১২ বছরের ক্রীতদাস বালকের হাতে বৈশ্বিক মসলায় পরিণত হয়েছিল ভ্যানিলা

· Prothom Alo

বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক শস্যের মতো ভ্যানিলার গল্পও পৃথিবীর মানচিত্রের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। ভ্যানিলার বাণিজ্যে মাদাগাস্কারের বর্তমান বিশ্বব্যাপী আধিপত্য থাকলেও এর উৎপত্তি সেখানে হয়নি; বরং এর পথচলা শুরু হয়েছিল মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার জঙ্গলে। সেখানে একটি দীর্ঘ প্যাঁচানো লতা বিবর্তিত হয়ে আমাদের সবার পরিচিত ভ্যানিলার সেই বিশেষ সুবাস তৈরি করেছিল। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে।

Visit freshyourfeel.org for more information.

ভ্যানিলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো, এই শতকোটি ডলারের পণ্যটি আজ টিকে আছে ১৮০ বছর আগে ভারত মহাসাগরের এক দূরবর্তী দ্বীপ বুরবোঁয় বাস করা ১২ বছরের এক ক্রীতদাস বালকের কারণে। তবে যে অর্কিড–জাতীয় গাছের ফলে ভ্যানিলার মিষ্টি নির্যাস থাকে, তা মেক্সিকো থেকে সেখানে পৌঁছাতে এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল।

বিবিসি জানায়, ভ্যানিলার বাণিজ্যে বর্তমানে শীর্ষ রয়েছে আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কার। তবে মসলাটির উৎপত্তি সেখানে হয়নি। ভ্যানিলার পথচলা শুরু হয়েছিল মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার জঙ্গলে। এরপর ভ্যানিলা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাসটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।

ভ্যানিলার উৎপত্তি ও দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক সাংবাদিক ও লেখক টিম ইকোট একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘ভ্যানিলা: ট্রাভেলস ইন সার্চ অব দ্য লাশাস সাবস্ট্যান্স’, যা ২০০৪ সালে প্রকাশ হয়। লেখক ভ্যানিলার সন্ধানে মেক্সিকোর পাপান্তলা (যাকে একসময় ‘বিশ্বকে সুবাসিত করা শহর’ বলা হতো) থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরের তাহিতি, মাদাগাস্কার, রিইউনিয়ন ও সেশেলস দ্বীপপুঞ্জের মতো নানা স্থানে ভ্রমণ করেছেন।

কারা প্রথম চাষ শুরু করে

বইয়ে টিম ইকোট বলেন, বর্তমান মেক্সিকোর পাপান্তলা অঞ্চলের টোটোনাক আদিবাসীরা প্রথম ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর লোকগাথা অনুযায়ী, ভ্যানিলা হলো এক দেবীর রক্ত থেকে জন্ম নেওয়া পবিত্র উপহার। ১৫০০–এর শতকে অ্যাজটেক জাতি টোটোনাক আদিবাসীদের পরাজিত করে পাপান্তলা এলাকা জয় করে। বিজিত এলাকা থেকে কর বা উপঢৌকন হিসেবে ভ্যানিলা নেওয়া শুরু করে। অ্যাজটেকরা তাদের চকলেট–জাতীয় বিশেষ ধরনের একটি পানীয়ের স্বাদ বাড়াতে ভ্যানিলা ব্যবহার করত।

এরপরের ইতিহাস ঔপনিবেশিক শাসনের। মেক্সিকোয় স্পেনের অভিযাত্রী এরনান কোর্তেসের নেতৃত্বে ১৫১৯ থেকে ১৫২১ সালের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী অভিযান চালানো হয়। অভিযানে অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এরনান কোর্তেস অ্যাজটেক সম্রাটদের ভ্যানিলা, চকলেটসহ রাজকীয় ফ্লেভারগুলো ব্যবহার করতে দেখেছিলেন। পরে তিনি এগুলো স্পেনে নিয়ে যান।

মাদাগাস্কারের মারোভাতো গ্রামের একটি বাগানে ভ্যানিলা লতা থেকে ঝুলছে একগুচ্ছ কাঁচা ভ্যানিলার শুঁটি। ২০১৯ সালের ২৭ জুন ছবিটি তোলা

আটলান্টিক পার হওয়ার পর ভ্যানিলা দ্রুত নিজস্ব একটি পথ তৈরি করে নেয়। এর অল্প সময়ের মধ্যে রানি প্রথম এলিজাবেথ ও ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের রাজকীয় খাবারে ভ্যানিলা যুক্ত হয়ে যায়। সেখান থেকে ভ্যানিলা ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে যায়। তত দিনে ভ্যানিলা বিশ্বব্যাপী মসলা–বাণিজ্যে প্রবেশ করে। ইউরোপীয়দের এই মসলা–বাণিজ্য বিশ্বজুড়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিচ্ছিল। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ভ্যানিলার কলম বা কাটিং সংগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।

