মাইদুল বদলেছেন, বদলেছে কৃষিও
· Prothom Alo
সব খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি কেঁচো সার উৎপাদনে গড়ে খরচ পড়ে ৬ টাকা। মাইদুল সার বিক্রি করেন ১৩ টাকা কেজি দরে। সার তৈরি হতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৩৫ দিন।
Visit esporist.org for more information.
শেরমস্ত গ্রামে মাইদুল ইসলামের (৩৮) বাড়ি খুঁজতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। তাঁর নাম বললে অনেকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কোন মাইদুল? কেঁচো মাইদুল?’ রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার এই কৃষককে ‘কেঁচো মাইদুল’ নামেই চেনেন আশপাশের মানুষ। এই নামের পেছনে আছে বদলে যাওয়া এক কৃষিজীবনের গল্প।
একসময় রাসায়নিক সারনির্ভর চাষাবাদ করতেন মাইদুল। ২০২৩ সালে নিজের তিন একর আমন ধানের খেতে সমস্যা দেখা দিলে তাঁর ভাবনা বদলে যায়। ধানগাছ লালচে হয়ে যাওয়ায় খেতে গিয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম তাঁকে জানান, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা শক্তিও কমে যেতে পারে।
সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে মাইদুল জানতে পারেন কেঁচো সার বা কেঁচো কম্পোস্টের কথা। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়ির উঠানে কেঁচো সার তৈরি শুরু করেন। নিজের জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়ার পর বাড়তে থাকে তাঁর আগ্রহ। এখন সেটিই হয়ে উঠেছে তাঁর আয়ের অন্যতম উৎস।
শুধু মাইদুলের জীবনই বদলায়নি; তাঁর কাছ থেকে কেঁচো সার তৈরির কৌশল শিখে শেরমস্ত ও আশপাশের গ্রামের অনেক কৃষক এই পথে হাঁটছেন। কেউ নিজের জমির জন্য সার তৈরি করছেন, কেউ আবার সার ও কেঁচো বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।
বাড়ির উঠানে টিনের চালার নিচে সিমেন্টের রিংয়ে তৈরি হয় কেঁচো সার। গত শুক্রবার তাারাগঞ্জের শেরমস্ত গ্রামেকেঁচো সার বানানো শুরু
মাইদুলের বাবা জয়নাল আবেদীন ছিলেন এলাকার বড় কৃষক। তাঁর প্রায় সাত একর জমি ছিল। কৃষিকাজই ছিল পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। বাবাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় মাইদুলের। তবে কৃষিকাজ করতে গিয়ে ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুন করে ভাবায়। মাইদুলের আগ্রহ দেখে কৃষি বিভাগ ‘অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্প’-এর আওতায় তাঁকে কেঁচো সার তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়।
প্রশিক্ষণ শেষে বাড়ির উঠানে টিনের চালা তুলে ২০টি সিমেন্টের রিং বসান মাইদুল। তাঁর নিজের একটি গরুর খামার আছে। সেখান থেকে সংগ্রহ করা গোবর রিংগুলোয় দেন। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া কেঁচো ছেড়ে দেন সেখানে। প্রায় এক মাস পর ২০টি রিং থেকে পাওয়া যায় প্রায় এক হাজার কেজি কেঁচো সার। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে কেঁচোর সংখ্যাও। নিজের জমিতে সেই সার ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়ার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ধীরে ধীরে বাড়াতে থাকেন উৎপাদন।
কৃষক মজিবুর রহমান‘কেঁচো হামার ভাগ্য খুলি দিছে। এ গ্রামকে হামরা রাসায়নিক সারমুক্ত করমু।’মাসে তৈরি হয় ৭–৮ টন সার
মাইদুলের বাড়ির উঠানে গেলে চোখে পড়ে সার তৈরির ব্যস্ততা। টিনের চালার নিচে সারি সারি সিমেন্টের রিং। কোথাও গোবর, কোথাও কেঁচো, আবার কোথাও তৈরি হয়ে আছে ব্যবহারের উপযোগী কেঁচো সার।
মাইদুল জানান, বর্তমানে মাসে সাত থেকে আট টন কেঁচো সার উৎপাদন করেন তিনি। শেরমস্ত ও আশপাশের গ্রামের কৃষকেরা তো বটেই, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও মানুষ তাঁর কাছ থেকে সার কিনে নিয়ে যান। এই সার তৈরির মূল উপাদান গোবর। গোবর কেনা, শ্রমিকের খরচসহ প্রতি কেজি কেঁচো সার উৎপাদনে তাঁর খরচ পড়ে গড়ে ৬ টাকা। মাইদুল সার বিক্রি করেন ১৩ টাকা কেজি দরে। সার তৈরি হতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৩৫ দিন।
আরও টুকটাক কিছু খরচ বাদ দিয়ে কেঁচো সার বিক্রি করে মাসে মাইদুলের ৪০ হাজার টাকার মতো আয় হয়। তিনি বলেন, শেরমস্তসহ আশপাশের গ্রামের অনেক মানুষ তাঁর কাছ থেকে কেঁচো সার তৈরির কৌশল শিখেছেন। তাঁরা নিজেদের জমিতে সার ব্যবহার করছেন। অনেকে আবার সার ও কেঁচো বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।
কেঁচোতেই খুলেছে ভাগ্যের দুয়ার
ফাজিলপুর গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমানের (৪২) গল্প একটু অন্য রকম। একসময় রাসায়নিক সার কিনতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে মাইদুলের কাছ থেকে কেঁচো নিয়ে দুটি সিমেন্টের রিংয়ে কেঁচো সার তৈরি শুরু করেন। এখন তাঁর রিংয়ের সংখ্যা পাঁচ।
মজিবুর নিজের উৎপাদিত কেঁচো সার তাঁর দুই বিঘা জমিতে ব্যবহার করেন। রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে নিজের তৈরি জৈব সার ব্যবহার করায় সার কেনার প্রায় ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান তিনি। মজিবুরের ভাষায়, ‘কেঁচো হামার ভাগ্য খুলি দিছে। এ গ্রামকে হামরা রাসায়নিক সারমুক্ত করমু।’
পাতিলভাঙ্গা গ্রামের রশিদা বেগমের (৩৬) সংসারেও স্বস্তি এনেছে কেঁচো সার। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। তিন বিঘা জমির ফসলের ওপর নির্ভর করেই চলত সংসার। প্রায় দেড় বছর আগে মাইদুলের কাছ থেকে কেঁচো নিয়ে বাড়িতে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরি শুরু করেন তিনি। এখন নিজেদের জমিতে সেই সার ব্যবহার করেন। পাশাপাশি কেঁচো ও কেঁচো সার বিক্রি করে বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
জমে থাকা কেঁচো সার হাত দিয়ে নেড়ে আলগা করে দিচ্ছেন মাইদুল। গত শুক্রবার দুপুরে তারাগঞ্জের শেরমস্ত গ্রামেমাটির যত্নে কেঁচো
দর্জিপাড়া গ্রামের কৃষক একরামুল হক (৩৯) এক একর জমিতে সবজি চাষে আগে যে পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করতেন, কেঁচো সার ব্যবহারের পর তা কমেছে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, জৈব সার ব্যবহারে জমির উর্বরতা বাড়ছে এবং ফসলে পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হচ্ছে।
তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় জানান, কেঁচো সার মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে এবং মাটির গঠন উন্নত হয়। এ সার ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান ভালো হতে পারে। তিনি বলেন, কৃষকদের কেঁচো সার তৈরিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। মাইদুল ইসলামের মতো অনেকেই এ সার তৈরি ও বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।