ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের সিদ্ধান্তটা অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক
· Prothom Alo

জ্যোতি রহমান, অর্থনীতিবিদ। আইএমএফের ম্যাক্রো-ফিসক্যাল বিশেষজ্ঞ। পানাম ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহুল আহমদ
Visit sportfeeds.autos for more information.
অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলো। সামগ্রিকভাবে আপনি এই সময়কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
জ্যোতি রহমান: মাও সে–তুং যেমন বলেছিলেন, ‘শত ফুল ফুটতে দাও’, আমার পর্যবেক্ষণে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই দুই বছরে ভালো-মন্দ মিলিয়ে বহু উদ্যোগ ও নতুন চিন্তার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছে। এই শত ফুল ফোটার ও শত চিন্তার বিকাশের প্রক্রিয়াটি সার্বিকভাবে ইতিবাচক।
এ অঞ্চলের ইতিহাসে বিদ্রোহ অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সম্রাট আকবরের দরবারের লেখক শেখ আবুল ফজল আল্লামি এই অঞ্চলের বর্ণনায় মন্তব্য করেছিলেন, এখানকার বাতাসেও বিদ্রোহের উপস্থিতি ছিল। তবে শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থা এতটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক একনায়কতন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল যে সরকারের পতনের পর কী হবে, তা নিয়ে আমার মধ্যে সব সময় উদ্বেগ ছিল।
আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের সময়ও রাষ্ট্রকাঠামোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে দেখা যায়। কিন্তু জুলাইয়ে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও আগ্রাসনের মাত্রা ছিল অভাবনীয়। এবারই প্রথম কোনো আন্দোলনে সরকারপ্রধানের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ ব্যক্তিরা একযোগে পালিয়েছেন। ফলে তিন দিন দেশে কার্যত কোনো সরকারই ছিল না।
অথচ লক্ষ করুন, এক ভয়ানক রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের টাটকা স্মৃতি এবং সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোষ্ঠীগত ও সাম্প্রদায়িক উসকানি সত্ত্বেও আমাদের সমাজ অবিশ্বাস্য একতাবদ্ধতা দেখিয়েছে। যদিও এই ঐকতান ধরে রাখা যায়নি, কিছুটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতায়, কিছুটা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অপরিণামদর্শিতায়। তবু আমাদের সমাজ স্ব-উদ্যোগে বহু বিশৃঙ্খলা সামাল দিয়েছে। এটা আশাজাগানিয়া।
আওয়ামী লীগ আমলের ব্যাংকিং খাতের লুটপাট নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে পৃথক কোনো কমিশন হলো না। এই পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
জ্যোতি রহমান: আওয়ামী লীগ আমলের অর্থনৈতিক মডেলকে আমি বলি ‘হাসিনোমিকস’। এর অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল নিজ গোষ্ঠীভুক্ত ব্যক্তি ও পছন্দের অলিগার্কদের লাইসেন্স দেওয়া অথবা অবৈধ পন্থায় ব্যাংকের দখল করা। এরপর আইনি ও রেগুলেটরি কাঠামোকে কলুষিত করে ও অবৈধ পন্থায় ব্যাংক খাত থেকে অতিমূল্যায়িত মেগা প্রকল্প বা অস্তিত্বহীন ব্যবসায় ঋণপ্রবাহ, যা অর্থ পাচারকে এমন বিশাল রূপ দিয়েছিল।
হাসিনা সরকার যত দিন নিজেদের ক্ষমতাকে নিরবচ্ছিন্ন ভেবেছিল, তত দিন অর্থনীতিতে একধরনের প্রবাহ ও ‘ট্রিকল-ডাউন ইফেক্ট’ ছিল। কিন্তু করোনা ও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পর ব্যাংক খাত থেকে বেনামি ঋণের নামে অর্থ পাচারের গতি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়, যা ব্যাংকিং খাতকে দেউলিয়া পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়।
রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে কোনোভাবেই ১০-১২টির বেশি ব্যাংক কার্যকরভাবে টিকে থাকার মতো সক্ষম না। কিন্তু হুট করে তো এত ব্যাংক বন্ধও করা যায় না। তাই ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা বা রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিয়ে ধাপে ধাপে কমানোর মতো কঠিন পদক্ষেপ দরকার।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, আমানতকারীদের আস্থার সংকট দেখা দিলে পুরো ব্যাংকিং খাতেই এর প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বা বারবার মূলধন জোগাতে করদাতাদের অর্থই ব্যবহার করতে হয়। এটা সরকারের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিদেশে চলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফেরানোও দুঃসাধ্য প্রক্রিয়া।
ফলে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার শুধুই অর্থনৈতিক জ্ঞানের বিষয় নয়, এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সরাসরি না বললেও স্পষ্টই বোঝা গেছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা কোনো কাঠামোগত রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু করবে না, তারা শুধুই জরুরি সংকটাবস্থা সামাল দেবে। সে হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে মোটামুটি গ্রহণযোগ্যভাবেই ‘সামাল’ দেওয়ার কাজটি করেছে। তারা জরুরি সংকটাবস্থা সামাল দেওয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত অর্থে ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ দায়িত্ব পালন করেছে এবং সংস্কার বা কাঠামোগত রূপান্তরের দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
বিএনপি সরকারের আমলে এই খাতের সংস্কার কি সম্ভব হবে?
