ইলন মাস্ক ও টিম কুকের মাঝখানে বসা কে এই চীনা নারী
· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরের একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, খাবার টেবিলে বিশ্বের শীর্ষ ধনী, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক ও অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুকের মাঝখানের চেয়ারে বসে রয়েছেন একজন চীনা নারী। মধ্য পঞ্চাশের এই নারীকে নিয়ে অনেকের আগ্রহের মূল কারণ, নেট দুনিয়ায় তিনি মোটেই খুব পরিচিত নন।
Visit newssport.cv for more information.
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি চীন সফর করেন। তাঁর সফরসঙ্গীদের বড় অংশই ছিলেন প্রযুক্তি দুনিয়ার রথী-মহারথীরা। সফরকালীন সময়ে একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভার ছবি বর্তমানে নেট দুনিয়ার আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
ইলন মাস্ক ও অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুকের মাঝখানের বসা চীনা নারীকে নিয়ে চলছে আলোচনাছবিতে দেখা যাচ্ছে, খাবার টেবিলে বিশ্বের শীর্ষ ধনী, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক ও অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুকের মাঝখানের চেয়ারে বসে রয়েছেন একজন চীনা নারী। মধ্য পঞ্চাশের এই নারীকে নিয়ে অনেকের আগ্রহের মূল কারণ, নেট দুনিয়ায় তিনি মোটেই খুব পরিচিত নন। অথচ নিজ প্রচেষ্টায় বিলিয়নিয়ার হওয়া চীনের শীর্ষ নারীদের একজন এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তাকে ঘিরে রয়েছে এক অসাধারণ গল্প।
ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেকের মতো আমারও আগ্রহ হলো ইলন মাস্ক ও টিম কুকের মাঝখানে বসা নারীটি সম্পর্কে জানার। কৌতূহলবশত ছবিটি চ্যাটজিপিটিকে দেখালাম। তার উত্তর শুনে আমি আরও অবাক হলাম-
“I can’t identify the woman in the image.”
তখনই বুঝলাম, প্রযুক্তি শিল্পে বিশাল প্রভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি নেট দুনিয়ায় খুব বেশি পরিচিত নন। একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে জানলাম, ভদ্রমহিলা চীনের লেন্স টেকনোলজি নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তার নাম জৌ চুয়েনফেই (Zhou Qunfei)। এরপর জানতে পারলাম তার অসাধারণ জীবনকাহিনী।
১৯৭০ সালে চীনের হুনান প্রদেশের একটি ছোট্ট গ্রামে তার জন্ম। সৈনিক পিতার তিন সন্তানের মধ্যে চুয়েনফেই ছিলেন সবার ছোট। তাঁর জন্মের আগেই তার বাবা একটি শিল্প দুর্ঘটনায় আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারান এবং একটি আঙুল হারিয়ে ফেলেন। তবে তিনি ছিলেন দক্ষ কারিগর। বাঁশের ঝুড়ি ও চেয়ার তৈরি এবং সাইকেল মেরামতের কাজ করে তিনি পরিবার চালাতেন। জৌ চুয়েনফেই-এর বয়স যখন পাঁচ, তখন তাঁর মা মারা যান।
জৌ ছোটবেলায় অন্যদের পশু চরাতেন, যাতে পরিবারকে সাহায্য করতে পারেন। ভাইবোনদের মধ্যে একমাত্র তিনিই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান এবং নিজেকে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত করে তোলেন। কিন্তু ১৬ বছর বয়সে তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। ফলে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এরপর তিনি তাঁর চাচার পরিবারে শেনজেন শহরে চলে যান এবং সেখানে একজন কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। শেনজেনে তিনি ঘড়ির কাঁচ পলিশ করার কারখানায় কাজ করেন। ইচ্ছে করেই তিনি এমন কারখানা বেছে নিতেন, যেগুলো শেনজেন ইউনিভার্সিটির কাছে, যাতে কাজের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে পারেন। দিনভর কাজ করে তিনি রাতের বেলা নিজে নিজে পড়াশোনা করতেন এবং পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন সার্টিফিকেট কোর্সে অংশ নিতেন। সেখানে তিনি অ্যাকাউন্টিং, কম্পিউটার অপারেশন ও কাস্টম প্রসেসিং বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। এমনকি তিনি বাণিজ্যিক যানবাহন চালানোর লাইসেন্সও নিয়েছিলেন।
জৌ একটা কিছু করবেন এই ভাবনা থেকে টাকা জমাতে শুরু করেন। প্রায় ২০ হাজার ইউয়ান জমার পর ভাই, বোন, ভগ্নিপতি ও ভাবিসহ পরিবারের আটজন সদস্যকে নিয়ে শেনজেনে একটি ছোট কারখানা শুরু করেন। সেখানে ঘড়ির কাঁচ প্রক্রিয়াজাত করা হতো। মেশিন মেরামত থেকে শুরু করে বিক্রির কাজ, সবই তিনি নিজ হাতে করতেন। এভাবে আরও চার বছর কঠোর পরিশ্রম করে এগিয়ে যান।
