ইউ-পিক এবং ডোনাট পিচ কাহিনি

· Prothom Alo

আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশে বাগানের গাছ থেকে বা খেত থেকে নিজ হাতে পাকা ফল পেড়ে খাওয়া ও কেনার ব্যবস্থার কথা শুনেছি। এবার যুক্তরাষ্ট্রে এসে এমন এক সুযোগ পেলাম, ছোট পরিসরের উৎসব বলা যায়। ফল বাগান মালিকগণ এটাকে ‘ইউ-পিক’ অর্থাৎ ‘নিজে তুলে না–ও’—এ স্লোগানে প্রচার চালায়। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের রিচল্যান্ড অঞ্চলে জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বেন্ট চেরি, রেইনিয়ার চেরি; ডোনাট পিচ, হোয়াইট নেকটারিন, রিচ প্রাইড পিচ; ইয়েলো পিচ; ইয়েলো নেকটারিন, সামার অ্যামেলিয়া ইয়েলো নেকটারিন; প্ল্যাম এক্স এপ্রিকট ফলগুলো তোলা হয়। কোন মাসের কোন সপ্তাহে কোন ফল বাগান থেকে তোলা যাবে তার একটা ক্যালেন্ডার খামার কর্তৃপক্ষ সাধারণত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। ছোট মেয়ে ও জামাই ডা. সাদিয়া ও ড. ফাহাদ এবং স্ত্রী নাসরীনসহ আমি রিচল্যান্ডের হারভেস্ট লেনের ‘রে ফ্রেঞ্চ অর্চাড’-এ গেলাম ১১ জুলাই ২০২৬ সকাল দশটায়। ওই সপ্তাহে তোলার জন্য নির্ধারিত ফল ছিল ‘ডোনাট পিচ’। ইউ-পিকের নিয়ম অনুযায়ী বাগানে প্রবেশের পর পছন্দ অনুযায়ী পিচ ফল গাছ থেকে তুলে খাওয়া যায় ইচ্ছেমতো, তবে বাগানের বাইরে আনতে চাইলে নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে কিনতে হয়। সেদিনের মূল্য ছিল প্রতি পাউন্ড সোয়া তিন ডলার। আমরা আরেক দিন এক ব্লু-বেরি অর্চাড দেখেছি। কলাম্বিয়া মালভূমির পাহাড়ের ঢালের নিচের অংশে বা উপত্যকায় অর্চাডগুলো তৈরি করা হয়েছে। উপরিভাগে বায়ুবাহিত পলল হতে সৃষ্ট মৃত্তিকার পাতলা আবরণে ঢাকা ৬০ লাখ হতে প্রায় পৌনে দুই কোটি বছরের বেশি বয়সী ব্যাসাল্ট নামের আগ্নেয়শিলায় মালভূমিটি গঠিত।

Visit afnews.co.za for more information.

এমনিতেই আমরা এমন ফলের সঙ্গে পরিচিত নই, চোখের সামনে সারি সারি গাছে ফল ধরে আছে আমাদের কাছে অভূতপূর্ব, অদৃষ্টপূর্ব ও বিস্ময়কর। যদিও বাংলাদেশে এখন অনেক ধরনের বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে এবং বাজারে পাওয়াও যায়, কিন্তু এ ফলটির চাষ হয় না। যা হোক, চারদিকে হলুদ রঙের ফিতার বেষ্টনী দিয়ে নির্দিষ্ট করে লিখে দেওয়া আছে কোন গাছগুলোর ফল তোলার উপযোগী হয়েছে, তোলা যাবে। হাত দিয়ে পাড়া যায় মূলত এমন উচ্চতার ছোট ছোট গাছে গোলাপি ও লালচে রঙের দৃষ্টিনন্দন ডোনাট পিচ ধরে আছে গাছের গোড়া অবধি। মানুষ গাড়ি করে আসছে পরিবার-পরিজনসহ, পিচ তুলছে, খাচ্ছে, ব্যাগভরে কিনে নিচ্ছে; এ যেন এক আনন্দোৎসব।

গ্রীষ্মকালের সম্ভবত সবচেয়ে সুন্দর ও সুস্বাদু এ ফলের নাম যথার্থই ডোনাট পিচ, ফলটি একধরনের সাদা পিচ এবং বৈজ্ঞানিক নাম ‘প্রুনাস পারসিকা’ ভ্যারাইটি ‘প্লাটিকারপা’। ফলের মধ্যখানের বোঁটা তুলে ফেলে উবু করে রাখলে মধ্যকার গর্তসহ ফলটি দেখতে অবিকল ডোনাটের মতো দেখায় বলে এর নাম ডোনাট পিচ। চ্যাপটা পিচ, স্যাটার্ন পিচ, পিরিচ পিচ—এমন কিছু সাধারণ নামেও ফলটি পরিচিত। ডোনাট পিচের বিভিন্ন জাতের মজার নাম রয়েছে যেমন ‘ইউএফও’, ’গ্যালাক্সি’, ’ট্যাঙ্গো’, ‘সুইট ব্যাগেল’, ‘সওজি সুইরল’, ‘পিচ পাই’ এবং ‘ফ্ল্যাট ওয়ানডারফুল’। রং ছাড়াও এর ঘ্রাণ অন্যান্য সাধারণ পিচের মাঝে ডোনাট পিচকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। চাষ কঠিন ও ব্লাইটের মতো রোগে বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকায় ডোনাট পিচ সাধারণ গোলাকার পিচের তুলনায় বেশি দামি।

