শেষ রাতে জেগে নবীজি ৭ আমল করতেন
· Prothom Alo

রাতের শেষভাগে ইবাদতের গুরুত্ব অনেক বেশি। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এ সময় জেগে উঠে ইবাদতে লিপ্ত হন। রাসুলের জীবনেও এ সময়ের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
Visit moryak.biz for more information.
তিনি যে ইবাদতগুলো করতেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
১. তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়
রাতের শেষভাগে নবীজির অন্যতম প্রধান আমল ছিল তাহাজ্জুদ নামাজ। আল্লাহ-তাআলা তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭৯)
নবীজি রাতে এত দীর্ঘ সময় নামাজ আদায় করতেন যে তাঁর পা ফুলে যেত। তাঁকে বলা হলো, আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন, তারপরও আপনি এত কষ্ট করেন কেন? তিনি বললেন, ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, নবীজি রাতে এত দীর্ঘ সময় নামাজ আদায় করতেন যে তাঁর পা ফুলে যেত। তাঁকে বলা হলো, আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের সব ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন, তারপরও আপনি এত কষ্ট করেন কেন? তিনি বললেন, ‘আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৩৭)
ইবাদত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও অন্যতম মাধ্যম। রাতের নির্জনতায় দুই রাকাত নামাজ আদায় করেও একজন মুমিন এই সুন্নাহর অনুশীলন শুরু করতে পারেন।
২. নামাজে দীর্ঘক্ষণ কোরআন পাঠ
রাসুলের রাতের নামাজ ছিল ধীরস্থিরতার অনন্য দৃষ্টান্ত। হুযাইফা (রা.) এক রাতে নবীজির সঙ্গে নামাজ আদায় করছিলেন। নবীজি সুরা বাকারা পড়তে শুরু করেন। তাঁর ধারণা হয়েছিল হয়তো এক শ আয়াত পড়ে রুকু করবেন। কিন্তু নবীজি পাঠ চালিয়ে যান।
এরপর সুরা নিসা ও আলে ইমরান পড়েন। ধীরস্থিরভাবে কোরআন পড়ছিলেন। তাসবিহের আয়াত এলে তাসবিহ পড়তেন, প্রার্থনার আয়াত এলে প্রার্থনা করতেন এবং আশ্রয় প্রার্থনার আয়াত এলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৭২)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাতের নামাজের মাধ্যমে কোরআনুল কারিমের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গভীর করা যায়।
মৃত মা-বাবার জন্য সবচেয়ে উপকারী ৩ আমল৩. আল্লাহর কাছে প্রার্থনা
রাসুল (সা.) বলেন, রাতের যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন আমাদের প্রতিপালক দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, ‘কে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে দেব। কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)
হাদিসটি রাতের শেষভাগে দোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এ সময় একজন মুমিন নিজের ইমানের দৃঢ়তা, পাপের ক্ষমা, হালাল রিজিক, পরিবার-পরিজনের কল্যাণ এবং দুনিয়া-পরকালের সফলতা চাইতে পারেন।
তবে আল্লাহর অবতরণের বিষয়টি তাঁর মহিমার উপযোগী, এর ধরন মানুষের বোধগম্য অবতরণের মতো কল্পনা করা যাবে না।
বিতর নামাজ রাতের ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিতর নামাজ পড়া ওয়াজিব। যে ব্যক্তি শেষ রাতে ওঠার ব্যাপারে নিশ্চিত, তার জন্য রাতের শেষভাগে বিতর আদায় করা ভালো।
৪. বিতর নামাজ আদায়
বিতর নামাজ রাতের ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিতর নামাজ পড়া ওয়াজিব। যে ব্যক্তি শেষ রাতে ওঠার ব্যাপারে নিশ্চিত, তার জন্য রাতের শেষভাগে বিতর আদায় করা উত্তম।
মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা বিতর নামাজকে রাতের শেষ নামাজ বানাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৯৮)
নবীজিও বিতর নামাজ শেষ রাতে আদায় করতেন। আর যার শেষ রাতে জাগতে না পারার আশঙ্কা আছে, সে ঘুমানোর আগে বিতর আদায় করে নেবে। সাহাবি আবু হোরাইরাকে নবীজি ঘুমানোর আগে বিতর আদায় করার উপদেশ দিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৭৮)
প্রতিদিন নিজেকে নিরাপদ রাখতে যে আমল করবেন৫. ইস্তিগফার পড়া
ইস্তিগফার অর্থ ক্ষমা চাওয়া। ইস্তিগফারের নির্ধারিত জিকিরও রয়েছে, যেমন—আস্তাগফিরুল্লাহ। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা রাতের শেষভাগে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
আল্লাহ-তাআলা মুত্তাকিদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটাত এবং রাতের শেষভাগে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা যারিয়াত, আয়াত: ১৭–১৮)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর সাহ্রির সময় তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭)
এ আয়াতগুলোতে শেষ রাতে ইস্তিগফার পাঠের বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে।
হাদিসে আছে, রাতে ঘুম থেকে জেগে আকাশের দিকে তাকাতেন এবং সুরা আলে ইমরানের শেষ ১০টি আয়াত পাঠ করতেন। এরপর অজু করে নামাজ আদায় করতেন।৬. সুরা আলে ইমরানের ১০ আয়াত পাঠ
রাতের শেষভাগে ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর রাসুল (সা.) প্রথমে আল্লাহর স্মরণে মশগুল হতেন।
হাদিসে আছে, রাতে ঘুম থেকে জেগে আকাশের দিকে তাকাতেন এবং সুরা আলে ইমরানের শেষ ১০টি আয়াত পাঠ করতেন। এরপর অজু করে নামাজ আদায় করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৩)
ঘুম থেকে ওঠার পরপরই আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিয়োজিত করা নবীজির সুন্নত। দিনের শুরুটা যেমন আল্লাহর আনুগত্য দিয়ে করা উচিত, তেমনি রাতের ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার মুহূর্তটিও জিকির ও ইবাদতের মাধ্যমে অর্থবহ করে তোলা যায়।
৭. পরিবারকে ইবাদতে উৎসাহিত করা
মহানবী (সা.) নিজে যেমন রাতের ইবাদতে যত্নবান ছিলেন, তেমনি পরিবারকেও অংশ নিতে বলতেন। বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৪)
হাদিসে রমজানের শেষ দশকের বিশেষ আমলের কথা বলা হলেও পরিবারকে ইবাদতে উৎসাহিত করার যে শিক্ষা রয়েছে, তা অন্য সময়ের জন্যও প্রাসঙ্গিক।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা