঁকিগুলো খুঁজে বের করা। পাশাপাশি অতীতে ছোট পরিসরে কোনো জনগোষ্ঠী কীভাবে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিল, তা–ও দেখা। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তারা নিজেদের ডেটাবেজে বিভিন্ন গবেষণাপত্রও যুক্ত করেন।
গবেষক দলটি মূলত তিন ধরনের বড় ঝুঁকির কথা চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটি হলো, সূর্যের আলো আটকে দেয় এমন ঘটনা। যেমন পারমাণবিক যুদ্ধ বা বিশাল কোনো আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। দ্বিতীয়টি হলো, বৈশ্বিক অবকাঠামো ধ্বংসকারী ঘটনা। এর মধ্যে রয়েছে ভূচৌম্বকীয় ঝড় বা বড় আকারের সাইবার আক্রমণ। আর তৃতীয়টি হলো জৈব ঝুঁকি বা বায়োহ্যাজার্ড। মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা দ্রুত বিপুল মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।
গবেষকদের মতে, এসব ঘটনার বৈশ্বিক প্রভাব হবে অত্যন্ত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। ফলে ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এসবের কারণে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। গবেষক ফ্লোরিয়ান উলরিখ জেন বলেন, ‘বড় কোনো বিপদে শেষ পর্যন্ত খাদ্যব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচতে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো অস্ট্রেলিয়াঝুঁকির ভারসাম্য ও সুরক্ষা
গবেষকেরা এমন কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন, যা কোনো দেশকে বিপদের মুখে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এগুলো বিপর্যয় কেটে না যাওয়া পর্যন্ত নাগরিকদের খাবারের জোগান দিতেও ভূমিকা রাখে। গবেষকদের মতে, পৃথিবীর কোনো জায়গাই সব ধরনের বিপদের হাত থেকে এক শ ভাগ সুরক্ষিত নয়। তবে কিছু দেশ অন্যদের চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ধনী দেশের নিজেদের কারখানা ও উৎপাদন ব্যবস্থা শক্তিশালী, তারা যেকোনো সংকট ভালোভাবে সামলাতে পারে। তবে সেই দেশগুলোকে বিদেশের বাণিজ্যের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হওয়া চলবে না। নিজস্ব কারখানা থাকলে বিপদের সময় বিদেশ থেকে কিছু আমদানি করতে না পারলেও প্রয়োজনীয় জিনিস নিজেরাই তৈরি করা যায়। এতে কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকা সহজ হয়।
সূর্য হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলে পৃথিবীতে জীবন কত দিন টিকবেএ ক্ষেত্রে দেশের ভৌগোলিক অবস্থানও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বড় বড় মহাদেশের চেয়ে দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর একটি সুবিধা রয়েছে। তারা বিপদের সময় অন্য দেশ থেকে নিজেদের আলাদা করে সুরক্ষিত রাখতে পারে। তবে সেই দ্বীপরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে নিজেদের ওপর নির্ভরশীল বা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। জাপানের মতো দ্বীপরাষ্ট্র যদি কেবল বিদেশের বাণিজ্যের ওপর ভরসা করে চলে, তবে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য বন্ধ হলে তাদের মারাত্মক বিপদে পড়তে হবে।
আবার কোনো দেশ ধনী হলেও কিছু কিছু বিপদের মুখে একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, ভারত বা পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক অস্ত্র থাকা দেশগুলোর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে পৃথিবীর উত্তর অর্ধাংশের দেশগুলো পারমাণবিক আক্রমণের দিক থেকে অনেক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে পৃথিবীর দক্ষিণ অংশে আগ্নেয়গিরির সংখ্যা বেশ কম। তা ছাড়া এই দক্ষিণ গোলার্ধে বিশাল সব মহাসাগর রয়েছে, যা আবহাওয়া ও জলবায়ুকে হঠাৎ খুব বেশি মারাত্মক হতে দেয় না। তাই বড় কোনো আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটলেও দক্ষিণ অঞ্চলের দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ থাকবে।
দক্ষিণ চীন সাগরে মিলল উল্টা সাঁতার কাটা অদ্ভুত মাছবিপর্যয় সামলানোর ক্ষমতা
গবেষক ফ্লোরিয়ান উলরিখ জেন জানান, দেশের সঠিক শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক সমতা যেকোনো দুর্যোগ সামলাতে বড় ভূমিকা রাখে। বড় বিপর্যয়ের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব জরুরি। আর দেশে ভালো শাসনব্যবস্থা থাকলে তা সম্ভব হয়। বৈষম্য বেশি থাকলে ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে, যা সরকারের কাজকে দুর্বল করে দেয়।
মহাবিপর্যয়ের সময়ে টিকে থাকার জন্য অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বের সেরা জায়গা হিসেবে পাওয়া গেছে। দেশটি পৃথিবীর দক্ষিণ অংশে থাকায় পারমাণবিক যুদ্ধের মূল অঞ্চলগুলো থেকে অনেক দূরে। তা ছাড়া এখানে প্রচুর খাবার তৈরি হয়, নানা ধরনের আবহাওয়া রয়েছে ও জ্বালানিব্যবস্থা খুব শক্তিশালী।
মহাবিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা কম হলেও যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার তালিকায় এসব বিপদের বিষয় যুক্ত থাকা প্রয়োজননিরাপদ জায়গার তালিকায় এরপরই রয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ড কিছুটা পিছিয়ে আছে; কারণ, সেখানে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। আর কারখানা কম ও সুনামির ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় বৈষম্য বেশি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা লেগেই থাকে।
তালিকায় বরফের দেশ আইসল্যান্ডও ছিল। তবে বরফে ঢাকা উত্তর অঞ্চলে থাকায় কোনো কারণে সূর্যের আলো আটকে গেলে সেখানকার তাপমাত্রা মারাত্মক কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে আমেরিকা এ তালিকায় বেশ পিছিয়ে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি পারমাণবিক যুদ্ধ ও সৌরঝড়ের খুব কাছাকাছি।
কীভাবে বিপদে আরও শক্তিশালী হওয়া যায়
মহাবিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা কম হলেও যেকোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তার তালিকায় এসব বিপদের বিষয় যুক্ত থাকা প্রয়োজন। কারণ, বিপদ চলে এলে নতুন করে সামাল দেওয়ার কোনো সুযোগ পাওয়া যায় না। তাই বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট এড়াতে কেনাবেচা ও লেনদেনের আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা জরুরি। একই সঙ্গে কঠিন পরিস্থিতিতে খাবারের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ ও কারখানার মতো জরুরি অবকাঠামো রক্ষা করতে হবে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহায়তা ও শক্ত শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখন থেকেই বাস্তবসম্মত প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করা উচিত।
সূত্র: লাইভ সায়েন্সহেভি মেটাল–ভক্তদের সহ্যশক্তি কি অন্যদের চেয়ে বেশি? কী বলছে নতুন গবেষণা