ইবাদতের স্বাদ ফিরে পাওয়ার ৫ উপায়

· Prothom Alo

সারাদিন কাজ আর কাজের চিন্তায় আমরা সব শক্তি শেষ করে ফেলি। দিনশেষে যখন ইবাদত করার সময় আসে, তখন শরীর আর সায় দিতে চায় না। মনে হয়, ইবাদতও বুঝি সারাদিনের কাজের তালিকার আরও একটা দায়িত্ব।

তাই আমরা চেষ্টা করি যত দ্রুত সম্ভব নামাজটা পড়ে শেষ করে দায়মুক্ত হতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নামাজ আর ইবাদত কি সত্যিই আমাদের জন্য কোনো বোঝা? নাকি আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে শান্তির সবচেয়ে বড় জায়গা এটিই হতে পারত?

Visit moryak.biz for more information.

আসুন, নতুন করে ৫টি উপায় চর্চা করি, যা ইবাদতের স্বাদ ফিরিয়ে দেবে।

আমরা চেষ্টা করি যত দ্রুত সম্ভব নামাজটা পড়ে শেষ করে দায়মুক্ত হতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নামাজ আর ইবাদত কি সত্যিই আমাদের জন্য কোনো বোঝা?

১. ভাবনাটা একটু বদলে নেওয়া দরকার

কেন আমাদের কাছে ইবাদত অনেক সময় কঠিন মনে হয়? কাজের ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়ার জন্য আমরা যতখানি মনোযোগ দিই, ইবাদতের বেলায় অতখানি দিতে পারি না। কেন এমন হয়? কারণ সংসারের কাজের ফল আমরা সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পাই, আর ইবাদতের সুফল বা মানসিক শান্তিটা আমরা চট করে চোখে দেখতে পাই না।

তাই প্রথমেই আমাদের চিন্তাভাবনাটা একটু বদলে ফেলতে হবে। নামাজ কেন পড়ি? কেবল হুকুম মানার জন্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই মহান আল্লাহ এটি দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, নামাজ মানুষকে অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)

অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, দিন ও রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করো, নিশ্চয়ই ভালো কাজ খারাপ কাজকে দূর করে দেয়। (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৪)

দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আসলে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা কেন এই পৃথিবীতে এসেছি। মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য। (সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)

এই সহজ কথাটা মনে লালন করতে পারলে নামাজকে আর কোনো কঠিন দায়িত্ব মনে হবে না। সারাদিনের বিশৃঙ্খলা ও মানসিক চাপের মধ্যে নামাজ আমাদের মনকে এনে দেবে অদ্ভুত এক শান্তি ও স্থৈর্য। তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোকেই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা বলে মনে করবে।

একটি চিকেন রোল কেনা কীভাবে ইবাদত হতে পারে

২. মনকে এক জায়গায় আনা

আমাদের জীবনটা এখন এমন হয়ে গেছে যে, আমাদের মন কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকে না। মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, নানা চিন্তা—সব মিলিয়ে মন অলস বসে থাকার সুযোগ পায় না।

এমনকি যখন আমরা নামাজে দাঁড়াই, তখনও মাথার ভেতরে সংসারের নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। ফলে রুকু-সেজদা তো আমরা করি ঠিকই, কিন্তু অন্তরে আল্লাহর সঙ্গে সেই গভীর যোগাযোগটা তৈরি হয় না।

এই যান্ত্রিকতা দূর করার সহজ উপায় হলো সেজদা। সেজদাই হলো মানুষের জন্য তার স্রষ্টার সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার সময়। রাসুল (সা.) বলেছেন, বান্দা সেজদার অবস্থাতেই তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছায়, তাই তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া কোরো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)

সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২বান্দা সেজদার অবস্থাতেই তার রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছায়, তাই তোমরা সেজদায় বেশি বেশি দোয়া কোরো।

তাই নামাজে সেজদার সময় তাড়াহুড়ো না করে কিছুটা বেশি সময় থাকুন। নিজের মনের সব কথা ও অনুভূতি নীরব ভাষায় আল্লাহর কাছে খুলে বলুন। সেজদার এই কয়েকটা মুহূর্তই আপনার নামাজকে একটি নিয়মমাফিক অভ্যাসের বদলে হৃদয়ের সুগভীর ভালোবাসায় বদলে দেবে।

৩. সংসারের দায়িত্বও তো ইবাদত

ইবাদতকে গুরুত্ব দেওয়ার মানে কিন্তু এই নয় যে আপনি সংসারের কাজ বা অন্যান্য দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। ইসলাম আমাদের কাজ ফেলে ঘরকুনো হয়ে বসে থাকতে বলে না। পরিবার, সন্তান, মা-বাবা কিংবা সহকর্মীদের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।