ডোনাট পিচে ফ্যাকাশে হলুদ-সবুজ ভিতের ওপর গাঢ় লাল-কমলা আভা ছড়ানো থাকে এবং ফলটি ৫ থেকে ৭ সেমি ব্যাসের ছোট থেকে মাঝারি আকারের। এ ফলের খোসা মসৃণ, টানটান ও পাতলা ও হালকা মখমলি লোম দ্বারা আবৃত এবং পাতলা হওয়ায় ফল পেকে গেলে সহজেই ছিদ্র হয়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খোসার নিচে সাদা থেকে হাতির দাঁতের রঙের শাঁস ঘন, রসালো, নরম ও কোমল; পেকে গেলে এর গঠন অত্যন্ত সরস হয় এবং সুগন্ধ, মিষ্টি ও ফুলের সুবাস বের হয়। শাঁসের মাঝখানে সহজেই আলাদা করা যায় এমন একটি বাদামি আঁটি থাকে। সুপক্ক ফলটি অসাধারণ মিষ্টি, রসালো, সুস্বাদু ও মজাদার, সহজে কামড়ে খাওয়া যায়। ফলের নরম খোসায় খুব সামান্য বা কোনো আঁশ থাকে না বলে খোসা না ফেলেও খাওয়া যায়। তবে কেউ খোসা ছাড়াতে চাইলে বিচির কাছাকাছি কোনো আলগা অংশে সামান্য টানেই খোসাগুলো ফল থেকে চওড়া ফালার মতো সহজেই খুলে আসে। পিচে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, কপার, ম্যাগনেসিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজের মতো খনিজ এবং ভিটামিন এ, সি, ই, ও কে থাকে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

চ্যাপটা আকৃতির এই ফল প্রাচীনকাল থেকেই চীনে চাষ হয়ে আসছে এবং লোককাহিনিতে এ ফলের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮২৮ সালে উইলিয়াম প্রিন্স নামের এক নার্সারি মালিক উত্তর আমেরিকায় এ পিচ আমদানি করেন এবং কৃষকেরা এগুলো চাষ করতে শুরু করেন। ১৯ শতকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হলেও ১৯৮০-এর দশকের আগে ডোনাট পিচ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনিÑরাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় ‘স্যাটার্ন’ নামের একটি জাত উদ্ভাবন করে, মিসৌরির স্টার্ক ব্রোস নার্সারি বিক্রি শুরু করে। পরবর্তী সময়ে উদ্ভিদ প্রজননের মাধ্যমে আরও অনেক জাত উদ্ভাবিত হয়েছে এবং সেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফলবাগানে চাষ করা হচ্ছে। অসাধারণ স্বাদ এবং দক্ষিণ ও মধ্য টেক্সাস থেকে মিসৌরি, ক্যারোলিনা পর্যন্ত প্রায় সর্বত্র জন্মানোর সক্ষমতার জন্য ডোনাট পিচ সবার পছন্দের।

স্থানীয় পত্রিকা ট্রাই-সিটি হেরাল্ড ৭ জুন ২০২৬ তারিখে কয়েক প্রজন্মের চেরি ও পিচ অর্চাড ‘রে ফ্রেঞ্চ অর্চাড’ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার খবর প্রকাশ করে। প্রায় ৬০ বছর আগে মি. রে ফেঞ্চ সিনিয়র ও মিরিয়াম ফ্রেঞ্চ ফলের বাগানের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এখানকার ১৬০ একর জমিতে ঝোপ-ঝাড়ের মাঝে প্রথম চারা রোপণ করেন। সম্প্রতি রবিন ফ্রেঞ্চ ও তাঁর স্ত্রী সান্দ্রা ফ্রেঞ্চ অবসরে যাওয়ার জন্য তাঁদের পারিবারিক খামারটি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ ও ২০২৭ মৌসুমে সীমিত আকারে ব্যবসা করলেও ২০২৮ সালে পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। অর্চাডের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ও আপন হাতে গাছ থেকে পাকা ফল তোলার আনন্দ উপভোগ এবং সদ্য তোলা ডোনাট পিচের অপূর্ব রসাস্বাদনের জন্য আমরা আরেক দিনও সেখানে গিয়েছি স্মৃতির ভান্ডারে চমৎকার ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা জমা করেছি।

লেখক: এ. কে. এম. খোরশেদ আলম, ভূতত্ত্ববিদ ও গবেষক; রিচল্যান্ড, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র।

Read full story at source