জ্যোতি রহমান: বর্তমান সরকারকে আসলে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটিই নিতে হবে: তারা কি তাৎক্ষণিক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার চায়, নাকি কয়েক বছর ধরে ধীরগতির ব্যবস্থাপনায় ক্রমে সংস্কারের পথে চলবে? এ দুটো পথের যেটাই নেওয়া হোক না কেন, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
এ দেশে কিন্তু ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের উদাহরণ আছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ব্যাংক সংস্কার নিয়ে কাজ হয়েছিল, যেখান বাস্তবায়নযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ দিকনির্দেশনাও ছিল। ফলে ব্যাংক খাতের এই সংস্কারের রাজনৈতিক রূপরেখা গ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য বর্তমান সরকারকে এখন পর্যন্ত দোদুল্যমান বলে মনে হচ্ছে।
সম্প্রতি আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করলে মধ্য মেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে ৩ শতাংশের নিচেও নেমে যেতে পারে। আপনি কীভাবে এটাকে ব্যাখ্যা করেন?
জ্যোতি রহমান: সরকারের অনুরোধে সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করার মিশন শেষে আইএমএফ এটা জানিয়েছে। ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীজনদের আগ্রহ স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান।
আইএমএফের ভূমিকা অর্থনীতিতে অনেকটা চিকিৎসকের মতো। একটি দেশ সাধারণত তখনই আইএমএফের কাছে যায়, যখন সে অর্থনৈতিক সংকটে থাকে কিংবা সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি বা ‘ভ্যাকসিন’ নিতে চায়। কোনো দেশ যখন আইএমএফের দ্বারস্থ হয়, তখন আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা (রেটিং এজেন্সি), বিশ্বের আর্থিক বাজার, দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদার এমনকি দেশীয় পুঁজিবাজার তা তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এই পরিস্থিতিতে আইএমএফের কাছে গিয়ে তাদের দেওয়া শর্ত পালনে অনীহা দেখালে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অংশীজনদের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা যায়।
তাই যেকোনো সরকারেরই আইএমএফের কাছে যাওয়ার আগেই হিসাব করা উচিত তারা ঠিক কী চায়। কেবল সরাসরি ঋণের অর্থ পাওয়ার জন্য নয়, অনেক সময় অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থায়ন পাওয়ার জন্য আইএমএফের ‘গুড ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট’ জরুরি হিসেবে দেখা হয়।
আইএমএফ যখন ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে সংস্কারের শর্ত দেয়, তখন কেবল সাময়িক জনতুষ্টিতার কথা ভেবে পিছিয়ে আসা ঠিক হবে না। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজার তখন মনে করবে, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা রাজনৈতিক সাহস একেবারেই নির্ভরযোগ্য নয়।
জ্যোতি রহমানএই ধরনের সংস্কার কি বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন?
জ্যোতি রহমান: আইএমএফ সাধারণত ১৫-২০ বছর ধরে যে সংস্কারগুলোর কথা বলছে, তার একটি বড় অংশের সঙ্গে দেশীয় অর্থনীতির কাঠামোগত চাহিদার যৌক্তিক মিল রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান দ্বিমতগুলো তৈরি হয় বাস্তবায়ন কৌশলে। আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমস্যা হলো রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অভিজাত ও সুবিধাভোগী (প্রিভিলেজড) শ্রেণির রাজস্ব ও রাজনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত দুর্বল।
এই শ্রেণি তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন বা ভ্রমণের মতো মৌলিক নাগরিক সেবার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়। একমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া রাষ্ট্রের আর কোনো সেবাতেই তাদের প্রত্যক্ষ নির্ভরতা নেই। ফলে তারা রাষ্ট্রের প্রতি কর প্রদানে কোনো সামাজিক বা নৈতিক দায়বদ্ধতা অনুভব করে না।
যখন রাষ্ট্র কর-জিডিপি অনুপাত কম বলে রাজস্ব বাড়াতে চায়, তখন এই শ্রেণি উল্টো অভিযোগ করে যে রাষ্ট্র টাকা অপচয় করে। তবে প্রকৃত চিত্র হলো, আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোর প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এতটাই কম যে বড় অঙ্কের টাকা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করার মতো সক্ষমতাও বস্তুত তাদের নেই।
অতএব, আইএমএফ যখন কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর কথা বলে, সেগুলোর সঙ্গে সরকারের নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কোনো মৌলিক বিরোধ থাকার কথা নয়। মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে কেবল বিস্তারিত শর্তাবলি ও দর–কষাকষির সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়ে। এখন ব্যাংকিং খাত বা এনবিআরের সংস্কার কীভাবে করা হবে, তা সরকারকে ঠিক করতে হবে।
আপনি কি ৫-১০টি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে জাতীয়করণ করবেন, নাকি একীভূত করে বেসরকারি বা বিদেশি খাতে বিক্রি করে দেবেন, নাকি সরাসরি লিকুইডেট (বিলুপ্ত) করে দেবেন? এসবই টেকনিক্যাল বিষয়। কিন্তু মূল সিদ্ধান্তটা রাজনৈতিক। তবে রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের তুষ্ট রাখা ও ব্যবসায়ীদের জন্য ‘ঠেকা দেওয়া প্রণোদনার’ সমাধানের পথে হাঁটলে রাজনৈতিক আত্মহননের পথকেই ত্বরান্বিত করবে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর অর্থায়ন বিষয়ে আপনার কী মত?
জ্যোতি রহমান: প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা ও আলোচনা হওয়া দরকার। সরকার যে ‘বটম অব দ্য পিরামিডের’ কাছে সরাসরি নগদ সহায়তা পৌঁছাতে চায়, তা স্পষ্ট। আমাদের মতো দুর্বল রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রস্তাবটি যাতে ফাইলচাপা পড়ে আটকে না যায়, সে জন্য হয়তো সরকার চিন্তা করেছে, আগে মাঠে নামিয়ে দেওয়া যাক, শুরু হয়ে গেলে আর পেছনে ফেরার সুযোগ থাকবে না, তখন পরিস্থিতি দেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সংশোধন করা যাবে। এই চিন্তাধারাটি ভুল নাকি ঠিক, তা সাদা বা কালো ভঙ্গিতে বলার সুযোগ নেই।
আগে সামাজিক সুরক্ষায় যে বিপুল অপচয়, লিকেজ (চুরি) বা ডাবল কাউন্টিং হতো, নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি তা বন্ধ করা যায়, তবে অতিরিক্ত কোনো অর্থায়নের প্রয়োজন হয়তো হবে না। পুরোনো অপচয় থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়েই এই নতুন নগদ প্রদান চালানো সম্ভব। যদি সঠিক মানুষের কাছে টাকাটা পৌঁছায়, তবে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এ ছাড়া আর্থিক লেনদেনে ডিজিটালাইজেশনের এই ভরা জোয়ারের যুগে একাধিক কার্ড স্কিম চালু না করে একটি ইউনিফর্ম কার্ডের মাধ্যমে ব্যাংক ও এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস) খাতের মাধ্যমেই সব সামাজিক সুরক্ষার নগদ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করাটা বিশ্বজুড়েই একটি প্রমাণিত মডেল। তবে উল্টোটাও হতে পারে, যদি আগের অপচয় বন্ধ না করে নতুনভাবে অনির্দিষ্ট খরচ যুক্ত করা হয়, তবে তা অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতের এই নতুন ও বড় খরচ কি সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় কোনো চাপ ফেলবে?
জ্যোতি রহমান: এই মুহূর্তে (২০২৬-২৭ অর্থবছরে) খুব বড় চাপ সম্ভবত ফেলবে না। কারণ, এখন পর্যন্ত এ সংখ্যা বা পরিধি পুরো অর্থনীতির তুলনায় খুব বড় নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পাইলট প্রজেক্টগুলো থেকে সরকার কী শিখছে এবং কীভাবে তাদের শেখার প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে সংশোধন করছে।
অপচয়, দুর্নীতি ও সিস্টেম লসকে যথাসম্ভব ন্যূনতম পর্যায়ে রেখে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রসারই এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্যের একমাত্র পথ। তবে ব্যাংক খাতে আস্থা না থাকলে নগদ অর্থ স্থানান্তরে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাড়বে, যা এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করবে; তাই ব্যাংক খাতের সংস্কার এখানেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মধ্যপ্রাচ্য সংকট সরকারের ওপর কী ধরনের অর্থনৈতিক চাপ ফেলছে। সরকারের করণীয় কী?
