ঝিরিপথে ফিরে দেখা মানুষ
· Prothom Alo

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
Visit turconews.click for more information.
জুলাই মাস, ২০২৩ সাল। আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে। তখন ছিল বর্ষাকাল। বর্ষাতেই সিলেট বেশি সুন্দর। অনেক দিন ছুটি থাকায় বান্ধবী আতিকা, মেঘ আর চৈতি ঘুরতে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠল। যদিও আড্ডার ফাঁকে মাঝে মাঝেই ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা হয়। কিন্তু পরে ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা টিউশনি—এই জন্য যাওয়া হয়ে ওঠে না।
হোয়াটসঅ্যাপে একটা গ্রুপ খুললাম ‘এখানে ঘোরাঘুরির প্ল্যান হয়’ নামে। প্রথম দিকে ১০–১২ জন ছিল। দিন যত এগিয়ে এল, শেষ পর্যন্ত এসে ৪ জন টিকল। শেষমেশ ১৫ জুলাই ঘুরতে যাওয়ার দিন স্থির হলো।
বেশ কিছুদিন ধরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে। সকালে রোদ আবার দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। একবার এক বন্ধু মজা করে বলেছিল, সিলেটের মেঘলা আকাশ আর মেয়েদের মন দুটিই নাকি বোঝা মুশকিল। যদিও তার কথা কিছুটা সত্যি বলা যায়। ঘুরতে যাওয়ার জন্য যে জায়গা ঠিক হলো, সেটা সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের উৎমাছড়া ও তুরঙচড়া। এটি মূলত হাইকিং স্পট। পাহাড়ঘেঁষা দুটি গ্রাম। অনেকটুকু রাস্তা হেঁটে তারপর যেতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থাও তেমন ভালো নয়। তার ওপর আমাদের মধ্যে চৈতি খুবই ভিতু। সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে, তাহলে সে যাবে না। কপাল ভালো ছিল বলে সেদিন সকালে তেমন বৃষ্টি ছিল না।
অটোরিকশা থেকে নেমে গন্তব্যে পৌঁছাতে গ্রামের ভেতর দিয়ে প্রায় মিনিট কুড়ি হাঁটতে হবে। হালকা হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। তবে ভয় ছিল কখন যেন আবার ঝড় ওঠে। আমরা চারজন হাঁটতে শুরু করলাম। খুঁজে খুঁজে চলে যাব। পথে কয়েকটি ছেলে একটা ছোট দিঘির কাছে মাছ ধরছিল। ডেকে জিজ্ঞেস করলাম কোন দিকে যাব। সামনে ছিল দুটি রাস্তা। একটা দিয়ে সচরাচর পর্যটকেরা গিয়ে থাকেন। অন্য পথটি খুব বেশি প্রচলিত নয়। ছেলেগুলোর মধ্য থেকে ১০-১২ বছরের দুটি ছেলে উঠে এল মাছ ধরা রেখে। তারা আমাদের গন্তব্যে নিয়ে যেতে চাইল।
অপ্রচলিত পথ ধরেই আমরা হাঁটা ধরলাম ছেলে দুটোকে অনুসরণ করতে করতে। চৈতির সন্দেহ হলো যে আমরা ঠিক পথে যাচ্ছি তো? ছেলেগুলোকে জিজ্ঞেস করায় তারা বলল এই পথ দিয়ে খুব বেশি কেউ যায় না। তবে এই পথ দিয়ে গেলে অনেক কিছু দেখতে পাব। ছোট্ট একটা ঝিরি আছে। একটু পরে গিয়েই দেখলাম সত্যিই রাস্তাটি অনেক সুন্দর। ঝিরির দুই পাশে খুবই সুন্দর অদ্ভুত রকমের নীল রঙের বনফুল!
ছেলে দুটির মধ্যে একজনের নাম জাহেদুল। এই গ্রামেই ওর বাড়ি। ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে হাঁটছি। কিছুক্ষণ পর জাহেদুল দৌড়ে গিয়ে তীরে তুলে রাখা একটা নৌকা থেকে দুটো বাঁশ নিয়ে এল। আমার হাতে একটা আর আতিকার হাতে একটা দিয়ে বলল, এগুলো নিয়ে হাঁটতে দেখেছে পর্যটকদের; ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগল আমার। ছেলেটা বেশ বুদ্ধিমান!
ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে হঠাৎ খেয়াল করলাম পানির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। জায়গাটি ছিল মূলত ভারতের মেঘালয় সীমান্ত থেকে নেমে আসা পাহাড়ঘেঁষা পাথুরে নদী। পাথরের বুক বেয়ে প্রবল স্রোতে পানি নেমে আসছে। পানির আওয়াজ অনেক দূর থেকেই শুনতে পেয়েছিলাম।
আকাশের অবস্থার আরও উন্নতি হয়েছে। কিছুটা রোদ উঠেছে। আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। এত সুন্দর স্বচ্ছ পানি দেখে আমরা দ্রুতই পানিতে নেমে গেলাম। জাহেদুল নদীর তীরে একটা বড় পাথরে বসে পড়ল। এদিকে আতিকা ছবি তুলতে মরিয়া। কিন্তু চারজনই তখন পানিতে ভিজে গেছি। তখন জাহেদুল বলল ও ছবি তুলে দিতে পারবে। ওর পাশেই ছিল আমাদের জিনিসপত্র। সেখান থেকে মোবাইল দিয়ে জাহেদুল আর তার সঙ্গের ছেলেটা আমাদের ছবি তুলে দিল। কিছুক্ষণ পরপর ওরা আমাদের দেখিয়ে দিল কোন ভঙ্গিতে ছবি তুললে সুন্দর হবে। বুঝলাম এখানে আসা পর্যটকদের কাছে থেকেই ওরা এসব শিখেছে।
একটু পরে স্থানীয় পর্যটন পুলিশ মাইকে ঘোষণা করল সবার জিনিসপত্র সাবধানে রাখতে। কারণ, এখানে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটে। শুনে চৈতি আমার দিকে তাকাল। আমরা তখন সাঁতরে অনেক দূরে চলে এসেছি। ছুটির দিন হওয়ায় পর্যটকদের অনেক ভিড় ছিল। তীরে উঠে জাহেদুলদের খুঁজে পাচ্ছি না। ওদের কাছে আমাদের মোবাইল, ব্যাগসহ যাবতীয় জিনিসপত্র। হঠাৎ মনের মধ্যে একটা সন্দেহের পোকা জেগে উঠল। ভাবলাম এভাবে বিশ্বাস করা হয়তো ঠিক হয়নি। সবার মুখে চিন্তার ছাপ। দুই–তিন মিনিট পরেই দেখি জাহেদুল আর ওই ছেলেটা প্রকৃতির ছবি তুলতে তুলতে আমাদের দিকে আসছে। আমার কাছে হঠাৎ মনে হলো আমাদের জিনিসপত্রগুলো পাওয়ার চেয়েও যেন মূল্যবান ছিল ওদের ফিরে আসা!
সন্ধ্যা নাম্বার আগেই আমরা ফিরব ভেবে অটোরিকশায় উঠলাম। আমাদের বিদায় দিতে ওরা দুজন দাঁড়িয়ে রইল। আবার কোনো এক বর্ষায় যাব সেখানে। হয়তো জাহেদুলদের খুঁজতে।
সানজিদা পাঠান, শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট