বাংলা অনুবাদে জ্যামিতির কালজয়ী বই এলিমেন্টস

· Prothom Alo

একটিমাত্র বই, অথচ সেই বইটি দিয়ে কোপার্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও, নিউটন এবং আইনস্টাইন—প্রত্যেকেই প্রভাবিত ছিলেন। আইনস্টাইন বলেছেন, যৌবনে যে এই বই পড়ে অনুপ্রাণিত হননি, তত্ত্বচর্চার জন্য তাঁর জন্ম হয়নি।

Visit betsport24.es for more information.

বইটার নাম এলিমেন্টস। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দের দিকে বইটি লিখেছিলেন গণিতবিদ ইউক্লিড। ১৩ খণ্ডের এই বই প্রথম ছাপায় প্রকাশিত হয় ১৪৮২ সালে। ইংরেজিতে বইটি প্রথম অনুদিত হয় ১৫৭০ সালে। এর প্রায় ৪৩৫ বছর পর, ২০০৫ সালে বইটির প্রথম ৪ খণ্ডের অনুবাদ বাংলায় প্রকাশ করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। অনুবাদ করেন বিজ্ঞানবক্তা আসিফ। আরও প্রায় ২০ বছর পরে বইটির ৬ খণ্ড এক মলাটে প্রকাশিত হলো বাংলা একাডেমি থেকে, একই অনুবাদকের হাত ধরে।

‘এলিমেন্টস’ কথাটা আমাদের কাছে রসায়নবিজ্ঞানের কল্যাণে বহুল পরিচিত। এর অর্থ, মৌলিক পদার্থ। তাহলে ইউক্লিড কেন অমন একটি নাম বেছে নিয়েছিলেন? আসলে, গ্রিক ভাষায় বইটির নাম ছিল ‘স্টোইখেইয়া’—ইংরেজিতে সেটাই অনুবাদ করা হয়েছে ‘এলিমেন্টস’ নামে। এমন নাম বেছে নেওয়ার কারণ, এই বইটি ছিল গণিতের ভিত্তিপ্রস্তর, গণিতের মৌলিক উপাদানের সমারোহ। এই একটি বইয়ের একেকটি খণ্ড আধুনিক গণিত ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। বিষয়টা বুঝতে আমরা প্রতিটি খণ্ডের ব্যাপারে সংক্ষেপে জেনে নিতে পারি। (এখানে ছোট্ট করে ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখি। এই লেখায় জটিল বিষয়গুলোকে আমরা অতিসরলীকরণ করব। এতে সত্যিকার গণিতবিদেরা খানিকটা রাগ করতে পারেন, কিন্তু বোঝার জন্য এটুকু আমরা করছি। মূল বইটিতে এই অতিসরলীকরণের দোষ নেই, কাজেই পর্যালোচনার এই সরলীকরণ কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না বলেই আশা করি।)

সুপারহিরোদের সুপার ফিজিকস
খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দের দিকে এলিমেন্টস বইটি লিখেছিলেন গণিতবিদ ইউক্লিড। ১৩ খণ্ডের এই বই প্রথম ছাপায় প্রকাশিত হয় ১৪৮২ সালে। ইংরেজিতে বইটি প্রথম অনুদিত হয় ১৫৭০ সালে।

