ঢেঁকির সেই ধুপধাপ শব্দ কোথায় হারিয়ে গেল

· Prothom Alo

‘ধান ভানি রে, ঢেঁকিতে পার দিয়া...’
ছোটবেলায় শোনা সেই গানটার কথা মনে পড়লে আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রামবাংলার পুরোনো রূপ। ভোরের আজান কিংবা পাখির কলকাকলির সঙ্গেই একসময় পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয়ে যেত ঢেঁকির ধুপধাপ আওয়াজ। সেই শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বধূ ও কিষানিদের কাজ করার ধুম পড়ত। অগ্রহায়ণ বা পৌষের সকালে এই শব্দটাই ছিল গাঁও-গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙার আসল ঘণ্টা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত সুর আজ একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছে।

Visit betsport.cv for more information.

একসময় প্রায় প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতেই একটা করে কাঠের ঢেঁকি থাকত। বরই, কড়ই কিংবা বাবলা কাঠ কেটে মিস্ত্রি দিয়ে বেশ শখ করে ঢেঁকি বানানো হতো। নবান্ন, ঈদ, পূজা কিংবা ঘরে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান এলে তো কথাই নেই! চালের গুঁড়ি বানানো, চিড়া কোটা আর নতুন চালের পিঠা-পুলি, ফিরনি-পায়েস তৈরির উৎসব শুরু হয়ে যেত চারদিকে। রাত থাকতে উঠে বধূরা দলবেঁধে ঢেঁকিতে পাড় দিতে বসতেন, সঙ্গে চলত হাসি-ঠাট্টা আর গান। ঢেঁকি শুধু পিঠা-পুলি খাওয়ার অনুষঙ্গই ছিল না, গ্রামের বহু অভাবী, বিধবা ও প্রান্তিক নারীর বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বলও ছিল। মানুষের বাড়িতে গিয়ে ঢেঁকিতে ধান বা আটা ভেনে দিয়ে যেটুকু চাল বা টাকা তাঁরা পেতেন, তা দিয়েই কোনোমতে চলত সংসার।

প্রযুক্তির হাওয়া যখন গ্রামে এসে পৌঁছাল, ছবিটা রাতারাতি বদলে গেল। বাজারে ইঞ্জিনচালিত ধান ভাঙার মেশিন ও চালকল চলে আসার পর মানুষ দেখল কষ্ট করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাড় দেওয়ার চেয়ে মেশিনে ধান ভাঙানো অনেক সহজ আর কম সময়ের কাজ। ফলে মানুষ দ্রুত যন্ত্রের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে এবং এক এক করে বিলীন হতে থাকে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।

এখন গ্রামের পর গ্রাম হেঁটেও একটা আস্ত ঢেঁকির দেখা মেলা কঠিন। দু-একজন মানুষ হয়তো এখনো প্রতিবেশীদের সুবিধার কথা ভেবে বাড়িতে ঢেঁকি ধরে রেখেছেন; কিন্তু সেখানেও আগের মতো আর মানুষের ভিড় জমে না। অধিকাংশ জায়গায় পুরোনো ঢেঁকিগুলো গোয়ালঘর বা ভাঙা ঘরের কোণে মিছামিছি ধুলো খাচ্ছে।

যমুনা নদীর জন্ম কীভাবে, নামটাই-বা কে দিল

অথচ একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য খেয়াল করা যায়—যে ঢেঁকি গ্রাম থেকে উধাও হয়ে গেল, সেই ঢেঁকিছাঁটা চাল কিন্তু এখন শহুরে সুপারশপগুলোতে চড়া দামে প্যাকেটজাত হয়ে বিক্রি হচ্ছে! পুষ্টির কথা ভেবে ডায়াবেটিসের রোগী আর স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ বেশি দাম দিয়ে তা কিনছেন। অথচ এর সুফল গ্রামের প্রান্তিক মানুষগুলো পাচ্ছে না; তারা পেশা হারিয়ে আজ দিনমজুরির মতো অন্য কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছে।

প্রযুক্তি আমাদের সময় ও পরিশ্রম বাঁচিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবহমান বাংলার শিকড় আর লোকজ সংস্কৃতির আনন্দ। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আমাদের এসব প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করা হলে, আগামী দিনের নতুন প্রজন্ম হয়তো আর কখনোই জানতে পারবে না গ্রামবাংলার মেঠোপথে ঢেঁকির সুর কতটা মধুর ছিল।

বন্ধু, রায়গঞ্জ বন্ধুসভা

Read full story at source