হাওরের মাছ, টিলার পান ও সবজির টানে জমজমাট ধোবারহাট

· Prothom Alo

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে যাচ্ছে। গ্রামের মেঠো পথ আর সড়ক ধরে মানুষ চলেছেন একদিকে। কারও মাথায় মাছের ডালা, কারও কাঁধে শাকসবজির বোঝা, কারও হাতে পানের আঁটি। কেউ হাঁস-মোরগ নিয়ে চলেছেন, কেউ আবার একটি-দুটি গরু হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সবার গন্তব্য ধোবারহাট-শমসেরগঞ্জ বাজারে।

Visit sportnewz.click for more information.

মৌলভীবাজার সদর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার সীমান্তে এই বাজার। সপ্তাহে দুই দিন সোম ও বৃহস্পতিবার হাট বসে। বাজারের অর্ধেক পড়েছে শ্রীমঙ্গলের মীর্জাপুর ইউনিয়নে, বাকি অর্ধেক সদরের আপার কাগাবলা ইউনিয়নে। এলাকার সবচেয়ে বড় মোকাম এটি।

১০০ বছরের বেশি পুরোনো এই বাজার হাওর-নদীর মাছ আর স্থানীয় কৃষকের ফলানো সবজি দিয়ে শুরু হয়েছিল। এখনো মাছ আর শাকসবজিই এখানকার প্রধান পণ্য। তবে এর বাইরে শালুক, গাবফল, গাছের চারা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই মেলে এখানে।

বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে নানা জাতের মাছ। গত বৃহস্পতিবার ধোবারহাট-শমসেরগঞ্জ বাজারে

এক হাটে অনেক গলি

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, তখনো হাট পুরো জমেনি। চারদিক থেকে মানুষ আসছেন, গলিতে নিজের জায়গায় পণ্য সাজাচ্ছেন। এর ফাঁকে ফাঁকে চলছে কেনাবেচা।

এই হাটের প্রতিটি গলির একেক রকম। কোনোটিতে শাকসবজি, কোনোটিতে পান-সুপারি। কোথাও কলা, কোথাও হাঁস-মোরগ। কোনো গলিতে মাছ, কোনোটিতে শুঁটকি আর ডিম। আরেক গলিতে বেতের কুলা-ডালাসহ সংসারের নানা জিনিস। হাটের ভেতরে জায়গা না পেয়ে অনেকে বসেছেন সড়কের পাশে। লাল ও সবুজশাক, লাউ-কুমড়া, বেগুন, কচুর মুখি, শিম, ঝিঙে, টমেটো—সবই আশপাশের গ্রামের ফসল।

সড়কের ধারে কয়েকজন টুকরি ভরে কালো শালুক নিয়ে বসেছেন। পাশের হাইল হাওর থেকে তুলে আনা এই ফলের কেজি চাওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা।

হাটের বয়স ঠিক কত, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। স্থানীয় ব্যক্তিদের হিসাবে ১০০ বছরের বেশি। শুরুর জায়গা নিয়েও আছে দুই মত। কেউ বলেন, হাট বসত এখনকার জায়গার পূর্ব দিকে, গোপলা নদীর ওপারে। কেউ বলেন, হাট বসত পশ্চিম দিকে এক টিলার ওপর।

‘আগর জালও নাই, গাবও নাই’

এক বস্তা গাবফল নিয়ে এসেছেন অয়েছ আলী। মৌলভীবাজার শহরের বড়হাট এলাকা থেকে ৪০০ টাকায় একটি গাছের ফল কিনেছেন তিনি। গাবফল ভেঙে হাঁড়িতে জ্বাল দিয়ে কষ বের করা হয়। সেই কষ মাখানো হয় মাছ ধরার জালে।

স্থানীয় কালা মিয়া মনে করিয়ে দেন, গাব বিক্রির সেই দৃশ্য এখন আর আগের মতো নেই। তিনি বলেন, ‘২০-২৫ বছর আগেও টুকরিবোঝাই গাব লইয়া লাইন থাকত। আগর অবস্থা আর এখন নাই। আগর জালও নাই, গাবও নাই।’

হাটের এক পাশে খুঁটিতে বাঁধা কয়েকটি গরু। স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, কোরবানির ঈদের সময় অনেক গরু-ছাগল ওঠে এই হাটে। তাঁর কথায়, এই বাজার সব সময় সবজির জন্যই বেশি পরিচিত। লাউ, লালশাক আর কচুর মুখিই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। পাহাড়ি বিন্নিগ্রাম, শেখের হিজড়া, আদর্শগ্রাম, রায়বানি, চাতল গ্রামে শাকসবজির ফলন বেশি। এখানে খুচরার পাশাপাশি পাইকারি বেচাকেনাও হয়। এলাকার বেশির ভাগ মানুষের আয়ের উৎসই এই সবজি চাষ।

