আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব

· Prothom Alo

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব ২

দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুতে আমরা বলেছিলাম, কোনো কিছুর পরম গতি মাপার দুটি উপায় থাকতে পারে। এক, আলোর রশ্মির সাপেক্ষে গতি মাপা; দুই, কোনো বস্তুর গতি যখন বাড়ে বা কমে, তখন এর ফলে তৈরি হওয়া জড়তার প্রভাব কাজে লাগানো। মাইকেলসন-মোর্লির পরীক্ষা থেকে আমরা দেখেছি, প্রথম উপায়টা একেবারেই কাজে লাগে না। কেন কাজে লাগে না, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব, সেটা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছে। এই অধ্যায়ে আমরা দ্বিতীয় উপায়টা নিয়ে কথা বলব। অর্থাৎ পরম গতির খোঁজ পেতে জড়তার প্রভাবকে সূত্র হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা দেখব।

Visit betsport.cv for more information.

যখন প্রচণ্ড বেগে কোনো রকেট মহাকাশের দিকে ছুটে যায়, তখন রকেটের ভেতরের নভোচারী তাঁর সিটের পেছনের দিকে ভীষণ জোরে চেপে বসেন। এটা রকেটের গতি বাড়ার কারণে তৈরি হওয়া জড়তার খুব পরিচিত একটা প্রভাব। আচ্ছা, এই ব্যাপার কি প্রমাণ করে না যে রকেটটাই আসলে ছুটছে? আমরা যদি দাবি করতে চাই যে সব রকম গতিই আপেক্ষিক, তবে রকেটটাকেও একটা স্থির প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। আর যদি তা-ই হয়, তবে ধরে নিতে হবে যে রকেটটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে, এবং পৃথিবীসহ পুরো মহাবিশ্বটাই রকেট থেকে পেছনের দিকে ছুটে যাচ্ছে! কিন্তু তুমি যদি পুরো ব্যাপারটাকে এভাবে দেখো, তাহলে ওই নভোচারীর ওপর যে জড়তার চাপটা তৈরি হলো, তার ব্যাখ্যা কীভাবে দেবে? নভোচারী যে প্রচণ্ড শক্তিতে সিটের সঙ্গে সেঁটে আছেন, তা দেখে তো বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না যে রকেটটাই ছুটছে, মহাবিশ্ব নয়!

ঘোরানো বা পাক খাওয়া পৃথিবীর কথাই ধরো। পৃথিবীর নিজের অক্ষে ঘোরার কারণে কেন্দ্রাতিগ বল নামে একটা জড়তার প্রভাব তৈরি হয়। এই বলের কারণে পৃথিবীর মাঝখানটা, অর্থাৎ বিষুবরেখার দিকটা একটুখানি ফুলে আছে। এখন সব গতিই যদি আপেক্ষিক হয়, তবে পৃথিবীকে একটা স্থির কাঠামো হিসেবে ধরে নিয়ে এমনটা কি ভাবা যায় না যে পৃথিবী স্থির আর পুরো মহাবিশ্ব এর চারদিকে ঘুরছে? হ্যাঁ, কল্পনায় এমনটা ভাবাই যায়। কিন্তু তাহলে পৃথিবীর মাঝখানটা ফুলে উঠল কী করে? এই ফুলে থাকাটা তো পরিষ্কার প্রমাণ করে যে পৃথিবীটাই ঘুরছে, মহাবিশ্ব নয়!

অবশ্য একটা কথা বলে রাখি, এই ফুলে থাকার পেছনে এখনো কেন্দ্রাতিগ বল কাজ করছে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে একটু মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন, অনেককাল আগে পৃথিবী যখন নরম কাদার মতো ছিল, তখন ঘোরার কারণে এই অংশটা ফুলে গিয়েছিল এবং এখন পৃথিবী শক্ত হয়ে যাওয়ায় সেটা চিরস্থায়ী রূপ পেয়েছে। পৃথিবী যদি ঘোরা বন্ধও করে দেয়, তবু এই ফোলা অংশটা থেকে যাবে। তবে সবাই একটা বিষয়ে একমত, এই ফুলে থাকার মূল কারণ সেই কেন্দ্রাতিগ বল!

ঠিক এই চিন্তাগুলোই বিজ্ঞানী নিউটনকে বুঝিয়েছিল, গতি মোটেও আপেক্ষিক নয়। প্রমাণ হিসেবে তিনি একটা বালতির উদাহরণ দিয়েছিলেন। ধরো, একটা বালতিতে পানি নিয়ে তুমি যদি বালতিটাকে জোরে ঘোরাতে থাকো, তবে কেন্দ্রাতিগ বলের কারণে পানির ওপরের ভাগটা গর্তের মতো হয়ে যাবে। এমনকি পানি বালতি উপচে পড়েও যেতে পারে! এখন তুমি কি কল্পনা করতে পারো যে মহাবিশ্ব ঘুরছে বলে বালতির পানিতে এমন প্রভাব পড়ছে? এটা একেবারেই অসম্ভব! তাই নিউটন যুক্তি দেখিয়েছিলেন, বালতির এই ঘূর্ণন বা গতিটা আসলে পরম বা চূড়ান্ত গতি।

বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশ করার পর দীর্ঘ ১০ বছর ধরে আইনস্টাইন এই সমস্যাটা নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন। মজার ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ পদার্থবিজ্ঞানী এটাকে কোনো সমস্যা বলেই মনে করতেন না! তাঁরা বলতেন, ‘যেটা সত্যি, সেটা মেনে নিতে দোষ কোথায়? সুষম গতি হলো আপেক্ষিক, কিন্তু অসম গতি পরম।’ কিন্তু আইনস্টাইন এই ব্যাখ্যায় মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর মনের ভেতর একটা শক্ত ধারণা ছিল যে সুষম গতি যদি আপেক্ষিক হয়, তবে অসম গতিও অবশ্যই আপেক্ষিক হবে। শেষে বিশেষ তত্ত্ব প্রকাশের ঠিক ১১ বছর পর, ১৯১৬ সালে তিনি তাঁর আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব প্রকাশ করলেন। একে সাধারণ বা জেনারেল বলা হয়; কারণ, এটি আসলে আগের বিশেষ তত্ত্বটিরই একটা বড় বা সম্প্রসারিত রূপ। একে আমরা আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব বলতে পারি। বিশেষ তত্ত্বটা এই সার্বিক তত্ত্বেরই একটা ছোট্ট অংশ মাত্র।

মেধা ও বুদ্ধির দিক থেকে সার্বিক তত্ত্বটি বিশেষ তত্ত্বের চেয়েও অনেক বড় একটা অর্জন। আইনস্টাইন যদি বিশেষ তত্ত্বটি প্রথম আবিষ্কার না–ও করতেন, তবে অন্য কোনো বিজ্ঞানী যে খুব শিগগির সেটা করে ফেলতেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই যে ফরাসি গণিতবিদ পঁয়কারের কথা আগে বলেছিলাম, তিনি ছিলেন এমন কয়েকজনের মধ্যে একজন যাঁরা এই আবিষ্কারের প্রায় দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন! ১৯০৪ সালে এক বক্তৃতায় পঁয়কারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, পদার্থবিজ্ঞানে সম্পূর্ণ নতুন এক বলবিদ্যা আসতে চলেছে, যেখানে কোনো গতিই আলোর গতির চেয়ে বেশি হতে পারবে না; ঠিক যেমন কোনো বস্তুর তাপমাত্রা পরম শূন্য তাপমাত্রার নিচে নামতে পারে না। তিনি বলেছিলেন, এই নতুন নিয়ম আপেক্ষিকতার নীতি মেনে চলবে; যেখানে একজন স্থির পর্যবেক্ষক ও সুষম গতিতে চলা আরেকজন পর্যবেক্ষকের জন্য প্রকৃতির নিয়মগুলো একদম একই থাকবে। ফলে, আমরা কোনো সুষম গতিতে চলছি কি না, তা বোঝার কোনো উপায়ই আমাদের থাকবে না।’

আপেক্ষিকতার মজার জগৎ—পর্ব ৪

পঁয়কারে হয়তো এই তত্ত্ব দাঁড় করানোর জন্য ঠিক কী কী গাণিতিক ধাপ পার হতে হবে তা বুঝতে পারেননি, কিন্তু বিশেষ তত্ত্বের মূল কথাটা তিনি ঠিকই মন দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। আইনস্টাইন সেই সময় জানতেও পারেননি যে পঁয়কারে, লরেন্টজ এবং আরও কয়েকজনের চিন্তাভাবনা তাঁর চিন্তার কতটা কাছাকাছি চলে এসেছিল! অবশ্য অনেক বছর পর আইনস্টাইন এই বিজ্ঞানীদের কাজের প্রতি সম্মান জানিয়েছিলেন।

কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ব্যাপারটা ছিল একদম আলাদা। বিজ্ঞানী টেলারের সেই কথা ধার করে আবার বলতে হয়, এটা ছিল ভীষণভাবে চমকপ্রদ সুন্দর। এটা এত বেশি মৌলিক ও গতানুগতিক ধারার বাইরে ছিল যে, এটি বিজ্ঞানীদের জগতে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল! অনেকটা ১৯৬২ সালে আমেরিকায় যেমন টুইস্ট নামে নতুন এক নাচের পাগলামি শুরু হয়েছিল, ঠিক সে রকম। আইনস্টাইন যেন সময় ও স্থানের সেই পুরোনো নাচের ছন্দে একদম নতুন একটা টুইস্ট এনে দিয়েছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৃথিবীর সব পদার্থবিজ্ঞানী হয় এই নতুন টুইস্টের তালে নাচতে শুরু করলেন, না হয় এতে বিরক্ত হয়ে ভড়কে গেলেন। কেউ কেউ তো অভিযোগ করলেন, ‘এই নতুন জিনিস শেখার বয়স কি আর আমার আছে!’ আইনস্টাইন যদি পৃথিবীতে না-ও আসতেন, অন্য কোনো বিজ্ঞানী হয়তো পদার্থবিজ্ঞানে ঠিকই এই টুইস্টটা আনতেন, কিন্তু তার জন্য হয়তো আরও এক শতাব্দী বা এক শ বছর পার হয়ে যেত! বিজ্ঞানের ইতিহাসে খুব কম তত্ত্বই আছে, যাকে এত নিখুঁতভাবে শুধু একজন মানুষের একক কাজ বলে দাবি করা যায়।

‘নিউটন, আমাকে ক্ষমা করবেন,’ জীবনের শেষ ভাগে এসে আইনস্টাইন লিখেছিলেন। ‘আপনার ওই সময়ে দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ চিন্তাশক্তি ও সৃষ্টিশীল মনের কোনো মানুষের পক্ষে যতটুকু চিন্তা করা সম্ভব ছিল, আপনি ঠিক ততটুকুই পথ খুঁজে নিয়েছিলেন।’ আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানীর কাছ থেকে তার আগের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানীর প্রতি এমন সম্মান জানানোটা সত্যিই খুব হৃদয়স্পর্শী।

আইনস্টাইনের এই সার্বিক তত্ত্বের একেবারে কেন্দ্রে যে বিষয়টি আছে, তিনি তার নাম দিয়েছিলেন প্রিন্সিপাল অব ইকুইভ্যালেন্স। একে আমরা বাংলায় বলতে পারি সমতা নীতি। এটা এতই চমকে দেওয়ার মতো দাবি ছিল যে বিজ্ঞানী নিউটন শুনলে হয়তো তাকে পাগলই ভেবে বসতেন! দাবিটা কী জানো? মহাকর্ষ এবং জড়তা আসলে হুবহু একই জিনিস! এর মানে কিন্তু এই নয় যে তাদের কাজ বা প্রভাব একই রকম। এর আসল মানে হলো, মহাকর্ষ ও জড়তা একদম একই জিনিসের দুটি ভিন্ন নাম!

মহাকর্ষ ও জড়তার প্রভাবের মধ্যে এই অদ্ভুত মিল দেখে যে শুধু আইনস্টাইনই প্রথম অবাক হয়েছিলেন, তা কিন্তু নয়। একটু ভেবে দেখো, একটা ভারী কামানের গোলা এবং একটা ছোট কাঠের বল যদি একই উচ্চতা থেকে নিচে ফেলা হয়, তবে কী ঘটবে? ধরো, কামানের গোলাটির ওজন কাঠের বলের চেয়ে এক শ গুণ বেশি। তার মানে, পৃথিবী কাঠের বলটাকে যে জোরে টানছে, কামানের গোলাটাকে তার চেয়ে ঠিক এক শ গুণ বেশি জোরে নিচের দিকে টানছে। বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর শত্রুরা কেন বিশ্বাস করতে চায়নি যে এত আলাদা ওজনের দুটো বল একই সঙ্গে মাটিতে পড়বে, তা বুঝতে নিশ্চয়ই এখন আর তোমার কষ্ট হচ্ছে না।

অবশ্য আমরা এখন খুব ভালো করেই জানি, বাতাসের বাধা যদি না থাকে, তবে ভারী ও হালকা দুটি বল একদম পাশাপাশি একই সঙ্গে নিচে পড়বে। এই ঘটনাটা ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানী নিউটনকে খুব অদ্ভুত একটা বিষয় ধরে নিতে হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ঠিক যে মুহূর্তে মহাকর্ষ বল কামানের গোলাটাকে নিচের দিকে টানছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই গোলার নিজস্ব জড়তা, অর্থাৎ বলের বিরুদ্ধে তার বাধা দেওয়ার ক্ষমতা গোলাটাকে পেছনের দিকে টেনে ধরে রাখছে। এটা সত্যি যে কামানের গোলার ওপর মহাকর্ষের টান কাঠের বলের চেয়ে এক শ গুণ বেশি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কামানের গোলাকে পেছনে টেনে ধরে রাখা তার নিজস্ব জড়তার পরিমাণও কাঠের বলের চেয়ে ঠিক এক শ গুণ বেশি!