সত্যি বলতে কি, সঠিক নিয়তে পরিবারের যত্ন নেওয়া বা নিজের দায়িত্ব পালন করাও এক ধরনের ইবাদত। মহানবী (সা.) বলেছেন, একজন মুমিন যা ভালো কাজ করে এবং পরিবারের জন্য যে খরচ করে, সেটাও তার জন্য সদকা বা ইবাদত হিসেবে লেখা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫)

কাজের পাশাপাশি যদি অন্তরে এই চিন্তা থাকে যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাজগুলো করছি, তবে আপনার পুরো দিনটাই ইবাদতে পরিণত হবে। প্রতিদিন সকালে কাজের শুরুতেই মনে মনে আল্লাহকে স্মরণের নিয়ত করে নিন।

কাজের চাপে মন যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন আবার নতুন করে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন। ইবাদত জীবন থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং সুন্দর জীবনযাপনেরই পথ।

ভ্রমণ যখন ইবাদত হয়

৪. নিজের সাধ্য জানা ও মধ্যপন্থা

আত্মিক উন্নতির পথে আরেকটি বড় বাধা হলো নিজের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করতে যাওয়া। ধর্মের ক্ষেত্রে সবার ক্ষমতা সমান নয়। ইসলাম মানুষের ওপর অসাধ্য কিছু চাপিয়ে দেয় না। যেমন, কারও যদি নফল রোজা রাখা সহজ মনে হয়, তবে তিনি রোজা রাখতে পারেন।

কিন্তু যদি রোজা রাখলে শরীর বেশি খারাপ হয়ে যায় বা দৈনন্দিন কাজে বড় ব্যাঘাত ঘটে, তবে নিজেকে জোর না করে অন্য কোনো আমল বেছে নেওয়া উচিত। 

আপনি সাধ্যমতো দান-সদকা করতে পারেন, রাতে একটু তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন কিংবা আল্লাহর রাসুলের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে পারেন।

মহানবী (সা.) ইবাদতের ব্যাপারে সবসময় সহজ পথ ও মধ্যপন্থা বেছে নিতে বলেছেন। তিনি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি ধর্মের ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা করে, ধর্ম তার ওপর বিজয়ী হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯)

তাই নিজের শরীর ও মনকে জানুন। আপনার জন্য যে আমলটি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়, সেটির মাধ্যমেই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করুন।

ক্লান্তি আর ব্যস্ততায় ভরা জীবনে ইবাদতকে যদি একটু বিরতি ও শান্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে তা আমাদের মন ও জীবনের গতি পুরোটাই বদলে দেবে।

৫. কারো তুলনা নয়, নিজের উন্নয়ন

ইবাদতকে দীর্ঘস্থায়ী ও আনন্দময় রাখার শেষ উপায় হলো, নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা না করা। কে কত বেশি নামাজ পড়ছে বা কে কতটা ইবাদত করছে, তা দেখে নিজের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করা ঠিক নয়। প্রত্যেকের পরিস্থিতি ও শক্তি আলাদা।

অন্যের দেখাদেখি হঠাৎ এমন কোনো কঠিন কাজ শুরু করা উচিত নয়, যা পরে ধরে রাখা যায় না। বরং নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে আজকের অবস্থার তুলনা করুন।

যেমন—আপনি যদি এখন প্রতিদিন কোরআনের একটি পৃষ্ঠা পড়েন, তবে আস্তে আস্তে তা বাড়িয়ে দুটি পৃষ্ঠা করার চেষ্টা করুন। সেই নিয়মটি নিজের অভ্যাসে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত সেটুকুই ধরে রাখুন।

ইসলামে খুব বেশি আমল একবারে করার চেয়ে নিয়মিত ছোট ছোট আমল করাকে বেশি পছন্দ করা হয়েছে। নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি উত্তরে বললেন, যে আমল নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)

সাধ্যের বেশি করতে গেলে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সব আমল একবারে ছেড়ে দেয়। তাই নিজেকে সময় দিন এবং অল্প হলেও নিয়মিত ইবাদত চালিয়ে যান।

পরিশেষে বলা যায়, ইবাদত কোনো যান্ত্রিক শারীরিক অভ্যাস নয়, এটি হলো স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার এক মধুর আত্মিক সম্পর্ক। ক্লান্তি আর ব্যস্ততায় ভরা জীবনে ইবাদতকে যদি একটু বিরতি ও শান্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে তা আমাদের মন ও জীবনের গতি পুরোটাই বদলে দেবে।

মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজ কেন ইবাদত

Read full story at source