ছায়া মন্ত্রিসভা গড়ছে জামায়াত: কী হবে এর কাজ, কীভাবে চলবে

· Prothom Alo

গঠনমূলক সমালোচনা এবং সংসদে সরকারি সিদ্ধান্তের বিকল্প নীতিপ্রস্তাব দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটি ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। আগামী ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগেই প্রাথমিক কাঠামো চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।

তবে জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে, নাকি জোটগতভাবে একটি কাঠামো হবে—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়ে অনেকের আগ্রহ রয়েছে। বাইরের দেশে এটি যেভাবে ভূমিকা রাখে, বাংলাদেশেও যাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে। তিনি বলেন, ধারণাটি নতুন হওয়ায় কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে সময় লাগছে। পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হবে এ উদ্যোগ। সরকারের সহযোগিতার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে।

তবে জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে, নাকি জোটগতভাবে একটি কাঠামো হবে—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তারা পেয়েছে ২০৯টি আসন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট মোট ৭৭টি আসন পায়। এর মধ্যে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসনে জয়ী হয়।

নির্বাচনের পরপরই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ১৪ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ-২ আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হওয়া জামায়াতের প্রার্থী শিশির মনির এবং তার পরদিন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ফেসবুকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতির কথা জানান।

ছায়া মন্ত্রিসভা কী? বাংলাদেশে তা কি কায়া পাবে?

পরবর্তী সময়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথের দিন জামায়াতের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার চেতনাকে সমুন্নত রাখার অংশ হিসেবে আমরা একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করব, যা জনস্বার্থে গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্তকে কঠোরভাবে পর্যালোচনা করবে, প্রয়োজনে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করবে এবং সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে গঠনমূলকভাবে শক্তিশালী করবে।’

বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্তকে বিএনপি স্বাগত জানায় বলে ১৫ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

সরকারের মন্ত্রিসভায় যেমন বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী থাকেন, তেমনি ছায়া মন্ত্রিসভায়ও বিরোধী দলের সদস্যদের নির্দিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা। তবে সব মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে ছায়া মন্ত্রী থাকতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই; এটি বিরোধী দলের কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়।

ছায়া মন্ত্রিসভা কী

ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা এসেছে যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে, যেখানে এটি ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ নামে পরিচিত। এ রীতিতে বিরোধী দল একটি বিকল্প কাঠামো গঠন করে, যার কাজ সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। লক্ষ্য, সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা। যুক্তরাজ্য ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে ভিন্ন নামে ও রূপে এ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসংসদে বাজেট ঘোষণার পর সাধারণত বিরোধী দল সমালোচনা করে। কিন্তু বিকল্প বাজেট খুব কমই দেওয়া হয়। ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে জামায়াত বিকল্প বাজেট প্রস্তাব দেবে এবং তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিও তুলে ধরবে।

সরকারের মন্ত্রিসভায় যেমন বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী থাকেন, তেমনি ছায়া মন্ত্রিসভায়ও বিরোধী দলের সদস্যদের নির্দিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা। তবে সব মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে ছায়া মন্ত্রী থাকতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই; এটি বিরোধী দলের কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, সংসদে বাজেট ঘোষণার পর সাধারণত বিরোধী দল সমালোচনা করে। কিন্তু বিকল্প বাজেট খুব কমই দেওয়া হয়। ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে জামায়াত বিকল্প বাজেট প্রস্তাব দেবে এবং তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিও তুলে ধরবে।

মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুর রব ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মূল উদ্দেশ্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকারি দলের কোনো বিল বা প্রস্তাব ভালো হলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে, আর খারাপ হলে যুক্তি, প্রমাণ ও বিতর্কের মাধ্যমে গঠনমূলক সমালোচনা করবে। তাঁর মতে, সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে এটি কার্যকর হলে সংসদীয় ধারার বিকাশ ঘটবে এবং ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ কমবে।

প্রস্তুতি ও কাঠামো

দলীয় সূত্র জানায়, জামায়াতের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দল রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন, পলিসি সামিট ও বিজনেস সামিটে সক্রিয় থাকা পলিসি বিশেষজ্ঞদের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাবেক আমলাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ যুক্ত রয়েছেন।

জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও আইনজীবী শিশির মনির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা একটি টিম প্রস্তুত করছি, যেখানে একজন শ্যাডো মন্ত্রী থাকবেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, কনসালট্যান্ট, রিসার্চার, অ্যাসোসিয়েট রিসার্চার ও ক্ষেত্রবিশেষে স্পোকপারসন থাকবেন।’ তিনি বলেন, যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টনের চেষ্টা চলছে।

ছায়া মন্ত্রিসভায় জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি বা অন্য শরিক দলগুলো থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে সংসদ অধিবেশনের আগে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে। এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আপাতত জামায়াত নিজ উদ্যোগে কাজ করছে। আলোচনার ভিত্তিতে জোটগত প্রস্তাব এলেও তা বিবেচনা করা হবে।

জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও আইনজীবী শিশির মনির আমরা একটি টিম প্রস্তুত করছি, যেখানে একজন শ্যাডো মন্ত্রী থাকবেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, কনসালট্যান্ট, রিসার্চার, অ্যাসোসিয়েট রিসার্চার ও ক্ষেত্রবিশেষে স্পোকপারসন থাকবেন।

সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে বিরোধী দল প্রায়ই অভিযোগ করে, সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ সীমিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা গেলে বিরোধী দল কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে বিকল্প নীতিপ্রস্তাব দিতে পারবে। এতে সংসদীয় বিতর্কের মান বাড়তে পারে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। গবেষণাভিত্তিক নীতিপত্র তৈরি, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা—এসবের জন্য সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে উদ্যোগটি কার্যকর হবে না।

মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুর রব প্রথম আলোকে বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মূল উদ্দেশ্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকারি দলের কোনো বিল বা প্রস্তাব ভালো হলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে, আর খারাপ হলে যুক্তি, প্রমাণ ও বিতর্কের মাধ্যমে গঠনমূলক সমালোচনা করবে। তাঁর মতে, সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে এটি কার্যকর হলে সংসদীয় ধারার বিকাশ ঘটবে এবং ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ কমবে।

Read full story at source