পদার্থবিজ্ঞানীরা বিষয়টা এভাবে বুঝিয়ে বলেন—কোনো বস্তুর ওপর কাজ করা মহাকর্ষ বল সব সময় তার জড়তার সমানুপাতিক। ধরো, ‘ক’ নামের একটা বস্তু ‘খ’-এর চেয়ে দ্বিগুণ ভারী। তাহলে ‘ক’-এর জড়তাও হবে দ্বিগুণ। তাই ‘ক’-কে ‘খ’-এর সমান বেগে ছোটানোর জন্য দ্বিগুণ ধাক্কা বা বল দিতে হবে। যদি তা না হতো, তাহলে ভিন্ন ভিন্ন ওজনের বস্তু ওপর থেকে পড়লে তাদের গতি বাড়ার হারও আলাদা হতো।

এমন একটা পৃথিবীর কথা কল্পনা করা খুব সহজ, যেখানে এই দুটি বল একে অপরের সমানুপাতিক নয়। আমি আসলে মহাকর্ষ ও জড়তার কথা বলছি। অ্যারিস্টটলের আমল থেকে গ্যালিলিওর সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ঠিক এমন একটা পৃথিবীর কথাই ভেবেছিলেন! এমন পৃথিবীতেও আমাদের দিব্যি চলে যেত। তবে আমাদের কপাল ভালো যে আমরা এমন একটা পৃথিবীতে থাকি যেখানে এই দুটি বল একদম সমানুপাতিক। গ্যালিলিও প্রথম এটা প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। এরপর ১৯০০ সালের দিকে হাঙ্গেরির এক বিজ্ঞানী ব্যারন রোল্যান্ড ফন ইয়টভস দারুণ নিখুঁত এক পরীক্ষা করে গ্যালিলিওর কথা প্রমাণ করেন। আর ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে রবার্ট এইচ ডিক এবং তাঁর সঙ্গীরা সবচেয়ে নিখুঁত পরীক্ষাটি করেছিলেন। তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, মহাকর্ষীয় ভর বা ওজন সব সময়ই জড়তা ভরের একদম সমানুপাতিক।

মহাকর্ষ ও জড়তার মাঝখানের এই অদ্ভুত দড়ি টানাটানির কথা নিউটন অবশ্যই জানতেন। এই দড়ি টানাটানির কারণেই ওপর থেকে ফেলা সব জিনিস একই সঙ্গে মাটিতে পড়ে। কিন্তু নিউটন কিছুতেই এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেননি। তাঁর কাছে এটা ছিল শুধু একটা কাকতালীয় ব্যাপার! এই কাকতালীয় ব্যাপারটার কারণেই জড়তাকে কাজে লাগিয়ে মহাকর্ষ তৈরি করা যায়, আবার চাইলে তা মুছেও ফেলা যায়।

প্রথম অধ্যায়েই তো আমরা দেখেছি, লাটিমের মতো দেখতে একটা মহাকাশযানকে চাকার মতো ঘোরালে তার ভেতর একটা কৃত্রিম অভিকর্ষ তৈরি হয়। কেন্দ্রাতিগ বলের কারণে যানের ভেতরের সবকিছু বাইরের দেয়ালের দিকে ছিটকে যেতে চায়। একটি নির্দিষ্ট বেগে যানটিকে ঘোরালে এর ভেতর এমন একটা জড়তা বল তৈরি হয়, যার প্রভাব একদম পৃথিবীর মহাকর্ষের মতোই! নভোচারীরা তখন যানের বাইরের দিকের দেয়ালটাকেই মেঝে ভেবে দিব্যি হেঁটে বেড়াতে পারবেন। কোনো জিনিস হাত থেকে পড়লে সেটা ওই মেঝের দিকেই পড়বে, কিন্তু ধোঁয়া উঠবে ছাদের দিকে! সেখানে সাধারণ মহাকর্ষের সব প্রভাবই থাকবে।

আইনস্টাইন ঠিক এই ব্যাপারটা বোঝাতেই তাঁর সেই বিখ্যাত থট এক্সপেরিমেন্ট পরীক্ষার কথা বলেছিলেন।

ধরো, মহাকাশের ভেতর দিয়ে একটা লিফটকে সমানে ওপরের দিকে টেনে তোলা হচ্ছে এবং এর গতিও ক্রমাগত বাড়ছে। লিফটের এই গতি বাড়ার হার বা ত্বরণ যদি ঠিক পৃথিবীতে ওপর থেকে পড়া কোনো বস্তুর ত্বরণের সমান হয়, তবে লিফটের ভেতরের মানুষগুলোর কাছে মনে হবে তারা একদম পৃথিবীর মতোই কোনো মহাকর্ষ বলের ভেতর আছে!

এই ত্বরণ বা গতি বৃদ্ধি যেমন নকল মহাকর্ষ তৈরি করতে পারে, তেমনি এটি মহাকর্ষকে পুরোপুরি বাতিলও করে দিতে পারে। যেমন ধরো, একটা লিফট যদি তার ছিঁড়ে সোজা নিচের দিকে পড়তে থাকে, তবে ওই পড়ন্ত লিফটের ভেতরে মহাকর্ষের কোনো প্রভাবই থাকবে না! একটা মহাকাশযান যতক্ষণ অবাধে পড়তে থাকে—অর্থাৎ মহাকর্ষ ছাড়া আর কোনো বল সেখানে কাজ করে না—ততক্ষণ তার ভেতরে শূন্য অভিকর্ষ বিরাজ করে। পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার সময় রুশ বা মার্কিন নভোচারীরা যে ওজনহীনতা অনুভব করেন, তার কারণ তাঁদের যানটি পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে অবাধে পড়তে থাকে। যতক্ষণ যানের রকেট ইঞ্জিন বন্ধ থাকে, ততক্ষণ ভেতরে একদম শূন্য মহাকর্ষ থাকে।

