হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের যৌথ পরিকল্পনার দাবির পর বিপাকে ওমান
· Prothom Alo

ইরান হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ফি বসানোর পরিকল্পনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছে—এমনটি জানানোর পর ভূরাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়েছে উপসাগরীয় দেশটি।
এই বিরোধপূর্ণ জলপথের দক্ষিণ দিকে ওমানের মুসান্দাম ছিটমহল অবস্থিত। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এ পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ১০ সপ্তাহ ধরে এটি অবরুদ্ধ রয়েছে।
Visit turconews.click for more information.
যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলেছে, ইরানকে টোল দেওয়ার মাধ্যমে এ অবরোধের কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তাদের দাবি, ওমানও একই ধারণা পোষণ করে।
গতকাল শুক্রবার ভারতে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণভাবে ওমান ও ইরানের জলপথ বলে দাবি করেছেন।
আরাগচি আরও বলেন, ‘এ প্রণালি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। এর মাঝে কোনো আন্তর্জাতিক জলসীমা নেই।’
আরাগচি বলেন, প্রণালিটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে ইরান ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।
তবে ফি আদায়ের বিষয়ে এবং এ জলপথ দিয়ে যাওয়া সব জাহাজের পরিচয়ের তথ্য চাওয়া নিয়ে ইরানের পরিকল্পনার ব্যাপারে ওমান এখন পর্যন্ত নিশ্চুপ রয়েছে।
পশ্চিমা কূটনীতিকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনার জন্য ইরানের দেওয়া প্রস্তাবগুলো বেআইনি। কারণ, এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর টোল চাপানো হবে। এ ছাড়া কোন দেশের মালিকানায় জাহাজ চলছে তার ওপর ভিত্তি করে ইচ্ছেমতো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা পাবে ইরান।
তা ছাড়া সেবামূল্য পরিশোধের জন্য প্রতিটি জাহাজকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালে একটি অ্যাকাউন্ট খোলার শর্ত দেওয়া হতে পারে। কিন্তু এটি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার পরিপন্থী হবে। কারণ, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কাছে টাকা পাঠানো নিষিদ্ধ।
এদিকে হরমুজে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য একটি পাল্টা পরিকল্পনা তৈরি করে ওমানের কাছে দিয়েছে। উপসাগরীয় অধিকাংশ দেশেরই এতে সমর্থন রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক পরিচালক লর্ড লুয়েলিনসহ কয়েকজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা সম্প্রতি ওমানের রাজধানী মাসকাট সফর করেছেন। আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডমিনগুয়েজও সেখানে গেছেন।
উপকূলীয় দেশগুলোর টোল আদায়ের আইনি অধিকার আছে কি না, সেটাই এখন প্রণালিটি আবার চালুর প্রধান বাধা। এ ছাড়া জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে ইরান যে পদক্ষেপ নিতে চাইছে, তা বেআইনি কি না এবং এটি অন্যান্য জলপথের জন্য কোনো খারাপ উদাহরণ তৈরি করবে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক চলছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ১৯৮২ সালে ইরান জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইনবিষয়ক সনদে (আনক্লস) স্বাক্ষর করে। কিন্তু তারা কখনো এ চুক্তি অনুমোদন করেনি।
এর মানে হলো, ইরানের মতে তারা স্বাধীনভাবে জাহাজ চলাচলের এ চুক্তির নিয়ম মানতে বাধ্য নয়। এর বদলে তারা প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে চায়, যেখানে জাহাজ চলাচলের ওপর বেশ কড়াকড়ি থাকে।
ইরান দাবি করে, তারা যদি আনক্লস চুক্তি মানতে বাধ্যও থাকে, তবু জাহাজ চলাচলের অধিকার শর্তসাপেক্ষ। উপকূলীয় কোনো দেশের ‘সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার’ বিরুদ্ধে কোনো হুমকি এলে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার অধিকার তাদের আছে।
সংঘাতের শুরুতেই তেহরান জানিয়েছিল, প্রণালির দক্ষিণ তীরসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক ঘাঁটিতে অস্ত্র মজুত করেছে, যেন ইরানে হামলা চালানো যায়।
ইরান আশা করছে, ৫ মে তাদের প্রতিষ্ঠিত সরকারি সংস্থা ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি (পিজিএসএ)’ একটি লাভজনক ও আয় বৃদ্ধিকারী মাধ্যমে পরিণত হবে।
তবে একটি বিষয় অস্পষ্ট। তা হলো, ইরান কি শুধু জাহাজগুলোকে সেবা দেওয়ার বিনিময়ে ফি নেবে, নাকি বাধ্যতামূলকভাবে সেই সেবা নিতে বাধ্য করবে? যদি তা-ই হয়, তবে এ সার্ভিস ফি মূলত একটি টোলে পরিণত হবে।
পিজিএসএ জানিয়েছে, প্রণালিটি পার হওয়ার অনুমতি ও চলাচলের পথের তথ্য পেতে এখন থেকে জাহাজগুলোকে ই–মেইলের মাধ্যমে তাদের অফিসে নিবন্ধন করতে হবে।
এই ফি ইরানের মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে। প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য মোটাদাগে এক ডলার ফি নির্ধারণ করা হচ্ছে।
বেইজিংয়ে এক শীর্ষ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমত যে হরমুজে কোনো টোল বা নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারবে না। উল্লেখ্য, চীনের আমদানিকৃত ইরানি তেলের প্রায় ৪৫ শতাংশই এই প্রণালি দিয়ে আসে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও বলেছেন যে চীন টোল বসানোর পক্ষে নয়।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা শুধু এ অবরোধের অবসান চায়। তাদের মতে, এ পথটি বন্ধ হওয়ার মূল কারণ হলো, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ।
তবে আইআরজিসি গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ইরানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনার পর তেহরান বেশ কিছু চীনা তেলের ট্যাংকার প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিচ্ছে। এসব জাহাজ ইরানের নিয়মকানুন মেনে চলতে রাজি হয়েছে। তবে আইআরজিসির কথা থেকে এটি পরিষ্কার হয়নি যে চীন কোনো ফি দিয়েছে কি না।
ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানি বন্দরগুলোয় অবরোধ আরোপ করে, তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘যারা এ বেআইনি টোল দেবে, তারা গভীর সমুদ্রে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে না।’
এর মানে হলো, চীনা তেলের ট্যাংকারগুলো যদি ইরানকে টোল দেয়, তবে মার্কিন নৌবাহিনী এগুলোর পথ আটকে দেওয়ার অধিকার রাখে বলে মনে করতে পারে। যদিও সেই মুহূর্তে সত্যিই কোনো টোল বা ফি দেওয়া হয়েছে কি না, তার প্রমাণ জোগাড় করা বেশ কঠিন হবে।