তওবা কবুলের ৪ শর্ত
· Prothom Alo

পাপ মৌলিকভাবে দুই প্রকার। এক. আল্লাহর হক–সম্পর্কিত গুনাহ, যেমন নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। দুই. বান্দার হক–সম্পর্কিত গুনাহ, যেমন কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, গিবত করা, অপবাদ দেওয়া ইত্যাদি।
পাপ যদি আল্লাহর হক–সংক্রান্ত হয় এবং তাতে মানুষের হকের সম্পৃক্ততা না থাকে, তবে এ ক্ষেত্রে তওবা কবুলের জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। এক. কাজটি ছেড়ে দেওয়া, দুই. তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং তিন. ভবিষ্যতে কখনো না করার দৃঢ় সংকল্প করা। এই তিন শর্তের কোনো একটি পূরণ না হলে তওবা সঠিক হয় না।
Visit extonnews.click for more information.
আর বান্দার হক–সংক্রান্ত পাপ হলে তা থেকে তওবা করার জন্য চারটি শর্ত। ওপরের তিনটি আর চতুর্থ শর্ত হলো, যার হক নষ্ট করা হয়েছে তার পক্ষ থেকে দায়মুক্ত হওয়া। (ইমাম নববি, কিতাবুত তওবা, শরহে মুসলিম, ১৭/৫৯)
১. পাপের অভ্যাস ত্যাগ করা
যে পাপ থেকে তওবা করা হবে, প্রথমে সে কাজটি ছাড়তে হবে। যেমন নামাজ না পড়ার পাপ থেকে তওবা করতে হলে প্রথমে নামাজ পড়া শুরু করে দিতে হবে। পাপ না ছেড়ে তওবা করলে সেই তওবার কোনো সার্থকতা নেই।
পাপ করতে থাকলাম আবার তওবাও করলাম, এটা একটা তামাশা। বরং এটাও এক গুরুতর পাপ।
কেননা তওবা করা মানে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া; যা পাপকর্ম ছেড়ে দিয়েই করতে হয়। নয়তো তা একধরনের ধৃষ্টতা। এটা মানে সে পাপকে প্রকৃতপক্ষে কোনো অপরাধই মনে করে না। এরূপ তওবার জন্য নতুন করে তওবা করা উচিত।
তওবা করার সময় যদি মনে এই ধারণা থাকে যে সুযোগ হলে আবারও এই কাজ করব, তবে তা আদৌ তওবা বলে বিবেচ্য হবে না এবং আল্লাহর কাছে তা কবুলও হবে না।‘তাকওয়া’ কী এবং ‘মুত্তাকি’ অর্থ কী
২. অনুতপ্ত হওয়া
তওবার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এটি। অনুতপ্ত হওয়ার অর্থ অন্তরে এই ভাব জন্মানো যে আমি বাস্তবেই ভুল করেছি। এই কাজ করা আমার জন্য কিছুতেই উচিত হয়নি। আল্লাহ ক্ষমা না করলে তো আমাকে এ জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
অন্তরে এই অনুভূতি জন্মালে তবেই সে তওবা খাঁটি তওবা হয় এবং প্রমাণ হয় যে সে খাঁটি মনে তওবা করেছে। তওবা যেহেতু একটি আমল, তা কবুল হওয়ার জন্যও খাঁটি মন থাকা জরুরি। নয়তো এটা একটা লোকদেখানো হয়, আল্লাহ–তাআলার কাছে যার কোনো মূল্য নেই।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘অনুতপ্ত হওয়াই তওবা’। (সুনানে ইবনে মাজাহ হাদিস: ৪২৫২)
৩. ভবিষ্যতে না করার অঙ্গীকার
তওবা করার সময় যদি মনে এই ধারণা থাকে যে সুযোগ হলে আবারও এই কাজ করব, তবে তা আদৌ তওবা বলে বিবেচ্য হবে না এবং আল্লাহর কাছে তা কবুলও হবে না।
হ্যাঁ এটা সম্ভব যে ভবিষ্যতে সেই পাপ আর করবে না ভেবেই তওবা করেছে, পরে নফস ও শয়তানের প্ররোচনায় পুনরায় একই পাপ করেছে। এটা তওবার পরিপন্থী নয়। এরূপ ক্ষেত্রে কর্তব্য আবারও তওবা করা।
এভাবে পুনরায় পাপ না করার প্রতিশ্রুতিতে যদি বারবার তওবা করা হয় এবং প্রতিবারই তওবার পরে একই পাপ হয়ে যায়, তবে এ কারণে তার তওবা নিরর্থক গণ্য হবে না। বরং আন্তরিক অনুশোচনার সঙ্গে বারবার তওবা করা আল্লাহ–অভিমুখিতার পরিচায়ক।
তওবা করেও কেন আমরা একই পাপে ফিরে যাইঅর্থ-সম্পদ জাতীয় হক নষ্ট করলে তা তাকে ফেরত দিতে হবে। পাওনাদার মারা গেলে তার ওয়ারিশদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে।
৪. অন্যের হক থেকে দায়মুক্তি
অন্যের হক–সম্পর্কিত পাপ থেকে তওবার জন্য শর্ত হলো, প্রথমে তার পক্ষ থেকে দায়মুক্ত হওয়া। এটি খুবই কঠিন। কেননা, আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল। তিনি চাইলে যেকোনো পাপ মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তির ব্যাপারটা ভিন্ন। কারও হক নষ্ট করলে সে তা মাফ নাও করতে পারে।
তাই এমনও হতে পারে মাফ চাওয়ার সুযোগই হয়নি, তার আগে সে মারা গেল। এ কারণেই অন্যরে হকের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। কারও হক নষ্ট করলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা আদায় করে তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত।
দায়মুক্ত হওয়ার উপায় একেক অবস্থায় একেক রকম।
১. অর্থ-সম্পদ জাতীয় হক নষ্ট করলে তা তাকে ফেরত দিতে হবে। পাওনাদার মারা গেলে তার ওয়ারিশদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। আর যদি কোনো ওয়ারিশ না পাওয়া যায় তবে তার নামে তা সদকা করে দিতে হবে।
২. সরকারি সম্পদ হলে সরকারের কোনো তহবিলে জমা দিতে হবে।
৩. যদি অন্য কোনো হক হয়, যেমন কাউকে অন্যায়ভাবে মারধর করে তার হক নষ্ট করা, কাউকে গালমন্দ করে বা কারও নামে অপবাদ ছড়িয়ে তার ইজ্জত-সম্মান হক নষ্ট করা ইত্যাদি। তাহলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। যদি সে মারা গিয়ে থাকে, তবে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
মাহমুদ হাসান ফাহিম : লেখক ও শিক্ষক