১০ লাখ বছরের পুরোনো এল মোয়া এগশেল গুহা থেকে কী জানা গেল

· Prothom Alo

নিউজিল্যান্ডের নর্থ আইল্যান্ড বা উত্তর দ্বীপের ওয়াইটোমো অঞ্চলের কথা হয়তো তোমরা অনেকেই জানো। হাজার হাজার জোনাকি পোকার আলোয় আলোকিত এখানকার গুহাগুলো পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। কিন্তু ঠিক এই এলাকাতেই, মোয়া এগশেল কেভ নামে একটি গুহায় বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন প্রাগৈতিহাসিক এক গুপ্তধন। তবে এই গুপ্তধন সোনাদানা নয়, এটি হলো এক হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর জীবাশ্ম।

Visit chickenroad.qpon for more information.

এই গুহাটি যে আজই প্রথম আবিষ্কৃত হলো, তা কিন্তু নয়। ১৯৬০-এর দশকেই এটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। তখনো কিছু ফসিল মিলেছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন সম্প্রতি সেখানে আবার ফিরে গেলেন, তাঁরা বুঝতে পারলেন আগেরবার শুধু রহস্যের উপরিভাগটা দেখেছিলেন। এবার তাঁরা গুহার গভীরে প্রবেশ করে যা পেলেন, তা নিউজিল্যান্ডের প্রাকৃতিক ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়।

অস্ট্রেলিয়ার কুবার পেডিতে কেন মানুষ মাটির নিচে বাস করে

কী পাওয়া গেল সেই গুহায়

গবেষক দলটি গুহার গভীর থেকে ১২ প্রজাতির প্রাচীন পাখি ও ৪ প্রজাতির ব্যাঙের ফসিল উদ্ধার করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো তোতাপাখির একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন স্ট্রিগপস ইনসুলাবোরিয়ালিস (Strigops insulaborealis)।

এই নামটা খটমট লাগলে সহজ করে বলি। বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে কাকাপো নামে একধরনের তোতাপাখি আছে। এরা উড়তে পারে না, মাটিতেই বসবাস করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুন আবিষ্কৃত ফসিলটি বর্তমানের সেই কাকাপোরই এক অতি প্রাচীন আত্মীয়। তবে একটা বড় পার্থক্য আছে। এখনকার কাকাপোরা যেখানে মাটিতে হেঁটে বেড়ায়, তাদের এই ১০ লাখ বছর আগের পূর্বপুরুষেরা সম্ভবত আকাশে উড়তে পারত! ফসিল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রাচীন এই পাখিটির পা বর্তমানের কাকাপোর মতো অতটা শক্তিশালী ছিল না। এর থেকেই বোঝা যায়, তারা ডাঙার চেয়ে আকাশেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত।

শুধু তোতাপাখিই নয়, সেখানে পাওয়া গেছে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একধরনের পায়রার ফসিল। এই পায়রার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ব্রোঞ্জউইং পায়রার মিল আছে। আরও পাওয়া গেছে আধুনিক তাকাহে পাখির এক বিলুপ্ত পূর্বপুরুষের খোঁজ।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাকড়সার জালের খোঁজ পাওয়া গেছে

কীভাবে বয়স জানা গেল

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, এই হাড়গোড়গুলো যে ঠিক ১০ লাখ বছর আগের, সেটা বিজ্ঞানীরা বুঝলেন কী করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের স্তরে। নিউজিল্যান্ড হলো আগ্নেয়গিরির দেশ। গুহার মাটির স্তরগুলো পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই ফসিলগুলো আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের দুটি নির্দিষ্ট স্তরের মাঝখানে চাপা পড়ে ছিল।

নিচের ছাইয়ের স্তরটি তৈরি হয়েছিল ১৫ লাখ ৫০ হাজার বছর আগের এক অগ্ন্যুৎপাতে। আর ওপরের স্তরটি তৈরি হয়েছিল ১০ লাখ বছর আগে। তার মানে, এই দুই সময়ের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে এই প্রাণীগুলো দিব্যি বেঁচে ছিল এবং দাপিয়ে বেড়াত।

নর্থ আইল্যান্ডে পাওয়া এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরোনো গুহা-নিদর্শন। কান্টারবুরি মিউজিয়ামের সিনিয়র কিউরেটর ও এই গবেষণার সহ-লেখক পল স্কোফিল্ড বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটা নিউজিল্যান্ডের প্রাচীন ইতিহাসের কোনো হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় নয়, বরং এটা আস্ত একটা হারিয়ে যাওয়া খণ্ড!’

এত দিন এই সময়টা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে তেমন কোনো তথ্যই ছিল না। এই আবিষ্কার সেই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করে দিল।

বৃহত্তম গুহা মাছ

মানুষ আসার আগেই মহাপ্রলয়

আমরা সাধারণত ভাবি, নিউজিল্যান্ডের অদ্ভুত সব পাখি বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে মানুষের হাতই সবচেয়ে বেশি। মানুষ সেখানে গিয়েছিল মাত্র ৭৫০ বছর আগে। কিন্তু এই গবেষণা আমাদের সেই ধারণা কিছুটা বদলে দিচ্ছে।

গুহায় পাওয়া ফসিলগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মানুষ সেখানে পা রাখার বহু আগেই, অর্থাৎ গত ১০ লাখ বছরে সেখানকার জীববৈচিত্র্যে বিশাল এক ধস নেমেছিল। মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রায় ৩৩ থেকে ৫০ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

এর কারণ কী? বিজ্ঞানীরা আঙুল তুলছেন প্রকৃতির দিকেই। সুপার-ভলকানো বা বিশাল সব আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন এর জন্য দায়ী। ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রধান গবেষক ট্রেভর ওয়ার্থি বলেন, ‘এই গবেষণা প্রমাণ করে, সুপার-ভলকানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক শক্তিগুলো ১০ লাখ বছর আগেই আমাদের বন্য প্রাণীদের ভাগ্য লিখে দিচ্ছিল।’

নিউজিল্যান্ডের প্রাণিজগৎ কেন এত অদ্ভুত ও আলাদা, তার উত্তর হয়তো এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ভাঙা-গড়ার ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। বাস্তুতন্ত্র বারবার ভেঙেছে, আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে। আর এই ভাঙা-গড়ার সাক্ষী হয়ে আজ ১০ লাখ বছর পর আমাদের সামনে এল মোয়া এগশেল কেভের এই আবিষ্কার।

এই গবেষণা প্যালিওনটোলজি বিষয়ক জার্নাল অ্যালকেরিঙ্গা: অ্যান অস্ট্রালশিয়ান জার্নাল অব প্যালিওনটোলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্সমহাকাশচারীদের আশ্রয় হতে পারে চাঁদে খুঁজে পাওয়া নতুন গুহা

Read full story at source