ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে কেন ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়তে পারে উপসাগরীয় দেশগুলোর মানুষ

· Prothom Alo

তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি ও পানি প্রকল্পে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। এক দিন আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তাঁর দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষে ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলার যে হুমকি দিয়েছেন, তারই জবাবে গতকাল রোববার তেহরান এ হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

Visit syntagm.co.za for more information.

বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ পাল্টাপাল্টি হামলার আশঙ্কায় আজ সোমবার সকালে বিশ্ববাজার খোলার পর বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জীবনযাত্রাও চরম হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের অনেক দেশের মানুষ সুপেয় পানির জন্য সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্রকল্পের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।

মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো এমনভাবে ধ্বংস হবে, যা আর আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব হবে না।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা ইরানের ক্ষতি করলেও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার ইরানের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ। এই বিদ্যুৎ মূলত তাদের মরুভূমির শহরগুলোকে বসবাসযোগ্য রাখে এবং সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করে। বিশেষ করে বাহরাইন ও কাতারের ১০০ শতাংশ সুপেয় পানি আসে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্রকল্পের মাধ্যমে। এ প্রকল্প বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে সুপেয় পানির ৮০ শতাংশ ও সৌদি আরবের পানির চাহিদার ৫০ শতাংশ মেটায় এ ধরনের প্রকল্প।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো “এমনভাবে ধ্বংস হবে, যা আর আগের অবস্থায় ফেরানো” সম্ভব হবে না।’

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এলএনজি আমদানি ব্যাহত, ঝুঁকিতে বিদ্যুৎ–জ্বালানি

এদিকে ইরানের শক্তিশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিও বন্ধ থাকবে। ইরানের দক্ষিণ উপকূলের এ সরু জলপথ দিয়ে এই বিশাল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়।

আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমাদের ধ্বংস হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আবার চালু না হওয়া পর্যন্ত এ নৌপথ আর খুলে দেওয়া হবে না।’

কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে কাতার এনার্জির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনকেন্দ্রের দৃশ্য। ২ মার্চ ২০২৬

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা ও পশ্চিমা দেশগুলোর মৈত্রীর সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

জাহাজ চলাচলবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ও পাকিস্তানের একটি তেলবাহী ট্যাংকার তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। তবে বেশির ভাগ জাহাজ এখনো কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নিজেদের জায়গায় অবস্থান করছে।

শেয়ারবাজারে ‘অনিশ্চয়তার টাইম বোমা’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আইজির বাজার–বিশ্লেষক টনি সিকামোর বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি বাজারের ওপর ৪৮ ঘণ্টার এক চরম অনিশ্চয়তার “টাইম বোমা” বসিয়ে দিয়েছে।’

আজ সোমবার লেনদেন শুরু হলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সিকামোর। এর আগে গত শুক্রবার জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেকটা বেড়ে যায়। গত প্রায় চার বছরের মধ্যে তা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র নৌপথ হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে আগে থেকেই চাপে থাকা বিশ্ববাজারে গত সপ্তাহে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয়। ইসরায়েল ইরানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালানোর পর তেহরানও এর জবাবে সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে পাল্টা হামলা চালায়। পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে জ্বালানি উৎপাদন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি

বিভিন্ন তেল ট্যাংকার লক্ষ্য করে ইরানের হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের পর বিশ্বে সবচেয়ে বড় জ্বালানি–সংকট তৈরি করেছে। নৌপথটি বন্ধ হওয়ায় গত সপ্তাহে ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দাম একলাফে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, ‘এ মুহূর্ত থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান যদি কোনো হুমকি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেবে। এ অভিযান শুরু হবে দেশটির সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে।’

ইরান যুদ্ধে নেতানিয়াহুর শক্তি বাড়ল, চাপে ট্রাম্প ও উপসাগরীয় দেশগুলো

গত শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ হুঁশিয়ারি দেন। ট্রাম্পের ওই সময়সীমা বাংলাদেশ সময় আগামীকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টার দিকে শেষ হবে।

ইরানি সংবাদমাধ্যম আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনে (আইএমও) দেশটির প্রতিনিধির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। তবে এ সুবিধা ‘ইরানের শত্রুদের’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজের জন্য প্রযোজ্য হবে না।

ইরানের প্রতিনিধি আলী মুসাভি জানান, তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে এ জলপথ দিয়ে চলাচল করা সম্ভব।

এদিকে জাহাজ চলাচল–বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ও পাকিস্তানের একটি তেলবাহী ট্যাংকার তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। কিন্তু বেশির ভাগ জাহাজ এখনো কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নিজেদের অবস্থানেই রয়েছে।

গত শুক্রবার তেহরান প্রথমবারের মতো ৪ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধের ঝুঁকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলোও এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায়

গত তিন সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের নিজের সীমানার বাইরে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে তেহরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এ দাবিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

গত শুক্রবার তেহরান প্রথমবারের মতো ৪ হাজার কিলোমিটার (২ হাজার ৫০০ মাইল) পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধের ঝুঁকি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে দিয়েছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সামরিক মহড়া। পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের আরাস অঞ্চলে। ১৭ অক্টোবর, ২০২২

এ ছাড়া ইসরায়েলের ডিমোনা শহরের প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত দেশটির একটি গোপন পারমাণবিক চুল্লির কাছেও ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

অন্য আরেকটি ফ্রন্টেও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত চলছে। গত রোববার ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তাদের সেনারা দক্ষিণ লেবাননে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির বেশ কিছু অবস্থানে অভিযান চালিয়েছে। তারাও পাল্টা ইসরায়েলের ভেতর রকেট হামলা চালিয়েছে।

Read full story at source