জড়তা ও মহাকর্ষের এই অদ্ভুত মিলের রহস্যটা অজানাই থেকে গিয়েছিল, যতক্ষণ না আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব প্রকাশ করেন। বিশেষ তত্ত্বের মতোই এখানেও তিনি সবচেয়ে সহজ কিন্তু সবচেয়ে সাহসী একটা ধারণার কথা বলেছিলেন। মনে আছে, বিশেষ তত্ত্বে আইনস্টাইন কী বলেছিলেন? ইথার বায়ুর প্রভাব না থাকার কারণ হলো, ইথার বায়ু বলতে আসলে কিচ্ছু নেই! আর এই সার্বিক তত্ত্বে তিনি বললেন, মহাকর্ষ ও জড়তাকে একই রকম মনে হওয়ার কারণ, তারা আসলে একদম একই জিনিস!

অবশ্য অবাধে পড়তে থাকা লিফটের ভেতরে শূন্য গ্র্যাভিটি তৈরি হচ্ছে, কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো পর্যবেক্ষকের কাছে মনে হবে, পৃথিবীর মহাকর্ষ বল ঠিকই আছে এবং সেটাই লিফট ও এর ভেতরের মানুষটাকে নিচের দিকে টানছে। কিন্তু লিফটের ভেতরে থাকা মানুষটি যদি লিফটটাকেই তার প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে ধরে নেয়, তবে তার কাছে মনে হবে, পৃথিবীসহ পুরো মহাবিশ্বটাই তার দিকে ছুটে আসছে! ফলে এমন একটা নতুন মহাকর্ষ ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা পৃথিবীর মহাকর্ষকে পুরোপুরি বাতিল করে দেয়। হিসাবের সমীকরণগুলো এত নিখুঁত যে লিফটের ভেতরের পর্যবেক্ষকের কাছে পৃথিবীর মহাকর্ষ সত্যিই উধাও হয়ে যায়। সেটা তখন একদম সত্যিকারের জিরো গ্রাভিটি।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব ১

একইভাবে, একটা ঘূর্ণমান মহাকাশযান বা ওপরের দিকে ছুটে চলা লিফটের ভেতরে মহাকর্ষ নকল করা হয়, এ কথাও ঠিক নয়। এটা মোটেই নকল নয়। সেখানে সত্যিকারের মহাকর্ষই তৈরি হয়! হ্যাঁ, পৃথিবীর মতো কোনো বিশাল গ্রহের চারপাশের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের যে জ্যামিতিক আকার, এই নতুন তৈরি হওয়া মহাকর্ষের আকার ঠিক তেমন নয়। কিন্তু তারপরও এটা একটা সত্যিকারের মহাকর্ষ বল। বিশেষ তত্ত্বের মতোই, চমকে দেওয়া এই কথাগুলো গাণিতিকভাবে মেলাতে গিয়ে হিসাব কিছুটা জটিল হয়ে গিয়েছিল। তবে চূড়ান্ত ফলাফল সেই জটিলতাকে সার্থক করেছে। এখন আর মহাকর্ষ ও জড়তা নামে আলাদা দুটো বল নেই, দুটো মিলে একটাই বল হয়ে গেছে!

আইনস্টাইন তাঁর চিন্তা ও দৈনন্দিন জীবনে জটিলতা খুব অপছন্দ করতেন। তিনি ভালোবাসতেন সহজ জিনিস। একবার এক বন্ধু তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি কেন শেভ করার সাবান কেনেন না। তিনি সাধারণ গোসলের সাবান দিয়েই শেভ করতেন। আইনস্টাইন বলেছিলেন, একটা সাবান দিয়ে যখন দুটো কাজই হয়ে যাচ্ছে, তখন অযথা দুই রকম সাবান রাখাটা তাঁর কাছে খুব ঝামেলার মনে হয়। এই ব্যাপারটা যদি আইনস্টাইনের কাছে ঝামেলার মনে না হতো, তবে কি তিনি সার্বিক তত্ত্বের কথা ভাবতে পারতেন?

