যে বছর আইনস্টাইনকে চিনতে শুরু করল বিশ্ববাসী

· Prothom Alo

ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদেরও বহু বছর লেগে যায়। সারা জীবনের সাধনায় তাঁরা পৃথিবীকে নতুন কিছু দেন। কিন্তু আইনস্টাইনের গল্পটা একটু আলাদা। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের জগৎটাকে ওলট–পালট করে দিয়েছিলেন, তা–ও মাত্র এক বছরের মধ্যে!

১৯০৫ সাল। আইনস্টাইনের কপালে তখনো কোনো টিউশনি বা শিক্ষকের চাকরি জোটেনি। তিনি তখনো সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরের সেই পেটেন্ট অফিসে কাজ করছেন, ফাইল ঘাঁটছেন। কিন্তু কে জানত, এ বছরটিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে! ইতিহাসে এ বছরকে বলা হয় ‘অ্যানাস মিরাবিলিস’ বা অলৌকিক বছর।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আইনস্টাইনের বয়স তখন ছাব্বিশের কোঠায়। বিয়ে করেছেন। ঘরে ফুটফুটে এক ছেলে। ছেলের নাম রাখলেন হ্যান্স আলবার্ট আইনস্টাইন। সংসার সামলে, অফিসের কাজ সেরে যেটুকু সময় পেতেন, ডুবে যেতেন পদার্থবিজ্ঞানে। এর আগেও তিনি বিখ্যাত অ্যানালেন ডের ফিজিক জার্নালে কিছু গবেষণাপত্র পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো খুব একটা আহামরি ছিল না। কেউ তেমন পাত্তাও দেয়নি, প্রশংসা তো দূরের কথা।

সন্তানের না, মা–বাবার স্ক্রিন টাইম নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে

কিন্তু ১৯০৫ সালে সব বদলে গেল। আইনস্টাইন ছোটবেলা থেকেই প্রশ্ন করতে ভালোবাসতেন। শত বছর ধরে চলে আসা নিউটনের পদার্থবিজ্ঞানকে তিনি সন্দেহ করতে শুরু করলেন। অন্ধভাবে বইয়ের কথা বিশ্বাস করতেন না আইনস্টাইন। নিজের মতো করে দেখতেন পৃথিবীকে। সেখান থেকেই তাঁর মাথায় আসত নতুন নতুন সব থিওরি বা তত্ত্ব। আইনস্টাইনের কাছে গবেষণার জন্য বড় কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না। হাতের কাছে ছিল না সব বইও। কিন্তু তাঁর একজন দারুণ বন্ধু ছিল, নাম মিকেল অ্যাঞ্জেলো বেসো।

মিকেল ও আলবার্ট জুরিখ পলিটেকনিকে একসঙ্গে পড়তেন। মিকেল ছিলেন ইতালীয় বংশোদ্ভূত সুইস প্রকৌশলী। পরে আইনস্টাইনের সাহায্যেই মিকেল ওই পেটেন্ট অফিসে চাকরি পান। মিকেলের পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে বেশ ভালো জ্ঞান ছিল। অফিসের ফাঁকে বা অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুই বন্ধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিজ্ঞান নিয়ে আড্ডা দিতেন। আইনস্টাইন মিকেলকে বলতেন, ইউরোপের সেরা সাউন্ডিং বোর্ড। মানে আইনস্টাইনের কঠিন সব আইডিয়া মিকেল মন দিয়ে শুনতেন। তারপর সেটা নিয়ে মতামত দিতেন। আইনস্টাইনের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান এই আড্ডার মাধ্যমেই বেরিয়ে এসেছিল।

সব চিন্তা গুছিয়ে নিয়ে আইনস্টাইন প্রস্তুত হলেন। পৃথিবীকে চমকে দেওয়ার জন্য তিনি চারটি গবেষণাপত্র লিখলেন। এই চারটি গবেষণাপত্রই প্রকাশিত হলো সেই ১৯০৫ সালে। বদলে গেল বিজ্ঞানের ইতিহাস।

৯ জুন প্রকাশিত হলো আইনস্টাইনের প্রথম পেপার। বিষয় ছিল ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট। তখন সবাই জানত, আলো সব সময় ঢেউয়ের মতো চলে। পুকুরে ঢিল ছুড়লে যেমন ঢেউ খেলে, আলোও নাকি তেমনই। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হতো ওয়েভ থিওরি অব লাইট।

৩ মার্চ চন্দ্রগ্রহণ, দেখা যাবে ‘ব্লাড ওয়ার্ম মুন’

আইনস্টাইন বললেন, না! সব সময় এমনটা হয় না। তিনি দেখালেন, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে আলো ঢেউয়ের মতো আচরণ করে না। তখন আলো ছোট ছোট কণা বা প্যাকেট হিসেবে আচরণ করে। আলোর এই কণাগুলোর নাম পরে দেওয়া হয় ফোটন। এই ফোটন কণাগুলো কখনোই স্থির থাকে না, সব সময় ছুটতে থাকে। একটা মজার তথ্য জানানো প্রয়োজন। আইনস্টাইন পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জন্য। কিন্তু এই আবিষ্কারের জন্য তিনি নোবেল পাননি। এই ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট ব্যাখ্যার জন্যই ১৯২১ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান।

এর ঠিক এক মাস পর ১৮ জুলাই প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পেপার। বিষয়টি একটু অদ্ভুত। ধরো, একচিলতে রোদের মধ্যে ধূলিকণা উড়ছে। কিংবা পানির মধ্যে ফুলের রেণু ভাসছে। এই কণাগুলো কিন্তু স্থির থাকে না। জিগজ্যাগ করে এদিক-ওদিক নাচতে থাকে। আইনস্টাইন বললেন, এই নাচানাচি অকারণ নয়।

আইনস্টাইন প্রমাণ করলেন, বস্তুর ভর ও শক্তি আসলে একই জিনিসের দুই রূপ। ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। এখান থেকেই এল পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণ: E=mc2।

চোখে দেখা যায় না—এমন কিছু একটা নিশ্চয়ই এদের ধাক্কা দিচ্ছে। তিনি অঙ্ক কষে দেখালেন, পানির বা বাতাসের অদৃশ্য অণু-পরমাণুগুলোই এই দৃশ্যমান কণাগুলোকে ধাক্কা দিচ্ছে। এত দিন বিজ্ঞানীরা তর্ক করতেন পরমাণু বলে আসলেই কিছু আছে কি না! আইনস্টাইনের এই পেপার সেই তর্কের ইতি টানল। প্রমাণ হলো, পরমাণু আসলেই আছে! এই পেপার রবার্ট ব্রাউনের পর্যবেক্ষণ করা ব্রাউনিয়ান মোশন বা ব্রাউনীয় গতির ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল।

এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হলো তৃতীয় পেপার। এটি ছিল সবচেয়ে বৈপ্লবিক। এই পেপারের বিষয় হলো স্থান ও কাল। এত দিন মানুষ ভাবত—সময় সবার জন্য সমান। আইনস্টাইন বললেন, ভুল!

আইনস্টাইন একটি সহজ উদাহরণ দিলেন। ধরো, তুমি একটা বাসে আছ। বাসটা চলছে। তুমি একটা বল সোজা ওপরের দিকে ছুড়ে দিলে। বলটা কিন্তু তোমার হাতেই এসে পড়বে। তুমি যতক্ষণে বলটা ছুড়ে দিয়েছ, ততক্ষণে বাসটা কিন্তু কিছুটা সামনে এগিয়ে গেছে। সে হিসাবে বলটা তোমার হাতে আসার কথা নয়। কিন্তু তবু বলটা হাতে এসেই পড়ে। এর মানে, তুমি স্থির থাকো বা চলতে থাকো, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম একই থাকবে।

নিঃসঙ্গ বানরছানা পাঞ্চ ও একটি খেলনা ওরাংওটাংয়ের গল্প

তবে এর সঙ্গে আইনস্টাইন যোগ করলেন আলোর গতির খেলা। আলোর গতি সব সময় সমান। তুমি বাসে থাকো আর রকেটে, আলোর গতি পাল্টাবে না। এই পেপার থেকেই জন্ম নিল আইনস্টাইনের বিখ্যাত ‘থিওরি অব স্পেশাল রিলেটিভিটি’ বা বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এই পেপারের শিরোনাম ছিল ‘অন দ্য ইলেকট্রোডাইনামিকস অব মুভিং বডিজ’।

২১ নভেম্বর এল সেই অলৌকিক বছরের শেষ চমক। আইনস্টাইনের চতুর্থ পেপার। এখানে তিনি বস্তুর ভেতরের শক্তির হিসাব করলেন। তিনি দেখালেন, একটা বস্তু যখন চলে, তখন তার এক রকম শক্তি থাকে, মানে গতিশক্তি। আর যখন সে স্থির থাকে, তখনো তার মধ্যে শক্তি লুকিয়ে থাকে, অর্থাৎ স্থিতিশক্তি।

আইনস্টাইন প্রমাণ করলেন, বস্তুর ভর ও শক্তি আসলে একই জিনিসের দুই রূপ। ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। এখান থেকেই এল পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণ: E=mc2।

এখানে E মানে শক্তি, m মানে ভর, আর c মানে আলোর গতি। আলোর গতি অকল্পনীয়, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার! এই বিশাল সংখ্যার বর্গ করলে সেটা আরও বিশাল হয়ে যায়। তার মানে, খুব সামান্য ভরের মধ্যেও প্রচণ্ড শক্তি লুকিয়ে থাকে। ভবিষ্যতে পারমাণবিক বোমা ও নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হবে। এসবের মূল ভিত্তি হবে আইনস্টাইনের এই ছোট্ট সমীকরণ!

তবে ১৯০৫ সালের সেই জাদুকরি বছরের পর আইনস্টাইন আর সাধারণ কেরানি রইলেন না। তাঁর স্বপ্নের দরজা খুলে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি এত দিন দেখেছিলেন, অবশেষে সেই ডাক আসার সময় হলো!

চারটি পেপার প্রকাশিত হওয়ার পর বিজ্ঞানীদের টনক নড়ল। তৎকালীন বিখ্যাত পদার্থবিদেরা নড়েচড়ে বসলেন। তাঁরা আইনস্টাইনের থিওরিগুলো পরীক্ষা করলেন। দেখলেন, আইনস্টাইন ঠিকই বলছেন! বিজ্ঞানের শত বছরের পুরোনো অনেক ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।

সবাই খোঁজ নিতে শুরু করলেন, কে এই আলবার্ট আইনস্টাইন? কেউ তাঁকে চেনে না। তিনি কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরও নন। সামান্য এক পেটেন্ট অফিসের কেরানি!

জ্যাকব জোহান লব নামের এক তরুণ পদার্থবিদ আইনস্টাইনের কাজ দেখে মুগ্ধ হলেন। জ্যাকব তখন জার্মানির উর্জবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতেন। তিনি আলবার্টকে চিঠি লিখলেন। দুজনের বন্ধুত্ব হলো। ১৯০৮ সালে জ্যাকব সুইজারল্যান্ডের বার্নে এলেন আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করতে।

শেষমেশ গরুও যন্ত্র ব্যবহার শুরু করল?

অফিসে গিয়ে জ্যাকব তো অবাক! এমন প্রতিভাবান একজন মানুষ এখনো কেরানির চাকরি করছেন? জ্যাকব বললেন, ‘এ তো আপনার মেধার অপচয়!’ আইনস্টাইন অবশ্য তা মনে করতেন না। তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘এই চাকরিতে বেতন ভালো। সংসার চলে যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, এখানে আমি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে ভাবার জন্য প্রচুর সময় পাই।’

আইনস্টাইনের খ্যাতি তখন ছড়াতে শুরু করেছে। তিনি তখন বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। তিনি ভাবছেন, মহাকর্ষকে কীভাবে এই তত্ত্বের সঙ্গে মেলানো যায়। এর জন্য তাঁকে আরও অনেক বছর সাধনা করতে হবে।

তবে ১৯০৫ সালের সেই জাদুকরি বছরের পর আইনস্টাইন আর সাধারণ কেরানি রইলেন না। তাঁর স্বপ্নের দরজা খুলে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি এত দিন দেখেছিলেন, অবশেষে সেই ডাক আসার সময় হলো!

সূত্র: ডি কে প্রকাশনীর লাইফ স্টোরিস সিরিজের আলবার্ট আইনস্টাইন বই অবলম্বনে

আইনস্টাইন ঠিকই বলেছিলেন, ব্ল্যাকহোল স্থান আর সময়কে টেনে নেয়

Read full story at source