হাটে মানুষের ভিড়। গত বৃহস্পতিবার ধোবারহাট-শমসেরগঞ্জ বাজারে

হাওরের মাছ, টিলার পান

সবজির পাশাপাশি মাছের জন্যও এ হাটের সুনাম রয়েছে। পাশের হাইল হাওর ও গোপলা নদীর মাছ এখনো আসে এই হাটে। সেই মাছের টানে আশপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ এখানে আসেন।

বিকেল হতেই হাওর অঞ্চল থেকে মাছ নিয়ে আসতে শুরু করেন অনেকে। আড়তে নিয়ে নিলামে তোলা হয় পুঁটি, চ্যাং, শোল, বাইম। খুচরা বিক্রেতারা সেই মাছ কিনে হাটেই বসে পড়েন।

হাটের আরেক পরিচয় পান। এলাকার টিলাভূমিতে সেই পুরোনো কাল থেকে পানের চাষ হয়। সবাই এই পানকে চেনেন ‘বাংলা পান’ নামে। চাষিরা গোল করে পানের আঁটি সাজিয়ে এনেছেন। খুচরা পান বিক্রেতা কান্তি লাল ধর (৬০) বলেন, ‘২৫ বছর ধরে আমি এই বাজারও পান বেচি। আমার নিজের দুইটা পানের বরজ আছে।’

আরেক বিক্রেতা অর্জুন দত্ত বলেন, ‘এতা আমরার নিজর ফলাইল পান।’ বিক্রেতারা জানান, অনেক দূর থেকে পাইকারেরা এসে এই হাট থেকে বাংলা পান নিয়ে যান। হাটবারেই পাইকারি বিক্রি হয়।

বস্তাভর্তি গাবফল। গত বৃহস্পতিবার ধোবারহাট-শমসেরগঞ্জ বাজারে

হাট শুরুর জায়গা নিয়ে ভিন্নমত

সড়কের পাশে বসে সবজির চারা বেচছেন লুবন মিয়া। হাটের কাছেই তাঁর নার্সারি। তিনি বলেন, ‘এই বাজার আমরার দাদার দাদার আমলের। প্রতি হাটবারে কম করেও ৩০-৩৫ লাখ টাকার কেনাবেচা হয়।’

হাটের বয়স ঠিক কত, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। স্থানীয় ব্যক্তিদের হিসাবে, ১০০ বছরের বেশি। শুরুর জায়গা নিয়েও আছে দুই মত। কেউ বলেন, হাট বসত এখনকার জায়গার পূর্ব দিকে, গোপলা নদীর ওপারে। কেউ বলেন, হাট বসত পশ্চিম দিকে এক টিলার ওপর। এখন হাটে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে দোকান তিন শতাধিক।

অয়েছ আলীর কথায়, ‘এই হাট আগে বাজারি টিলায় (একটি টিলার ওপর) বসত। এতা (বর্তমান স্থান) সাগর থাকত (বর্ষায় জলমগ্ন)।’

পাইকারি বিক্রির জন্য আঁটি বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে পান। গত বৃহস্পতিবার ধোবারহাট-শমসেরগঞ্জ বাজারে

সপ্তাহে দুদিন হাট

বাজার খোলা থাকে প্রতিদিন, তবে সাপ্তাহিক হাটবার সোম ও বৃহস্পতিবার। এই দুই দিন বাজার জমে ওঠে, বেচাকেনাও বাড়ে। সকাল ছয়টা-সাতটা থেকেই শুরু হয় পাইকারি শাকসবজি ও মাছের বেচাকেনা। সকালের বাজার চলে ১০-১১টা পর্যন্ত, এটা প্রায় প্রতিদিনের চিত্র। হাটবারে দুপুরের পর বাড়তে থাকে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। রাত ১০টা-১১টার পর ধীরে ধীরে দোকানের ঝাঁপ নামতে শুরু করে। তবে এরপরও থেকে যান অনেক ক্রেতা, আর হাটে আড্ডা দেওয়া মানুষ।

শোলপুর গ্রামের পুরুষ মিয়া বলেন, ‘ডেইলি বাজারও পাকানিত আই (ঘুরতে আসি)। খাইখরচ করি। দুই দিন (হাটবার) বাজার বড় অয়। তিনটা থাকি বাজার শুরু অইয়া রাইত ১১টা-১২টা পর্যন্ত চলে।’

সেদিনও সন্ধ্যা নামতেই হাট ফিরে পেল তার পুরোনো চেহারা। চারদিকে জ্বলে উঠল আলো। মানুষের হাঁটাচলা আর কেনাবেচায় সরগরম হয়ে উঠল শতবর্ষী এই হাট।

Read full story at source