যে তত্ত্বের গণিত এত কঠিন যে একসময় বলা হতো পুরো পৃথিবীতে মাত্র ১২ জন মানুষ এটা বুঝতে পারে (অবশ্য কথাটা তখনো একটু বাড়িয়েই বলা হতো), সেই তত্ত্বকে সহজ বলাটা একটু অদ্ভুত শোনাতে পারে। আপেক্ষিকতার গণিত সত্যিই জটিল, কিন্তু এই জটিলতার বদলে মহাবিশ্বের সামগ্রিক চিত্রটা আমাদের কাছে অনেক বেশি সহজ হয়ে গেছে। মহাকর্ষ ও জড়তাকে একই বল হিসেবে প্রমাণ করাটাই সার্বিক তত্ত্বকে মহাবিশ্ব দেখার সবচেয়ে দারুণ ও কার্যকর উপায়ে পরিণত করেছে।

১৯২১ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে আপেক্ষিকতা নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সময় আইনস্টাইন ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মহাকর্ষ ও জড়তা যে একই জিনিস, এটা প্রমাণ করার মাধ্যমে সার্বিক তত্ত্ব পুরোনো পদার্থবিজ্ঞানের ওপর এতটাই শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে যে এর গাণিতিক জটিলতাগুলো সেই তুলনায় একদম সামান্যই মনে হয়।’

তা ছাড়া, এই তত্ত্বের মধ্যে এমন একটা ব্যাপার আছে, গণিতবিদেরা যাকে বলেন এলিগেন্স। মানে একধরনের শৈল্পিক সৌন্দর্য। বিজ্ঞানী লরেন্টজ একবার বলেছিলেন, ‘যে মানুষ সৌন্দর্য ভালোবাসেন, তিনি নিশ্চয়ই চাইবেন এই তত্ত্বটা যেন সত্যি হয়!’

আইনস্টাইনের এই সমতা নীতি (মহাকর্ষ ও জড়তার সমতা) প্রমাণ করে দিয়েছে, ত্বরণসহ সব রকম গতিই আসলে আপেক্ষিক। ম্যাজিকটা কীভাবে কাজ করে, চলো দেখি। আমরা যখন ভাবি আইনস্টাইনের লিফটটা মহাকাশের ভেতর দিয়ে ওপরের দিকে ছুটে যাচ্ছে, তখন লিফটের ভেতরে আমরা জড়তার প্রভাব দেখতে পাই। কিন্তু চাইলে তো তত্ত্ব অনুযায়ী লিফটটাকেও একটা স্থির কাঠামো ধরা যায়! তখন মনে হবে, পুরো মহাবিশ্ব তার সমস্ত গ্যালাক্সি নিয়ে প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে, অর্থাৎ লিফটের পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে! মহাবিশ্বের এই ত্বরণের ফলেই তখন একটা মহাকর্ষ ক্ষেত্র তৈরি হবে। আর এই ক্ষেত্রের কারণেই লিফটের ভেতরের জিনিসপত্র মেঝের দিকে চেপে বসবে। তখন কেউ চাইলে বলতেই পারে, এই প্রভাবগুলো আসলে জড়তার নয়, মহাকর্ষের!

কিন্তু আসলে কোনটা ঘটছে? লিফটটা ছুটছে বলে জড়তার প্রভাব তৈরি হচ্ছে, নাকি মহাবিশ্ব ছুটছে বলে মহাকর্ষের প্রভাব তৈরি হচ্ছে? প্রশ্নটাই আসলে ভুল। এখানে আসল বা পরম গতি বলতে কিচ্ছু নেই। আছে কেবল লিফট ও মহাবিশ্বের আপেক্ষিক গতি। এই আপেক্ষিক গতির কারণেই একটা বলের ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা সার্বিক তত্ত্বের সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। তুমি চাইলে একে মহাকর্ষ বলতে পারো, আবার চাইলে জড়তাও বলতে পারো। এটা পুরোপুরি নির্ভর করে তুমি কোন প্রসঙ্গ কাঠামো বেছে নিচ্ছ, তার ওপর। লিফটটাকে কাঠামো ধরলে এটাকে বলা হবে মহাকর্ষ, আর মহাবিশ্বকে কাঠামো ধরলে বলা হবে জড়তা। জড়তা ও মহাকর্ষ হলো একই ঘটনার দুটো আলাদা নাম মাত্র।

অবশ্য, মহাবিশ্বকে স্থির হিসেবে ধরে নেওয়াটাই আমাদের জন্য অনেক বেশি সহজ ও সুবিধার। কেউই সাধারণত ছুটে চলা একটা লিফটের ভেতরের বলকে মহাকর্ষ বলতে চাইবে না। কিন্তু সার্বিক তত্ত্ব বলছে, তুমি চাইলে জুতসই কোনো কাঠামো ধরে নিয়ে এটাকেও মহাকর্ষ বলতে পারো। আর ওই লিফটের ভেতরে এমন কোনো পরীক্ষা করা সম্ভব নয়, যা প্রমাণ করতে পারে যে তোমার এই ধারণাটি ভুল!