সাংবাদিক টিম ইকোট লিখেছেন, মেক্সিকোয় স্প্যানিশ উপনিবেশের বাইরে ভ্যানিলা চাষের চিন্তা শুরু করে অন্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো। ১৬০০ ও ১৭০০–এর দশকগুলোয় ভারতে ব্রিটিশরা, ভারত মহাসাগরের উপনিবেশগুলোয় ফরাসিরা, জাভায় ডাচরা (নেদারল্যান্ডস) এবং ফিলিপাইনে স্প্যানিশরা এটি রোপণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কেউ সফল হয়নি। ইউরোপীয়রা গাছ রোপণ করত, তারা দেখত গাছ বড় হচ্ছে এবং ফুলও ফুটছে, কিন্তু কখনো ফল ধরছে না।

৩০০ বছরের চেষ্টা

৩০০ বছর ধরে ইউরোপীয়রা চেষ্টা করেও নিজেদের দেশে বা কলোনিগুলোয় ভ্যানিলা–গাছে ফল (বিন) ধরাতে পারছিল না। ফুল ফুটলেও ফল হতো না। এর কারণ ছিল ভ্যানিলা ফুলের পরাগায়ন কেবল মেক্সিকোর বিশেষ এক প্রজাতির স্থানীয় মৌমাছি ও পাখি করতে পারত, যা অন্য দেশে ছিল না।

মেক্সিকান ভ্যানিলার ওপর স্প্যানিশ একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে তৎপর ছিলেন ভারত মহাসাগরের ‘বুরবোঁ’ (বর্তমানে রেউনিওঁ) দ্বীপের শ্বেতাঙ্গ ফরাসি বাগানমালিকেরা। ১৮২২ সালে ইউরোপে প্রথম সফলভাবে বেঁচে থাকা ও ফুল ফোটা ভ্যানিলা–গাছ থেকে কাটিং এনে এই দ্বীপে রোপণ করা হয়। অনেক আশা থাকা সত্ত্বেও কোনো ফল ধরেনি এবং বাগানমালিকেরা অবশেষে পরাজয় মেনে নেন।

মাদাগাস্কারের অন্দাপা গ্রামে এক চাষি একগুচ্ছ কাঁচা ভ্যানিলার শুঁটি প্রদর্শন করছেন। ২০১৯ সালের ২৫ জুন ছবিটি তোলা

অবশেষে একজন ক্রীতদাস বালকের সাফল্য

ইউরোপীয়দের পরাগায়ন–সংকট কাটে কৃত্রিম পরাগায়ন পদ্ধতি আবিষ্কারের পর। ১৮৪১ সালে ভারত মহাসাগরে ফ্রান্সের কলোনি রেউনিওঁ দ্বীপে এডমন্ড আলবিয়াস নামের ১২ বছরের এক ক্রীতদাস ছেলে হাতের সাহায্যে ভ্যানিলা ফুলের পরাগায়ন করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। প্রতিটি ভ্যানিলা অর্কিডের পুরুষ ও স্ত্রী উভয় অংশই থাকে, যা একটি পর্দা বা মেমব্রেন দ্বারা আলাদা করা থাকে, যাতে স্ব–পরাগায়ন না হতে পারে। ছেলেটি একটি ফুল নিয়ে তার আঙুল দিয়ে অর্কিডের পাপড়ির অংশটি সরিয়ে দেয়, একটি ছোট কাঠি দিয়ে পর্দাটি তুলে ধরে এবং স্ত্রী ও পুরুষ অংশ দুটিকে একসঙ্গে চেপে ধরে। এই কৌশলে ফল আসতে শুরু করে।

এই আবিষ্কারের পর ফরাসিরা তাদের কলোনি মাদাগাস্কার, রেউনিওঁ, সেশেলস ও ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ায় প্রচুর ভ্যানিলার বাগান গড়ে তোলে। পরবর্তী সময় এটি ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

রেউনিওঁর সেই সাফল্যের সময়েও মেক্সিকোর চাষিরা ফুলের পরাগায়নের জন্য স্থানীয় মৌমাছির ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু বৈশ্বিক বাজার যখন অন্যান্য দেশের ভ্যানিলায় ছেয়ে যেতে শুরু করে—প্রথমে শুধু রেউনিওঁ, পরে মাদাগাস্কার, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য দেশ, তখন স্থানীয় মেক্সিকান শিল্প প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পারেনি। আজ প্রাকৃতিক ভ্যানিলা শুঁটির বৈশ্বিক বাণিজ্যে মেক্সিকোর উৎপাদন মাত্র ৫ শতাংশ।

১৮০০–এর দশকের শেষের দিকে কৃত্রিম ভ্যানিলা আবিষ্কারের মাধ্যমে এই শিল্প আরও জটিল হয়ে ওঠে, যা এখন বাজারের অধিকাংশ চাহিদা পূরণ করে। বাজারে থাকা ভ্যানিলার মাত্র ১ থেকে ৫ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা থেকে।

প্রাকৃতিক ভ্যানিলার ব্যবসা নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা এখন হাত দিয়ে পরাগায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, যা প্রাকৃতিক পরাগায়নকারীর জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বে চাষ করা প্রতিটি ভ্যানিলা–গাছে এখন হাতেই পরাগায়ন করা হয়, যা এই কাজটিকে অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য করে তুলেছে।

Read full story at source