মা দিবস এক্সক্লুসিভ: মা না থাকলে হয়তো আজ আমি এই জায়গায় আসতেই পারতাম না

· Prothom Alo

মা দিবস উপলক্ষে নিজের মা লুৎফা মাহবুবকে নিয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব-এর আবেগঘন আলাপচারিতা৷

ক্যামেরার সামনে তিনি কখনও রহস্যময়, কখনও হাস্যরসাত্মক, কখনও আবার গভীর অন্ধকার চরিত্রে নিজেকে ভেঙে গড়ে তোলেন। দর্শকের কাছে তিনি জনপ্রিয় অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব। কিন্তু পর্দার বাইরের তৌসিফের সবচেয়ে আবেগের জায়গাজুড়ে আছেন একজন মানুষ—তার মা, লুৎফা মাহবুব।

Visit mchezo.life for more information.

সংগ্রাম, বেকারত্ব, স্বপ্নভঙ্গের ভয়—সবকিছুর মধ্যেই যিনি ছায়ার মতো পাশে ছিলেন, তিনি তাঁর মা।

মা দিবস উপলক্ষে হাল ফ্যাশনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় জীবনের নানা স্মৃতি বলতে গিয়ে বারবার আবেগে থেমে যাচ্ছিলেন এই অভিনেতা। সংগ্রাম, বেকারত্ব, স্বপ্নভঙ্গের ভয়—সবকিছুর মধ্যেই যিনি ছায়ার মতো পাশে ছিলেন, তিনি তাঁর মা।

পরিবারের সঙ্গে তৌসিফ

“আমার কাছে মা মানে ঈশ্বরের প্রতীক,” বলছিলেন তৌসিফ। “আমি তো স্রষ্টাকেয চোখে দেখিনি, কিন্তু মাকে দেখতে পাই। তাই আমার কাছে মা-ই তাঁর এক রূপ।”
তৌসিফের কথায় উঠে আসে সেই কঠিন সময়ের গল্প, যখন টানা ছয়-সাত মাস তাঁর কোনো কাজ ছিল না। আয় ছিল না, ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা আর ভয়। সেই সময়ের একটি স্মৃতি বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর।

“একদিন চায়ের দোকানে বসে ছিলাম। ১০০ টাকার বিল এসেছে, কিন্তু পকেটে টাকা নেই। তখন মায়ের কাছ থেকেই টাকা নিতে হয়েছে। মা শুধু বলেছিলেন, ‘টেনশন করিস না, সামনে ভালো কিছু হবে।’” এই ছোট্ট বাক্যটাই যেন নতুন করে বাঁচার সাহস জুগিয়েছিল তাকে।

তৌসিফ মনে করেন, তাঁর জীবনের প্রতিটি সংগ্রাম আর প্রতিটি অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর মায়ের

তৌসিফ মনে করেন, তাঁর জীবনের প্রতিটি সংগ্রাম আর প্রতিটি অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর মায়ের। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ ১২–১৩ বছরের পথচলায় যতবার তিনি ভেঙে পড়েছেন, ততবার তার মা এসে বলেছেন—“নো ওয়ারিজ।”
অভিনয়ের পাশাপাশি একসময় সংগীত নিয়েও বড় স্বপ্ন ছিল তৌসিফের। গিটার হাতে গান শেখা, ব্যান্ডে সময় দেওয়া—সবকিছুর নীরব সাক্ষী ছিলেন তার মা।
“আমি যখন গিটার হাতে বসে প্র্যাকটিস করতাম, মা সামনে বসে থাকতেন। আমার প্রতিটা ছোট সাফল্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আমার একটা ব্যান্ড ছিল, ‘ম্যানেজার’। সেই ব্যান্ডের একটা গান মা সারাদিন শুনতেন। বাবা মিউজিক করা অতটা পছন্দ করতেন না, কিন্তু মা সব সময় সাপোর্ট করতেন। বলতেন, ‘তোমার যেটা ভালো লাগে করো, আমার দোয়া তোমার সঙ্গে আছে।’