যখন বলা হয় লিফটের ভেতরের মানুষটি বুঝতে পারেন না তাঁকে মেঝের দিকে চেপে ধরে রাখা বলটা জড়তা নাকি মহাকর্ষ, তার মানে কিন্তু এই নয় যে তিনি ওই বলটার সঙ্গে পৃথিবীর মহাকর্ষের কোনো পার্থক্যই ধরতে পারবেন না! গ্রহের মতো বিশাল বস্তুর চারপাশের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের একটা গোলাকার গঠন থাকে, যা মহাকাশে লিফট ছুটিয়ে কিছুতেই নকল করা যায় না। যেমন ধরো, পৃথিবীর অনেক ওপর থেকে দুটি আপেলকে যদি এক ফুট দূরে রেখে নিচে ফেলা হয়, তবে তারা যত নিচে নামবে, একে অপরের তত কাছাকাছি চলে আসবে। কারণ প্রতিটি আপেলই পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে সোজা একটি রেখা ধরে পড়বে। কিন্তু চলন্ত লিফটের ভেতরে দুটি আপেলকে ফেললে তারা একে অপরের কাছে আসবে না, বরং একদম সমান্তরালভাবে মেঝের দিকে পড়বে!

মহাকর্ষ বল ও জড়তা বলের মধ্যে এই পার্থক্যের ব্যাপারটা আরেকটা ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে খুব সহজেই বোঝা যায়। ধরো, মহাকাশের ভেতর দিয়ে ক্রমাগত গতি বাড়িয়ে ওপরের দিকে ছুটে চলা একটা লিফটের ভেতরে দুটি আপেল হাত থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো। আপেল দুটি এমনভাবে রাখা ছিল যে একটি ঠিক অন্যটির এক মিটার ওপরে। লিফটটি যখন ওপরের দিকে ছুটবে, আপেল দুটি মেঝের দিকে পড়ার সময় তাদের মাঝখানের ওই এক মিটার দূরত্বটা কিন্তু একদম সমান থাকবে।

কিন্তু আপেল দুটো যদি পৃথিবীর ওপর থেকে অনেক উঁচুতে একইভাবে ফেলা হয়, তখন আর এমনটা হবে না! তখন তারা যত নিচে নামবে, তাদের মাঝখানের দূরত্বটা ততই বাড়তে থাকবে। কেন এমন হয় জানো? কারণ যে আপেলটা নিচে আছে, সেটা পৃথিবীর কেন্দ্রের বেশি কাছাকাছি থাকে বলে সেটির গতি বা ত্বরণ সব সময়ই ওপরের আপেলের চেয়ে একটু বেশি হয়।

এবার চলো এই দুটো ব্যাপারকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখি কী হয়! ধরো, বিশাল বড় ও গোল কোনো বস্তু (যেমন একটা ছোট গ্রহ) সূর্যের মতো কোনো প্রচণ্ড ভারী বস্তুর দিকে পড়ছে। সূর্যের বিশাল ভরের কারণে তৈরি হওয়া শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র চারদিকে সমান নয়। তাই ওই মহাকর্ষ ক্ষেত্রটি গ্রহটিকে তার দুই পাশ থেকে জোরে চেপে ধরবে এবং যেদিকে পড়ছে সেদিকে তাকে লম্বাটে করে টানবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে বলেন টাইডাল ফোর্স। এই বল এতটাই শক্তিশালী যে কোনো ছোট গ্রহ যদি অনেক বিশাল ভরের কোনো বস্তুর দিকে পড়তে থাকে, তবে এই বলের টানে গ্রহটি টুকরা টুকরা হয়ে ভেঙেও যেতে পারে!

বিশাল ভরের বস্তুর চারপাশের মহাকর্ষ ক্ষেত্রই এই টাইডাল ফোর্স তৈরি করে, ত্বরণ বা গতি বৃদ্ধির কারণে তৈরি হওয়া মহাকর্ষে এই বল থাকে না। তুমি যে কাঠামো থেকেই মাপো না কেন, এই টাইডাল ফোর্সের প্রভাব তুমি দেখতে পাবেই। ওপরের দিকে ছুটে চলা সেই লিফটের ভেতরের মানুষটিও চাইলে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন সেখানে টাইডাল ফোর্স আছে কি না। সেটা মেপেই তিনি বলে দিতে পারবেন, ওই মহাকর্ষ ক্ষেত্রের গঠনটা কেমন। এর মানে কিন্তু এই নয় যে তিনি মহাকর্ষ ও জড়তার মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে বের করছেন। তিনি শুধু আলাদা আলাদা জ্যামিতিক গঠনের দুটো বলের ক্ষেত্রের মধ্যে পার্থক্য করছেন।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব ২

পৃথিবীর নিজের অক্ষে ঘোরার ব্যাপারটাতেও ঠিক একই রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়। পৃথিবী ঘোরে নাকি আকাশ ঘোরে, এই প্রাচীন তর্কটা মূলত কোন প্রসঙ্গ কাঠামো বেছে নেওয়া সবচেয়ে সহজ হবে, তা নিয়ে তর্কের মতো। খুব পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়, পুরো মহাবিশ্বকে স্থির কাঠামো হিসেবে বেছে নেওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধার। মহাবিশ্বের সাপেক্ষে আমরা বলি, পৃথিবী তার নিজের অক্ষে ঘোরে। আর সেই ঘোরার কারণে তৈরি হওয়া জড়তার জন্যই এর মাঝখানটা একটু ফুলে থাকে।

