অভয়নগরে বিল ভরাট করায় দুই শতাধিক পরিবার দেড় মাস ধরে পানিবন্দী

· Prothom Alo

যশোরের অভয়নগরের প্রেমবাগ ইউনিয়নের চেঙ্গুটিয়া গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার দেড় মাস ধরে পানিবন্দী হয়ে আছে। প্রেমবাগ ইউনিয়নে অবস্থিত যশোর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বিল ভরাট করায় পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। সেই সঙ্গে পাশের তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পানিতে ছড়িয়ে পড়ায় দুর্গন্ধে এলাকার সহস্রাধিক মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ২ জুলাই বিকেলে চেঙ্গুটিয়া গ্রাম ঘুরে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

চেঙ্গুটিয়া গ্রামের পানিনিষ্কাশনের দাবিতে ভুক্তভোগী কয়েক শ নারী-পুরুষ গত শুক্রবার বিকেলে চেঙ্গুটিয়া বুড়োর দোকান এলাকায় যশোর-খুলনা মহাসড়ক দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন।

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ইপিজেডের জন্য বিল ভরাট করায় এলাকার পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় গ্রামের দুই শতাধিক বাড়িতে বৃষ্টির পানি উঠেছে। বৃষ্টি হলে পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় এলাকার অনেক জায়গায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। এলাকার মসজিদ, কবরস্থান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে আছে। রান্নাঘর, শৌচাগার ও নলকূপ পানিতে তলিয়ে থাকায় খাওয়াদাওয়া, সুপেয় পানি ও পয়োনিষ্কাশনে ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। পাশের মজুমদার ফুড প্রোডাক্টস, মজুমদার অ্যাগ্রো ফুড প্রোডাক্টস ও মজুমদার ব্র্যান অয়েল ফ্যাক্টরির বর্জ্য পানিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে পানি হয়েছে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। শরীরে দূষিত পানি লেগে চুলকানি, ঘা-পাঁচড়া ও বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।

গ্রামের কলেজশিক্ষক রফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘মজুমদারের মিলের পাশ দিয়ে যাওয়া খাল দিয়ে এই এলাকার পানি বিলে যেত। কিন্তু ইপিজেড করার জন্য বিল ভরাট করা হয়েছে। এ জন্য পানিনিষ্কাশন হচ্ছে না। পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আমার উঠানে প্রায় হাঁটুপানি। ঘরের মধ্যেও পানি ঢুকেছে। জীবনযাপন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।’

গ্রামের কৃষক ইয়ার আলী (৫০) বলেন, দেড় মাস ধরে উঠানে হাঁটুসমান পানি। আর ঘরের মধ্যে পানি ওঠার মতো অবস্থা। রাস্তায় উঠলে কাপড় বাঁচানোর মতো অবস্থা নেই। এক ফোঁটাও পানি বের হচ্ছে না। এবার বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি উঠে যাবে।

পরনের লুঙ্গি উঁচু করে বেঁধে পানিতে ডুবে থাকা সড়ক দিয়ে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছিলেন গ্রামের কাঠমিস্ত্রি যুবক বিল্লাল হোসেন। তাঁর ভাষ্য, ঘর থেকে নামলেই পানি। পানিতে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। দেড় মাস ধরে খুব কষ্টে আছেন। যেন দেখার কেউ নেই।

গামছা পরে থলের মধ্যে প্যান্ট ও স্যান্ডেল রেখে সেই থলে হাতের কবজিতে ঝুলিয়ে সড়কের পানি ভেঙে হেঁটে কিছুটা দূরের উঁচু সড়কে ওঠার জন্য যাচ্ছিলেন ভ্যানচালক মনিরুল ইসলাম (৩৫)। তাঁর শরীর চুলকানিতে ভরে গেছে। হাত-পায়ে চুলকানির দাগ দেখিয়ে মনিরুল বললেন, ঘরে পানি, উঠানে পানি। পানি থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। পানি শরীরে লাগলে চুলকানি ও ঘা-পাঁচড়া হচ্ছে। রান্না-খাওয়া, বাথরুমে যাওয়া সবকিছুতে খুব সমস্যা হচ্ছে। টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভালো খাওয়ার পানিও পাচ্ছেন না।

গ্রামের কৃষক আবদুল ওহাব বলেন, ইপিজেড স্থাপনের আগে গ্রামের পানি আটকে থাকত না। ছোট একটি খাল ছিল। এই খাল দিয়ে চেঙ্গুটিয়াসহ আশপাশের গ্রামের পানি বের হয়ে বিলে গিয়ে পড়ত। কিন্তু ইপিজেড করার জন্য বিল ভরাট করা হয়েছে। গ্রামের পানি সরানোর জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে বৃষ্টির পানি আটকে গেছে। পানিতে গ্রামের বাড়িঘর, মসজিদ, কবরস্থান, রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে।

মো. ইউসুফ পাশা, যশোর ইপিজেড স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকবিল ভরাট করার কারণে পানি আর বিলে যেতে পারছে না। এ জন্য চেঙ্গুটিয়া এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার ব্যাপারে জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছেন।

দ্রুত পানি সরানোর ব্যবস্থা না করা হলে আবার যশোর-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন চেঙ্গুটিয়া গ্রামের কৃষক কামরুল হুদা।

অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ সালাউদ্দীন দিপু বলেন, ‘চেঙ্গুটিয়া গ্রামের পাশ দিয়ে নওয়াপাড়া পৌরসভার একটি ড্রেন আছে। চেঙ্গুটিয়া গ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রথম থেকেই আমরা ড্রেনটি পরিষ্কার রাখছি। এ ছাড়া ড্রেনের মধ্যে পাইপ বসিয়ে সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে পানি পাশের ভৈরব নদে নিষ্কাশনের চেষ্টা করছি। কিন্তু সেটা খুব বেশি কার্যকর হচ্ছে না। স্থায়ী সমাধানের জন্য আমরা ইপিজেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করছি।’

যশোর ইপিজেড স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. ইউসুফ পাশা বলেন, আগে এলাকার পানি বিলে যেত। বিল ভরাট করার কারণে পানি আর বিলে যেতে পারছে না। এ জন্য চেঙ্গুটিয়া এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার ব্যাপারে জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছেন। এ নিয়ে গত ৩০ জুন প্রজেক্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত পানি সরানোর জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Read full story at source