২০০০ সালের দিকে মোবাইল ফোন শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। সৌভাগ্যবশত তিনি টিসিএল ফোনের স্ক্রিন তৈরির একটি অর্ডার পান। মেধাবী জৌ বুঝতে পারেন মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের ব্যবসায় বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তখন তিনি ফোনের গ্লাস উৎপাদন, গবেষণা ও বিক্রিতে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান লেন্স টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করেন।
ফোনের গ্লাস উৎপাদন, গবেষণা ও বিক্রিতে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান লেন্স টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করেন জৌশুরুর দিকে তাঁরা মূলত দেশীয় ফোন ও নকল ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করতেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের কাজ পাওয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যান। বিদেশি কোম্পানিগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ ছিল অত্যন্ত কঠোর।
বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছে লেন্স টেকনোলজিমটোরোলা কোম্পানির চাহিদা পূরণ করতে তিনি নিজের প্রায় সব সম্পদ ঝুঁকিতে ফেলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মটোরোলার V3 মডেলের ফোনের স্ক্রিন তৈরির অর্ডার পান। V3 বিশ্বজুড়ে ১০ কোটিরও বেশি বিক্রি হয় এবং সেই সাফল্য লেন্সকে এই শিল্পের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যায়। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
এরপর আসে ২০০৭ সাল। তখন তিনি আরেকটি বড় সুযোগ পেয়ে যান। স্টিভ জবস আইফোনের জন্য এমন একটি টাচস্ক্রিন খুঁজছিলেন, যা তাঁকে তাঁর স্বপ্নের আইফোন তৈরি করতে সাহায্য করবে। খুঁতখুঁতে জবস জৌ-এর লেন্স টেকনোলজির খবর পান। নিখুঁত কারিগরি মান নিয়ে জৌ অ্যাপলের প্রকৌশলীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে ফার্স্ট জেনারেশন আইফোনের কাঁচের প্যানেলের ব্যাপক উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলোর সমাধান করেন। এর ফলে অ্যাপলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হয়।
জৌ অ্যাপলের প্রকৌশলীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে ফার্স্ট জেনারেশন আইফোনের কাঁচের প্যানেলের প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলোর সমাধান করেনপরে আইপ্যাড থেকে ম্যাকবুক পর্যন্ত প্রায় সব অ্যাপল পণ্যের কাঁচ ও সংশ্লিষ্ট উপাদান উৎপাদনে জৌ-এর কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে।
অ্যাপলের সঙ্গে কাজ করার কারণে প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জৌ-এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাঁর প্রতিষ্ঠান ইলন মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলার সাপ্লাই চেইনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানটি টেসলা গাড়ির ডিসপ্লে গ্লাস, স্মার্ট ককপিট কম্পোনেন্ট ও বিভিন্ন সূক্ষ্ম উপাদান সরবরাহ করে। ইলন মাস্কের ভবিষ্যতমুখী বৈদ্যুতিক গাড়ি ও রোবটিক্সভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্যোগের জন্য জৌ-এর কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়।
শূন্য থেকে একটি শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এবং কয়েক দশক পরে চীনের অন্যতম ধনী নারী উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন জৌএকজন মেয়ে, যিনি মাত্র জুনিয়র হাইস্কুল পর্যন্ত পড়ে ১৫-১৬ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই মেয়েটিই গ্রামীণ হুনান অঞ্চল থেকে উঠে এসে শূন্য থেকে একটি শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এবং কয়েক দশক পরে চীনের অন্যতম ধনী নারী উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন। ২০১৫ সালে তার কোম্পানি শেয়ারবাজারে যাওয়ার পর তাঁর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
তাই ইলন মাস্ক ও টিম কুকের মাঝখানে বসার জন্য জৌ চুয়েনফেই-এর চেয়ে বেশি যোগ্য আর কেই-বা হতে পারেন!
ছবি: ইন্সটাগ্রাম