কিন্তু যদি আমরা পৃথিবীটাকেই স্থির কাঠামো হিসেবে বেছে নিই, তবে আমাদের আটকাতে পারে কেবল হিসাব-নিকাশের ওই অসুবিধাই, আর কিছু নয়। সে ক্ষেত্রে আমরা বলব, মহাবিশ্ব পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে এবং সেই ঘোরার কারণে একটা মহাকর্ষ ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা পৃথিবীর মাঝখানটাকে ফুলিয়ে দেয়! এখানেও কিন্তু এই তৈরি হওয়া মহাকর্ষের গঠন গ্রহের চারপাশের মহাকর্ষের মতো নয়। তারপরও একে একটা সত্যিকারের মহাকর্ষ ক্ষেত্র বলা যায়।

আমরা যদি পৃথিবীকে আমাদের স্থির কাঠামো হিসেবে ধরে নিই, তবে দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তাতেও কোনো সমস্যা হয় না। আমরা তো রোজই বলি, সূর্য সকালে ওঠে আর সন্ধ্যায় অস্ত যায় বা ধ্রুবতারাকে কেন্দ্র করে কালপুরুষ ঘোরে। তাহলে আসলে কোনটা ঠিক? আকাশ ঘোরে নাকি পৃথিবী ঘোরে? এই প্রশ্নটার আসলেই কোনো অর্থ হয় না। এটা অনেকটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে ওয়েটারকে এমন প্রশ্ন করার মতো, ‘আপনি কি পাইয়ের ওপরে আইসক্রিম চান, নাকি আইসক্রিমের নিচে পাই চান?’

যদি মহাবিশ্বকে স্থির কাঠামো হিসেবে ধরা হয়, তবে মহাবিশ্বের জড়তা হলো গতির পরিবর্তনে তার বাধা দেওয়ার ক্ষমতা। আর যদি বস্তুটিকে স্থির কাঠামো হিসেবে ধরা হয়, তবে এই জড়তাকে বলা হয় মহাকর্ষ। তখন মনে হবে, মহাবিশ্ব নিজে যেহেতু গতি পরিবর্তন করছে, তাই সে বস্তুটি সমেত চারপাশের সবকিছুকে নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে!

আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্বকে অনেক সময় খুব সহজে এভাবে বলা হয়—নিউটন এটা পরিষ্কার করেছিলেন যে কোনো পর্যবেক্ষক যদি সুষম গতিতে চলেন, তবে তিনি এমন কোনো যান্ত্রিক পরীক্ষা করতে পারবেন না, যা দিয়ে প্রমাণ করা যায় যে তিনি চলছেন নাকি স্থির আছেন। বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এই ধারণাকে আরও বাড়িয়ে বলেছে, শুধু যান্ত্রিক নয়, আলো বা অন্য কোনো পরীক্ষা দিয়েই এটা প্রমাণ করা যাবে না। আর সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্ব হলো এরই আরেকটা সম্প্রসারিত রূপ; এটি অসম গতি বা ত্বরণের ক্ষেত্রেও এই নিয়মটাকে সত্যি প্রমাণ করেছে। সার্বিক তত্ত্ব বলে, একজন পর্যবেক্ষক যেভাবেই চলুক না কেন, এমন কোনো পরীক্ষাই নেই, যা দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে পারবেন যে তিনি চলছেন নাকি স্থির আছেন!

সার্বিক তত্ত্বকে মাঝেমধ্যে এভাবেও বলা হয়—প্রকৃতির সব নিয়ম যেকোনো পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে একই থাকে। মানে, একজন পর্যবেক্ষক যেভাবেই চলুক না কেন, তিনি প্রকৃতির সব নিয়মকে একই গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। তিনি হয়তো পৃথিবীর কোনো ল্যাবরেটরিতে কাজ করা বিজ্ঞানী হতে পারেন, কিংবা চাঁদে থাকতে পারেন, আবার হয়তো দূরের কোনো নক্ষত্রের দিকে ছুটে চলা বিশাল কোনো মহাকাশযানের ভেতরেও থাকতে পারেন।

আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব ওই বিজ্ঞানীকে এমন কিছু গাণিতিক সমীকরণ দেয়, যা দিয়ে তিনি যেকোনো পরীক্ষা করে প্রকৃতির নিয়মগুলো ব্যাখ্যা করতে পারেন। তিনি স্থির থাকুন, একই বেগে চলতে থাকুন বা যেকোনো জিনিসের সাপেক্ষে তাঁর গতি বাড়তেই থাকুক—এই সমীকরণগুলো সব সময় একদম একই ফলাফল দেবে।

পরের অধ্যায়ে আমরা আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্বটা একটু খুঁটিয়ে দেখব, জানব কীভাবে এটা স্থান-কাল নামের দারুণ একটা নতুন ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব ৩

Read full story at source