ড্রপশিপিং ব্যবসা: মালিক না হয়ে পণ্য বিক্রি কি বৈধ
· Prothom Alo

একজন তরুণ অনলাইনে মুঠোফোনের কভার বিক্রি করছেন। তাঁর কোনো দোকান নেই, গুদাম নেই, এমনকি একটা কভারও তাঁর হাতে নেই। তিনি চীনের একটি পাইকারি ওয়েবসাইট থেকে ছবি নামিয়ে নিজের ফেসবুক পেজে দিয়েছেন।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
কেউ অর্ডার করলে সেই টাকা থেকে নিজের লাভটুকু রেখে বাকিটা পাইকারকে পাঠিয়ে দেন। পাইকার সরাসরি ক্রেতার ঠিকানায় পণ্য পাঠায়।
এটাই ড্রপশিপিং। পুঁজি ছাড়া ব্যবসার এই মডেল তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। ফলে ইসলামি ফিকহের একটি পুরোনো প্রশ্ন এখানে নতুনভাবে সামনে আসছে—যে পণ্য আপনার হাতে নেই, এমনকি আপনার মালিকানায়ও নেই, সেটা বিক্রি করা কি বৈধ?
একটি পুরোনো প্রশ্ন
প্রশ্নটা নতুন নয়। রাসুলের যুগেও এ ধরনের লেনদেন হতো। সাহাবি হাকিম ইবনে হিজাম একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেউ যদি এমন পণ্য কিনতে চান যা তাঁর কাছে নেই, তিনি কি সেটা বিক্রি করে পরে বাজার থেকে কিনে দিতে পারবেন?
নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘যা তোমার কাছে নেই, তা বিক্রি কোরো না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২৩২)
আরেকটি হাদিসে এসেছে, পণ্য নিজের নিয়ন্ত্রণে আসার আগে তা আবার বিক্রি করা নিষেধ। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৩৫)
ফিকহের পরিভাষায় এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হলো ‘গারার;—অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকি। পণ্যটি আসলে আসবে কি না, গুণমান ঠিক থাকবে কি না, সময়মতো পৌঁছাবে কি না—এই অনিশ্চয়তা ক্রেতার জন্য ন্যায্য নয়।
ব্যবসায় যে ১০ কাজ নিষিদ্ধ করেছে ইসলামড্রপশিপিংয়ের সাধারণ মডেলে ঠিক এই সমস্যাই আছে। বিক্রেতা এমন পণ্য বিক্রি করছেন, যা তাঁর মালিকানায় নেই, নিয়ন্ত্রণেও নেই। সরবরাহকারী পণ্য পাঠাবে কি না, কখন পাঠাবে, কী অবস্থায় পাঠাবে—এর কোনো নিশ্চয়তা তাঁর কাছে নেই।
তবে এখানে একটা কথা বলা দরকার। ফিকহবিদদের মধ্যে এই প্রশ্নে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন, আধুনিক ড্রপশিপিং সরাসরি এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না। কারণ, আজকের ব্যবসায়িক কাঠামো ভিন্ন।
কিন্তু অধিকাংশ সমসাময়িক ফিকহবিদ, বিশেষত ওআইসি ফিকহ একাডেমি, মনে করেন, প্রচলিত মডেলে গারারের সমস্যা থেকে যায় এবং এটি সংশোধন করা দরকার।
বৈধ করার দুটি পথ
ইসলামি অর্থনীতির আলেমরা ড্রপশিপিংকে শরিয়তসম্মত করার দুটি বাস্তব পথ দেখিয়েছেন।
প্রথমটি হলো ওকালত বা প্রতিনিধিত্বের মডেল। এই পদ্ধতিতে ড্রপশিপার নিজেকে স্বাধীন বিক্রেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন না। তিনি ক্রেতাকে স্পষ্ট বলেন, পণ্যটি অমুক কোম্পানির, আমি তাদের প্রতিনিধি হিসেবে অর্ডার বুক করে দিচ্ছি, এর বিনিময়ে একটি কমিশন পাচ্ছি।
এই স্বচ্ছতা থাকলে লেনদেন বৈধ। কারণ, প্রতারণার উপাদান নেই। ইমাম মারগিনানি ওকালতের বিস্তারিত বিধান আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, প্রতিনিধি যদি তাঁর অবস্থান স্পষ্ট রাখেন এবং মূল মালিকের পক্ষে কাজ করেন, তাহলে এই চুক্তি পুরোপুরি বৈধ। (মারগিনানি, আল-হেদায়া, ৩/২৬৭, করাচি)
অনলাইন ক্যাটালগ ও ই-কমার্সের শরিয়া দৃষ্টিকোণদ্বিতীয় পথটি হলো বাইউস সালাম বা অগ্রিম চুক্তির মডেল। ইসলামে সালাম একটি বিশেষ ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি, যেখানে ক্রেতা আগে পুরো মূল্য পরিশোধ করেন এবং বিক্রেতা নির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট পণ্য সরবরাহের দায়িত্ব নেন।
এই পদ্ধতিতে ড্রপশিপিং করা যায় যদি পণ্যের বিবরণ, গুণমান, পরিমাণ ও ডেলিভারির সময় একদম স্পষ্টভাবে আগেই জানানো হয় এবং পণ্যে কোনো ত্রুটি হলে সেই দায় বিক্রেতা নিজে নেন।
কোরআনে সালাম বা অগ্রমী চুক্তির বৈধতা স্বীকৃত হয়েছে, ‘যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮২)
ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এটি সালাম চুক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করে। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ১/৭২৪, বৈরুত)
মূল প্রশ্নটা স্বচ্ছতার
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
ব্যবসা হালাল, কিন্তু সব ব্যবসার কাঠামো এক নয়। ইসলামি ফিকহে ব্যবসার বৈধতার মূল শর্ত হলো তিনটি:
পণ্যের অস্তিত্ব বা সুনির্দিষ্ট বিবরণ থাকতে হবে
মূল্য নির্ধারিত থাকতে হবে
অনিশ্চয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকতে হবে
ড্রপশিপিং নিজে কোনো পাপ নয়। কিন্তু যে মডেলে ক্রেতা জানেন না পণ্যটি আসলে কোথা থেকে আসছে, বিক্রেতার কোনো দায়িত্ব নেই এবং পণ্যের গুণমানের কোনো নিশ্চয়তা নেই—সেই মডেল শরিয়তের স্বচ্ছতার দাবি পূরণ করে না।
চোরাই পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ইসলামের বিধান