জ্যোতি রহমান: যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমাদের অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই বেশ বড় চাপ তৈরি হয়েছে। সরকার কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত, উভয় ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের জ্বালানি খাতের ওপর সরাসরি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারের সামনে দুটি বিকল্প থাকে: বিশ্ববাজারের ধাক্কা সামলাতে ভর্তুকি বাড়িয়ে ভোক্তা পর্যায়ে দাম অপরিবর্তিত রাখা; অথবা ভর্তুকি কমিয়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। এটি একটি অত্যন্ত কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সরকার শুরুতে তাড়াহুড়া করে ভর্তুকি প্রত্যাহার করেনি, তারা সময় নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত দাম কিছুটা সমন্বয় করতেই হয়েছে। সামনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল ঝুঁকিটাই আসবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং তা অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, সেটি সামলানোর মধ্য দিয়ে।
উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে টাকা-ডলারের বিনিময় হার খুব একটা অস্থিতিশীল না থাকলেও তা কত দিন থাকবে, সেটা এই মুহূর্তে বলাটা মুশকিল। কারণ, দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ এখনো বেশ ভালো। যত দিন এই রেমিট্যান্সের প্রবাহ বজায় থাকবে, তত দিন টাকার বিনিময় হারে একধরনের প্রাক্কলনযোগ্যতা থাকবে। তবে বিশ্বসংকটের কারণে কোনোভাবে যদি টাকার অবমূল্যায়ন শুরু হয়, তবে সেটি জ্বালানিসংকটের পাশাপাশি অর্থনীতিতে নতুন ও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করবে।
নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এবং ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন—এই ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনীতিতে কী ধরনের সুযোগ বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে?
জ্যোতি রহমান: আশির দশকের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর এবারই সম্ভবত বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ একটি নতুন অভিজ্ঞতা।
বর্তমান বিশ্ব এখন বহুমুখী বা মাল্টিপোলার বিশ্ব। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র নিজেও এখন আর ওই ডব্লিউটিও, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখায় বিশ্বাস করে না। এখন চীন উদীয়মান ও শক্তিশালী ভূমিকা নিয়ে এগোচ্ছে। ফলে পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এখনকার অর্থনৈতিক সুযোগ খোঁজাটা হবে বেশ অপরিপক্বতা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন ও স্বাধীন অবস্থান তৈরি করার সুযোগ এসেছে। কূটনীতিকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের চশমায় সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের বিস্তৃত বিকল্প ভাবা উচিত। বাংলাদেশ এখন উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তিগুলোর যেমন তুরস্ক, জাপান বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।
বিএনপি নির্বাচনের আগে মেগা প্রকল্প না নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। তবে সম্প্রতি কিছু বড় প্রকল্পের নতুন আলোচনার খবর আসছে। এটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
জ্যোতি রহমান: সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন থাকলে মেগা প্রকল্প কখনোই সমস্যা নয়। বিগত হাসিনা সরকারের মূল সমস্যা ছিল জবাবদিহিহীন অতিমূল্যায়িত বাজেট এবং প্রকল্পকেন্দ্রিক দুর্নীতি। অতীতের ইতিহাস বলে, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতার চেয়ে বরং তৎকালীন রাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠীর ‘রেন্ট-সিকিং’ বা দুর্নীতির কারণেই ১০ টাকার প্রকল্পের বাজেট ২৫ টাকা করা হতো।
তাই আসল বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা—বর্তমান সরকার যদি ১০ টাকার কাজ ১০ টাকায় করার সদিচ্ছা দেখায়, তবে এই আমলাতন্ত্রকে দিয়েই যথাযথ খরচে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।
বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকারের কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন?
জ্যোতি রহমান: এই মুহূর্তে বিনিয়োগকারী ও বৈশ্বিক অংশীজনদের আস্থার অভাবই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারী ও বৈশ্বিক অংশীজনদের মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ে একধরনের ‘সতর্ক প্রত্যাশা’ দেখা যাচ্ছে; কিন্তু বর্তমান সরকার তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য কি না, সে বিষয়ে তারা এখনো ভরসা করতে পারছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের নীতিমালায় স্পষ্টতার অভাব এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে কঠোর মুদ্রানীতির কথা বলছে, আবার অন্যদিকে এমন সার্কুলার দিচ্ছে, যা সেই নীতির পরিপন্থী।
তাই আস্থা ফেরানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে একটি স্বাধীন ও ক্ষমতায়িত ‘ব্যাংক সংস্কার কমিশন’ গঠন করা। অন্তত পরবর্তী ১০ বছরের জন্য একটি পরিপূর্ণ সংস্কারের রোডম্যাপ পেতে সেই কমিশনের প্রতি সরকারের পূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থন থাকতে হবে।
আপনাকে ধন্যবাদ।
জ্যোতি রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।