এলিমেন্টসের প্রথম খণ্ডে রয়েছে ত্রিভুজ, সমান্তরাল সরলরেখা, সামন্তরিক ক্ষেত্রসহ জ্যামিতির বিভিন্ন মৌলিক বিষয়। এটি যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, তারই ওপর দাঁড়িয়ে আছে বইটির দ্বিতীয় খণ্ড। জ্যামিতিক বীজগণিত বলতে আমরা আজ যা বুঝি, সেসব আলোচিত হয়েছে এই খণ্ডে। সহজ করে উদাহরণ দেওয়ার জন্য আমাদের সবার পরিচিত একটি সূত্রের কথা ভাবা যেতে পারে—(a+b)2 = a2 + 2ab + b2। এটা বীজগণিতের সূত্র, কিন্তু এর একটা জ্যামিতিক ভিত্তি আছে। দুটি রেখাংশ a আর b-কে যোগ করে আমরা যদি একটা বর্গক্ষেত্র আঁকি, সেটার ক্ষেত্রফল হবে a রেখাংশের ওপর আঁকা বর্গ, b রেখাংশের ওপর আঁকা বর্গ এবং a ও b-কে দুই বাহু ধরে আঁকা দুটি আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান (বিষয়টা বোঝার জন্য সঙ্গের ছবিটা দেখতে পারেন)। এই কথাটা পুরোপুরি না বুঝলেও সমস্যা নেই। শুধু এটুকু বুঝলেই চলবে যে বীজগণিতের প্রতিটি সূত্রেরই এরকম একেকটি জ্যামিতিক ভিত্তি আছে। বলা যেতে পারে, এ থেকেই বীজগণিতের সূত্রপাত।

তৃতীয় খণ্ডটি বৃত্ত নিয়ে। বৃত্তবিষয়ক এই জ্ঞান ব্যবহার করেই প্রাচীন পৃথিবীতে স্থাপত্য, মানচিত্র তৈরি এবং নৌ-পথে দিক চেনার চর্চা শুরু হয়েছিল। এমনকি গ্রিক দার্শনিক টলেমির যে পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের মডেল ছিল, তারও ভিত্তি ছিল এই খণ্ডটি। চতুর্থ খণ্ডের আলোচ্য বিষয় বহুভুজ—বিশেষ করে বৃত্তের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন ধরনের বহুভুজ আঁকার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এখানে। স্থাপত্যবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এই খণ্ড। মিসরীয়রা প্রাচীনকালে যে পিরামিড ও বিভিন্ন মানমন্দির বানাত, ইউক্লিড এই খণ্ডে বহুভুজের সেই জ্যামিতিক নীতিগুলোর তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক কাঠামো গড়ে তোলেন প্রথমবারের মতো। তিনি দেখিয়েছিলেন, জ্যামিতি মানে কেবলই বিমূর্ত তত্ত্ব নয়, এটি আমাদের নির্মাণের কৌশল বলে দেয়।

আপেক্ষিকতার গভীরে
মিসরীয়রা প্রাচীনকালে যে পিরামিড ও বিভিন্ন মানমন্দির বানাত, ইউক্লিড চতুর্থ খণ্ডে বহুভুজের সেই জ্যামিতিক নীতিগুলোর তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক কাঠামো গড়ে তোলেন প্রথমবারের মতো।

এলিমেন্টসের পঞ্চম খণ্ডে অনুপাত নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে এসেছে অমূলদ সংখ্যার কথা। এটি অনুপাত তত্ত্বের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। এরই ব্যবহারিক দিক আলোচিত হয়েছে ষষ্ঠ খণ্ডে। আমাদের পরিচিত গোল্ডেন রেশিও—লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি থেকে শুরু করে আধুনিক সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেওয়া এই অনুপাতের ভিত্তি লুকিয়ে আছে এলিমেন্টসের এই খণ্ডেই। আর এই ছয়টি খণ্ডই রয়েছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ইউক্লিডের এলিমেন্টস বইয়ে।

আমরা অবশ্য এখানে থামব না, বাকি খণ্ডগুলোর কথাও সংক্ষেপে জেনে নেব। সপ্তম, অষ্টম ও নবম খণ্ডের মূল আলোচ্য বিষয় সংখ্যাতত্ত্ব। মৌলিক সংখ্যা, জোড়-বিজোড়, ল.সা.গু-গ.সা.গু কিংবা বর্গ বা ঘন সংখ্যার মতো ধারণাগুলো যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সপ্তম খণ্ডে। এরই সূত্র ধরে অষ্টম খণ্ডে এসেছে সূচকীয় বৃদ্ধি বা এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথের ধারণা। এই সূচকীয় বৃদ্ধির ধারণার ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক ব্যাংকিং, বিমা, জনসংখ্যা বৃদ্ধির পূর্বাভাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়।

