জেন্ডার বাজেটের প্রকৃত বাস্তবায়ন জরুরি 

· Prothom Alo

ইইউর সহায়তায় একশনএইড বাংলাদেশের ‘সুশীল’ প্রকল্প ও প্রথম আলো এ বৈঠকের আয়োজন করে। 

নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে জেন্ডার বাজেট করা হয়। তবে দেশে সরকার সরাসরি জেন্ডার বাজেট না করে জেন্ডার–সংশ্লিষ্ট বাজেট তৈরি করছে। এ অর্থবছরে ৬১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ বাজেট করলেও প্রশ্ন উঠছে জেন্ডার বাজেট নারীর জীবনে কতটুকু পরিবর্তন নিয়ে আসছে। জেন্ডার বাজেটের প্রকৃত বাস্তবায়নের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ বাজেটের সুফল পেতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি নারীর নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার ‘জেন্ডার বাজেট: নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা ও অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শিরোনামের গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা।

Visit palladian.co.za for more information.

 ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় একশনএইড বাংলাদেশের ‘সুশীল’ প্রকল্প ও প্রথম আলো রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করে। 

বৈঠকে ‘জেন্ডার বাজেট, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও নাগরিক অগ্রাধিকার’ বিষয়ে মূল ধারণাপত্রে বলা হয়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পাস হয়। এর মধ্যে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৯ কোটি টাকা জেন্ডার–সংশ্লিষ্ট বাজেট, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এই হার আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সমতা, ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা, সরকারি সেবায় নারীর প্রবেশগম্যতা—এসব থিম অনুসারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন–ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যয়ই ৯২ শতাংশ, উন্নয়ন বরাদ্দ মাত্র ৮ শতাংশ। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়, জেন্ডার–সংশ্লিষ্ট সরাসরি সেবা ও কর্মসূচির জন্য কতটা ব্যয় থাকছে।

বরাদ্দ বাড়লেও এখনো অপ্রতুল

অনুষ্ঠানে বিএনপির সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মাহমুদা হাবিবা বলেন, জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও এখনো তা অপ্রতুল। বরাদ্দ প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটাও দেখা দরকার। তিনি বলেন, একটি পরিবার থেকে যদি ছেলেসন্তানকে জেন্ডার সংবেদনশীল করে গড়ে তোলা না হয়, তাহলে সেই ছেলেসন্তান বড় হয়ে দায়িত্ব পালনকালে ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হতে পারবে না। নারীর প্রতি বৈষম্য কমাতে সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে এত বেশি পরিবর্তন দরকার যে রাতারাতি প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাভ নেই। সবার সহযোগিতা না পেলে সরকারের একার পক্ষে কিছু করার থাকবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, জেন্ডার বাজেটের প্রকৃত চিত্র জানতে শুধু বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরাদ্দ নির্ধারণের পদ্ধতি ও বাস্তবায়নের ফলাফলও মূল্যায়ন করতে হবে। এ জন্য মন্ত্রণালয়গুলোয় প্রশিক্ষিত ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা, জেন্ডার-বিভাজিত তথ্য এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ আবাসন, পরিবহন ও মানসম্মত দিবাযত্ন কেন্দ্র নিশ্চিত করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা, বৈষম্যমূলক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগও জেন্ডার বাজেটে গুরুত্ব পেতে হবে।

বাংলাদেশ নলেজ হাবের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জেন্ডার বাজেটের মূল লক্ষ্য হতে হবে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানো। দেশে সরকার জেন্ডার বাজেট না, জেন্ডার–সংশ্লিষ্ট বাজেট তৈরি করছে। তিনি বলেন, শুধু মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ নয়, অঞ্চল ও নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক জেন্ডার বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরতে হবে। এ জন্য জেন্ডার অসমতা পরিস্থিতি ম্যাপিং এবং নিয়মিত পরিবীক্ষণ প্রয়োজন। বরাদ্দের পরিমাণের পাশাপাশি নারীরা কতটা উপকৃত হচ্ছেন, তা মূল্যায়ন করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বাজেটেও জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করা জরুরি।

বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি নারীর নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মী। তিনি বলেন, নারী ক্রিকেটারদের সমান বেতন দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও যৌন হয়রানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে নারীরা খেলাধুলায় নিরুৎসাহিত হবেন। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নারী ও পুরুষ করদাতার তথ্যসহ জেন্ডার-বিভাজিত তথ্য সংগ্রহ জরুরি।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে একশনএইড বাংলাদেশের কর্মসূচি বিভাগের প্রধান কাজী মোরশেদ আলম বলেন, জেন্ডার বাজেটে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা দরকার। তহবিল–সংকটে স্বাস্থ্য বিষয়ে এলাকাভিত্তিক অনেক প্রকল্প কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে সরকার কতখানি বৈষম্য কমাতে পেরেছে, তা দেখা দরকার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা বলেন, সরকারি–বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার সংবেদনশীলতা বিষয়ে আলোচনা ও প্রশিক্ষণ জরুরি। মেয়েদের জন্য কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিন রাজনীতিবিদের কথা

বৈঠকে প্রবীণ, নবীন তিন রাজনীতিবিদ উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এ সময়ে নারীর মধ্যে বড় একটি অংশ নিজেকে ঘরবন্দী করে রাখছে। নারীর চিন্তাজগতের পরিবর্তনের ধারা নিয়েও আলোচনা করা দরকার। 

অল্টারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন বলেন, জেন্ডার বাজেটের সুফল পেতে বাল্যবিবাহ, কিশোরী মাতৃত্ব ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। সাইবার জগতে নারীকে নিরাপদ রাখার জন্য বিশেষায়িত ইউনিট করা দরকার। 

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, সন্তান পালন ও রান্না করা নারীর কাজ উল্লেখ করে নারীর কাজের প্রতি একধরনের উপেক্ষা করা হয়। এ ধরনের কাজের সামাজিক মূল্য দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা জীবনমুখী ও কর্মমুখী করা প্রয়োজন। 

জেন্ডার বাজেটের বরাদ্দ নিয়ে তথ্য প্রকাশের আহ্বান

বৈঠকে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ‘সমষ্টি’র নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুর জামান। এ সময় সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রান্তিক ও জেন্ডার বৈচিত্র্যের মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও বরাদ্দ নিশ্চিত করা দরকার। সচেতনতা, সামাজিক রীতি পরিবর্তন ও স্থানীয় সহায়তায় আলাদা প্রতিরোধ বাজেট দরকার। 

এ সময় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুই প্রতিনিধি বিএনকেএসের নির্বাহী পরিচালক হ্লা চিং মারমা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নারীদের জন্য জেন্ডার বাজেটের বরাদ্দ নিয়ে তথ্য প্রকাশ করার আহ্বান জানান। আর দলিত নারী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সনু রানী দাস জেন্ডার বাজেটে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ের আলোচনায় তাঁদের অংশ নেওয়ার সুযোগ চান।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের জেন্ডার ফোকাল শারমিন ইসলাম, বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি সারওয়াত সিরাজ শুক্লা, সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির জেলা সমন্বয়ক নাসরিন মাহমুদ, উইমেন্স উইন্ডোর কর্মসূচি সমন্বয়ক মমতাজ বেগম ও একক আত্মমানবিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল ওয়াহেদ।

অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংস্থার জেন্ডার অধিকার ও সমতা বিভাগের লিড মরিয়ম নেছা।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

Read full story at source