এখন প্রযুক্তির যুগে সেই ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। হাসতে হাসতেই তৌসিফ বললেন, “মা যখন প্রথম ফেসবুক ব্যবহার শুরু করলেন, তখন থেকেই আমার সবচেয়ে বড় ফ্যান হয়ে গেলেন। আমার নাটকের ট্রেলার, পোস্টার, নিউজ—সব শেয়ার করেন। কেউ আমার ছবি আঁকলেও সেটাও শেয়ার করেন। আমি বলব, আমার সব কাজের সবচেয়ে বড় ভক্ত আমার মা।”

মা পোস্টারটা দেখেই কেঁদে ফেলেছিলেন। বলছিলেন, এটা কী করেছ তুমি

তবে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেওয়া মুহূর্ত ছিল খোয়াবনামার পোস্টার প্রকাশের দিন। বলছিলেন তৌসিফ,“শুটিং শেষে বাসায় ফিরেছি। পোস্টার বের হয়েছে। মা পোস্টারটা দেখেই কেঁদে ফেলেছিলেন। বলছিলেন, এটা কী করেছ তুমি? কোনো সমস্যা হয়নি তো?  তখন মনে হয়েছে, আমার একটা সীমারেখা আছে। এমন কিছু করার আগে ভাবতে হবে, যাতে মা কষ্ট না পান।'

পর্দায় সিরিয়াল কিলার কিংবা ডার্ক চরিত্রে অভিনয় করা তৌসিফ বাস্তব জীবনে ভীষণ আবেগপ্রবণ—সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে শৈশবের একটি স্মৃতি বলতে গিয়ে।
“আমি ধানমন্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়তাম। আমাদের ক্লাস শেষ হতো সন্ধ্যা ছয়টার দিকে। একদিন শীতের সময় মা আমাকে নিতে আসার কথা ছিল। ছুটি হয়ে গেছে, সবাই চলে গেছে, কিন্তু মা আসছে না। আমি অপেক্ষা করছি। প্রায় সাতটার দিকে মা এলেন। আমি খুব রাগ করেছিলাম—এত দেরি করে আসছো কেন?”
এরপর পাশের এক রিকশাচালকের কথায় সব বদলে যায়। “তিনি বললেন, ‘আপনার মাকে ছিনতাইকারীরা ছুরি মেরেছে। উনি হাসপাতালে না গিয়ে আপনাকে নিতে এসেছেন, কারণ আপনি স্কুলে অপেক্ষা করছেন।’” এই স্মৃতি বলতে বলতেই থেমে যান তৌসিফ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, “সরি… বলতে বলতে একটু ইমোশনাল হয়ে গেলাম।”
তারপর খুব ধীরে যোগ করেন—
“সত্যি বলতে, মা না থাকলে হয়তো আজ আমি এই জায়গায় আসতেই পারতাম না। আর অনেকেই বলেন আমি সবকিছুর উর্ধ্বে একজন ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি। আর এই বিষয়টি সম্পূর্ণ আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আর তাঁরই দেওয়া মূল্যবোধ ও শিক্ষার প্রতিচ্ছবি বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’

পুরস্কার হাতে তৌসিফ মাহবুব

ব্যস্ত ক্যারিয়ারের মাঝেও মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করেন তিনি। তৌসিফ বলেন, “কোরবানির ঈদের পর মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে আমাদের প্রায় ১৫ দিনের একটা ছুটি থাকে। সেই সময়টা আমি বাসায় থাকার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে যাই, কিন্তু বাকিটা সময় মায়ের সঙ্গেই কাটে।”
এই মা দিবসে তৌসিফ মাহবুব-এর গল্প শুধু একজন তারকার গল্প নয়; এটি হাজারো সন্তানের গল্প, যারা জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও মায়ের হাত শক্ত করে ধরে সামনে এগিয়ে যায়। পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুক—মা দিবসে এটাই তাঁর প্রার্থনা।

ছবি: তৌসিফ মাহবুব

Read full story at source