গণিতে হিরো হতে চাইলে
সপ্তম, অষ্টম ও নবম খণ্ডের মূল আলোচ্য বিষয় সংখ্যাতত্ত্ব। মৌলিক সংখ্যা, জোড়-বিজোড়, ল.সা.গু-গ.সা.গু কিংবা বর্গ বা ঘন সংখ্যার মতো ধারণাগুলো যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সপ্তম খণ্ডে।

আপনি হয়তো জানেন, ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে যে ইন্টারেস্ট পাওয়া যায়, তা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। কথাটার মানে সরল করে এভাবেও বলা যায়—আপনি যে টাকা রেখেছেন, তার ওপর ইন্টারেস্ট তো আসবেই, আবার প্রতি বছর যে নতুন ইন্টারেস্ট যুক্ত হচ্ছে, পরের বছর সেই ইন্টারেস্টের ওপরেও আবার ইন্টারেস্ট আসে। মনে হতে পারে, ইন্টারেস্ট আর কতই-বা? এর ওপর ইন্টারেস্ট এলে আর কীই-বা হয়? কী হয়, সেটা আমরা বুঝতে পারি ব্যাংক থেকে লোন নিলে। ইন্টারেস্টের ওপর ইন্টারেস্ট যুক্ত হয়ে কখন যে ছোট্ট লোন অনেক বড় হয়ে যাও, তা টের পাওয়া কঠিন। উল্টোভাবে আমাদের জমা টাকায় লাভও আসে একই নিয়মে। নবম খণ্ডটি আগের কয়েকটি খণ্ডের ধারণাকে আরও বাড়ায়। মৌলিক সংখ্যার ধারণাকে আরেকটু বাড়িয়ে এটি প্রমাণ করে, এ ধরনের সংখ্যার কোনো শেষ নেই, অর্থাৎ মৌলিক সংখ্যা অসীম।

দশম খণ্ড মূলত অমূলদ রাশি নিয়ে আলাপ করে। গণিত বইতে হয়তো পড়েছেন, প্রমাণ করো যে  একটি অমূলদ সংখ্যা। এই অমূলদ সংখ্যাগুলোর সঙ্গে জ্যামিতির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দশম খণ্ডটি।

ইউক্লিড ও এলিমেন্টস বইয়ের প্রচ্ছদ

এই সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই আমরা জ্যামিতিক বিভিন্ন মৌলিক ধারণা—যেমন বর্গক্ষেত্রের কর্ণ ও বাহুর অনুপাতের মতো বিষয়গুলো জানতে পারি।

একাদশ খণ্ড ত্রিমাত্রিক জ্যামিতি নিয়ে আলোচনা করে। আমরা যে বিভিন্ন বাড়ি-ঘর বা ব্রিজ বানাই, এগুলোর ভার বহনের ক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলোর ভিত্তি গড়ে দিয়েছে এই খণ্ড। আর এর পরের খণ্ডটি মূলত ক্ষেত্রফল ও আয়তনের মধ্যকার আনুপাতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এই খণ্ডে ব্যবহৃত নীতিকে বলা যায় আজকের দিনের ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাসের পূর্বসূরী। তেরোতম খণ্ডটি আগের সব কটি খণ্ডের ধারণা ব্যবহার করে আদর্শ ঘনবস্তু নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি পুরো বইয়ের পরিসমাপ্তি টানে।

অজানা পৃথিবীর খোঁজে
একাদশ খণ্ড ত্রিমাত্রিক জ্যামিতি নিয়ে আলোচনা করে। আমরা যে বিভিন্ন বাড়ি-ঘর বা ব্রিজ বানাই, এগুলোর ভার বহনের ক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলোর ভিত্তি গড়ে দিয়েছে এই খণ্ড।

গাণিতিক পরিভাষা নিয়ে আমাদের মধ্যে একধরনের ভীতি আছে। তাই বইয়ের খণ্ডগুলো নিয়ে এই আলোচনা অনেকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এক কথায় যদি বলি, আধুনিক জ্যামিতি, বীজগণিত, স্থাপত্যবিদ্যা থেকে শুরু করে ব্যাংকিং বা আমাদের গোটা অর্থনীতি—এই সবকিছুরই ভিত্তি হলো এলিমেন্টস। এখানে এটাও বলা প্রয়োজন যে আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের এই শাখাগুলো এখন আর শুধু এলিমেন্টসের জ্ঞানেই আটকে নেই, এখন এগুলোর অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এই সবকিছুর ভিত্তি বা শেকড় যে ওই একটি বই, তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

বইটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। যদিও এই বইয়ের উপপাদ্যগুলো পাঠ্যবইয়ে পড়তে গিয়ে আমরা একটু বিরক্তই হই। কারণটা বোঝাও খুব কঠিন নয়। পিথাগোরাসের উপপাদ্য কী কাজে লাগে, সেটা না জেনে শুধু উপপাদ্যটা বোঝার—কিংবা আরও ভয়ংকর, মুখস্থ করার—কোনো মানে নেই। অথচ আমাদের সেটাই করতে হয় ক্লাসে। যাহোক, এ ব্যাপারে এই সংক্ষিপ্ত লেখায় আর কিছু বলতে চাই না। যে প্রশ্নটি নিয়ে শেষের আগে আলোচনা করতে চাই, তা হলো, এই সবই কি ইউক্লিডের আবিষ্কার? উত্তর হলো, না। এর অনেক কিছুই আগের গণিতবিদদের কাজের সংকলন। ইউক্লিড সেগুলোকে একত্র করেছেন। কিন্তু তাঁর বড় কাজ হলো, তিনি জ্যামিতিকে যুক্তির সুতায় গেঁথেছেন।

অধ্যাপক জামাল নজরুল ও তাঁর বিজ্ঞানী-জীবন
এক কথায় যদি বলি, আধুনিক জ্যামিতি, বীজগণিত, স্থাপত্যবিদ্যা থেকে শুরু করে ব্যাংকিং বা আমাদের গোটা অর্থনীতি—এই সবকিছুরই ভিত্তি হলো এলিমেন্টস।

ইউক্লিডের আগেই মিসরের মানুষ পিরামিড বানিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বলে, তাদের চিন্তা-ভাবনা ও গণিত শুধু সে কালের জীবনের প্রয়োজনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। যে জিনিস তারা চোখে দেখেনি, সে বিষয়টি শুধু চিন্তা ও যুক্তির ভিত্তিতে গাণিতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা মিসরের মানুষ করেনি। ব্যাবিলন ও গ্রিসের মানুষেরা এই চেষ্টাটি বেশ খানিকটা এগিয়ে নিয়েছিল বটে, কিন্তু ইউক্লিডই প্রথম জ্যামিতিকে কালের ঊর্দ্ধে তুলে নিয়েছেন, যুক্তির ভিত্তিতে জ্যামিতি ও গণিতকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীরা পরে স্থান-কালের জ্যামিতিকে পৃথিবীর ভূমির পরিমাপের বদলে মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এটাই ইউক্লিডের বড় মাহাত্ম্য। আর সংকলনের পাশাপাশি তাঁর মৌলিক অবদান যেসব প্রমাণ—সেগুলোর কথা আলাদা করে না বললেও চলে।

