ওসি শাসিয়েছেন ঠিকই, তবে শিক্ষার্থীদের নয়
· Prothom Alo

এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শাসাচ্ছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা।
Visit mchezo.life for more information.
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
একই ক্যাপশনে ভিডিও ক্লিপটি ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে। শতাধিক পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে ভিডিওটি এই দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
কোলাজ : প্রথম আলোভিডিও দেখে অনেকে পুলিশের সমালোচনা করছেন। শিক্ষার্থীদের এভাবে হুমকি দেওয়ার অধিকার পুলিশের কোনো ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসির নেই, এমন মন্তব্য করছেন তাঁরা।
যাচাইয়ে ভিডিওটির ওপরে ডান কোণে ‘my chandina, আমার চান্দিনা আমার অহংকার’ লেখাটি দেখা যায়।
এই কি–ওয়ার্ডে সার্চ করলে একটি ‘My Chandina’ নামে একটি পেজ পাওয়া যায়, যার অনুসারীর সংখ্যা ৪৩ হাজার। পেজটি পর্যালোচনা করে মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়, যা প্রকাশ হয়েছে গত ২৬ মে। ওই ভিডিওটি ৪৮ সেকেন্ডের হলেও এখন ছড়ানো ২৫ সেকেন্ডের ভিডিওর পুরোটি তাতে পাওয়া যায়।
লিংক: এখানে
প্রাসঙ্গিক কি–ওয়ার্ড সার্চ করে ‘সড়ক সংস্কারের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবরোধ’ শিরোনামে সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়। তাতে জানা যায়, এই ঘটনা ২৬ মে কুমিল্লার দাউদকান্দির। গৌরীপুর-পেন্নাই-মতলব–বাবুরহাট সড়ক সংস্কারের দাবিতে সেদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন গাড়িচালক ও স্থানীয় ব্যক্তিরা। দাউদকান্দির গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে ‘সচেতন এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী জনতা’ ব্যানারে সেই কর্মসূচির কারণে ঈদের আগে মহাসড়কে জনভোগান্তি তৈরি হলে পুলিশ গিয়ে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেয়।
লিংক: এখানে
সেই ঘটনা নিয়ে দাউদকান্দি মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম আজ শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, গাড়িচালকেরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গৌরীপুর অংশ অবরোধ করেছিলেন সেদিন। খবর পেয়ে দাউদকান্দির সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেদওয়ান ইসলাম, কুমিল্লার সহকারী পুলিশ সুপার (দাউদকান্দি-চান্দিনা সার্কেল) মো. খলিলুর রহমান এবং দাউদকান্দি মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্সকর্তা (ওসি) মো. আবদুল বারী ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তখন অবরোধকারীরা মহাসড়ক ছেড়ে যান।
পুলিশ কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম বলেন, পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের গৌরীপুর কার্যালয়ের সামনে আবার অবরোধ করলে তৎকালীন ওসি আবদুল বারীসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সেখানে যান। সড়ক সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করার আশ্বাস দেওয়ার পর আন্দোলনকারীরা অবরোধ তুলে নেন।
স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান, সেদিন অবরোধকারীদের শাসিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল বারী।
এই ঘটনাটি দেড় মাস আগের। বৃষ্টির কারণে এইচএসসির কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় এক সপ্তাহ আগে ১৪ জুলাই। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।
আরও ভিডিও ও ছবিতে বিভ্রান্তি
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে ৬ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। তাতে দেখা যায়, আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থী চড়াও হয়েছেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তির ওপর। তাঁকে লাথি মারছেন একজন শিক্ষার্থী। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা, ‘আন্দোলনকারী এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মারধরের শিকার পথচারী’।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
একই রকম ক্যাপশনে তিন শ পেজ, পাবলিক গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো পোস্টে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পরিচয় দেওয়া হচ্ছে অটোরিকশাচালক। নির্যাতনকারী শিক্ষার্থীদের সমালোচনা হচ্ছে, তাঁদের আইনের আওতায় আনার কথাও বলছেন কেউ কেউ।
কোলাজ : প্রথম আলোপ্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
ভিডিওটির কি ফ্রেম এবং প্রাসঙ্গিক কি ওয়ার্ড সার্চ করে বগুড়া সদর নিউজ ও ময়না টিভি নামে দুটি ফেসবুক পেজে ১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের ভিডিওটি পাওয়া যায়। আরও একাধিক অ্যাকাউন্টেও রয়েছে ভিডিওটি। তার ক্যাপশনে লেখা, ‘ভ্যানিটিব্যাগে হাত, মোবাইল উধাও—হাতেনাতে ধরা পড়েও অস্বীকার পকেটমারের!’
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক
ভিডিওতে মারধরের শিকার ব্যক্তিকে বক্তব্যও দিতে দেখা যায়। পুলিশের ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিও রয়েছেন সেই ভিডিওতে।
কোলাজ : প্রথম আলোবগুড়া সদর নিউজের পেজের দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করা হলে পেজটির অ্যাডমিন আমিনুর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আলী হায়দার মিঠু নামে একজন সাংবাদিকের করা ভিডিও এটা। তাঁর করা ভিডিওটি ১৩ জুলাই নিজেদের পেজে পোস্ট করেন তাঁরা।
আলী হায়দার মিঠু প্রথম আলোকে জানান, বগুড়া শহরের সাতমাথা এলাকায় ১৩ জুলাই এক নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল তুলে নেওয়ার পর ওই ব্যক্তি ধরা পড়েছিলেন। তখন মারধরের শিকান হন ওই ব্যক্তি।
এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বগুড়ায়ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়েছিল। তবে তা ১৪ জুলাই। ওই ব্যক্তিকে মারধরের ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের দেখা গেলেও তার সঙ্গে চলমান আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সৈনিক’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি ছবি পোস্ট করা হয়। ছবিতে দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থীর হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা রয়েছে, ‘শেখ হাসিনাকে আমরা আবার চাই।’
লিংক: এখানে
২০২৪ সালে ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেশে মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে তিনি এখনো সেখানে রয়েছেন। সম্প্রতি তিনি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা জানান। তার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে এই ছবি ছড়ানো হচ্ছে।
যাচাইয়ে প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে ১৫ জুলাই প্রকাশিত পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের একাধিক ছবি পাওয়া যায়। সেখানে একই ফ্রেমের মূল ছবিতে শিক্ষার্থীর হাতে এমন কোনো প্ল্যাকার্ড দেখা যায়নি।
লিংক: এখানে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একাধিক প্ল্যাটফর্মে মূল ছবিটি পাওয়া যায়, তবে কোথাও এ রকম প্ল্যাকার্ড দেখা যায়নি।
অধিকতর যাচাইয়ে ইমেজ হুইস্পারারসহ এআই শনাক্তকারী টুলে ছবিটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, ছবির প্ল্যাকার্ডের অংশটি ডিজিটালি সম্পাদনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ মূল ছবিতে শিক্ষার্থীদের হাতে কোনো প্ল্যাকার্ড না থাকলেও সম্পাদনা করে এতে প্ল্যাকার্ডটি জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা করেছেন বগুড়ায় প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক এবং কুমিল্লার দাউদকান্দি প্রতিনিধি