বিজ্ঞানবক্তা আসিফ এই বইয়ের অনুবাদ করতে গিয়ে ইউক্লিডের মূল দর্শনটি অটুট রেখেছেন। তিনি প্রতিটি উপপাদ্য বা সম্পাদ্যকে তার আগে ব্যাখ্যা করে আসা বিষয়গুলো ব্যবহার করে যতটা সম্ভব সহজভাবে হাজির করেছেন এবং প্রমাণ দেখিয়েছেন। তারপরেও গণিতের সুনির্দিষ্ট পরিভাষাগুলো দেখে একটু কঠিন মনে হতেই পারে। সত্যি বলতে, এটা তো জনপ্রিয় ধারার বিজ্ঞান বইও নয় যে কয়েক বসায় পড়ে ফেলা যাবে। একটু সময় নিয়ে ভেবে ভেবে বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে পড়ে গেলে বইটি যে নিজেই পড়ে বোঝা যায়, এটা এই অনুবাদের (এবং অনুবাদকের) অন্যতম বড় সফলতা। আরেকটি ভালো বিষয়, প্রতিটি খণ্ডের শুরুতে ওই খণ্ডের আলোচ্য বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। এই খণ্ডটি আমাদের জীবনে কী ভূমিকা রাখছে, এই বিষয়গুলোও আলাদাভাবে বলা হয়েছে। এতে আগ্রহী পাঠক সহজেই জ্যামিতির রাজ্যে পা রাখতে পারবেন।

মহাবিশ্বের মহাকাব্য
আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীরা পরে স্থান-কালের জ্যামিতিকে পৃথিবীর ভূমির পরিমাপের বদলে মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এটাই ইউক্লিডের বড় মাহাত্ম্য।

তবু বইটি পড়তে গিয়ে কিছু সমস্যার মুখে পড়তে হয়। এর একটি হলো, বইটিতে ছবির ক্যাপশন এবং মূল লেখাকে মাঝেমধ্যেই আলাদা করা যায় না। পৃষ্ঠার মাঝখানে ছবির নিচে বসানো ক্যাপশন পরের পৃষ্ঠায় এমনভাবে চলে গেছে যে মনে হয় মূল লেখারই অংশ। এতে মাঝেমধ্যে একটু থমকে যেতে হয় বৈকি। এ ব্যাপারে আরেকটু যত্নশীল হওয়ার সুযোগ ও প্রয়োজন—দুটোই রয়েছে। আরেকটি ব্যাপার হলো, টীকা অংশে প্রতিজ্ঞা, সম্পাদ্য বা উপপাদ্যের মতো পরিভাষাগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ ছাড়াও আলোচনা, ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ অংশে (প্রতিটি খণ্ডের শুরুতে এবং বিশেষ করে প্রথম দুটি অধ্যায়ে) আরও নানারকম পরিভাষার ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু এত এত পরিভাষা—এগুলোর জন্য আলাদা করে একটি পরিভাষা অংশ থাকলে পাঠকের জন্য খুব সুবিধা হতো। নাহয় অমূলদ সংখ্যা, অনুপাত, চক্রবৃদ্ধি হার কিংবা ‘প্রতীয়মান হওয়া’র মতো কথার অর্থ বুঝতে প্রায়ই ফিরে ফিরে পেছনে যেতে হয় এবং খুঁজে বেড়াতে হয়।

এসব টুকিটাকি বিষয় বাদ দিয়ে ভাবলে, এলিমেন্টসের ছয়টি খণ্ডকে বাংলায় হাজির করা এবং আগ্রহী পাঠককে ধাপে ধাপে জ্যামিতির মৌলিক বিষয়গুলো বোঝার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য প্রকাশক ও অনুবাদকের সাধুবাদপ্রাপ্য। বাংলা একাডেমি এককালে মৌলিক বিজ্ঞান ও গণিতের এরকম অনেক বই প্রকাশ করত। সাম্প্রতিক সময়ে সেটি অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এলিমেন্টস-এর হাত ধরে সেই পথচলা আবারও শুরু হয়েছে, এবং এরকম বই আরও পাওয়া যাবে, এই আশা রাখি।

আগ্রহী পাঠক বইটি পেয়ে যাবেন বাংলা একাডেমির বিক্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অনলাইন ও অফলাইন বুকশপে।

বাংলার বিজ্ঞানচর্চার চতুর্মাত্রিক খতিয়ান

Read full story at source