রহিম মেকারের পুরোনো ঘড়ি

· Prothom Alo

শহরের এক কোণে, পুরোনো পোস্ট অফিসের গলিতে রহিম মেকারের ছোট্ট ঘড়ির দোকান। নাম ‘সময় ঘড়িঘর’। বয়সের ভারে রহিমের পিঠ সামান্য নুয়ে পড়েছে, কিন্তু চোখের জ্যোতি আর হাতের নিখুঁত কাজে আজও কোনো ভাটা পড়েনি। চল্লিশ বছর ধরে টিক টিক শব্দে চলা শত শত ঘড়ির মাঝখানে বসে তিনি সময়কে আটকে রাখার বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

গল্পটা গত শীতের এক ঝাপসা বিকেলের। ৮-৯ বছরের এক ছোট মেয়ে হাতে একটা অনেক পুরোনো, বন্ধ হয়ে যাওয়া পকেটঘড়ি নিয়ে দোকানে হাজির হলো। ঘড়িটার কাচ ভাঙা, চেইনে কিছুটা মরচে ধরা। মেয়েটি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘দাদু, এই ঘড়িটা কি ঠিক করে দেওয়া যাবে? আমার কাছে বেশি টাকা নেই, শুধু এই কয়টা কয়েন আছে।’

Visit moryak.biz for more information.

রহিম চশমাটা নাকের ওপর থেকে সামান্য নামিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালেন। ঘড়িটা হাতে নিতেই তার হাত দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। ঘড়ির পেছনে খোদাই করা ছিল একটা নাম—‘সুচরিতা, ১৯৭৮’।

রহিম মেকারের বুকের ভেতরটা একমুহূর্তের জন্য যেন খালি হয়ে গেল। এটি তো সেই ঘড়ি, যেটা তিনি পাঁচ দশক আগে নিজের হাতে ভালোবেসে বানিয়ে দিয়েছিলেন একমাত্র বোন সুচরিতাকে। বোন বহু বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তাদের ছেড়ে চলে যায়।

রহিম চোখ সামলে নিয়ে মৃদু হেসে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম কী, খুকি? এই ঘড়িটা পেলে কোথায়?’
মেয়েটি বলল, ‘আমার নাম তনিমা। এটা আমার দাদির ঘড়ি। দাদি খুব অসুস্থ, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুধু এই ঘড়ির টিক টিক শব্দ শুনতে চান। দাদি বলেন, শব্দটা নাকি ওনাকে ওনার হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।’

রহিমের চোখের কোণে অজান্তেই একফোঁটা জল জমে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, তনিমা আর কেউ নয়, তার সেই হারিয়ে যাওয়া বোনের নাতনি! অভাবের তাড়নায় আর অভিমানের অতলে এতগুলো বছর ধরে দুই ভাই-বোনের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

বিলেতফেরত পাত্র

রহিম কোনো কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে ঘড়িটি খুললেন। ভেতরের জংধরা কলকবজাগুলো একে একে পরিষ্কার করলেন, নতুন স্প্রিং বসালেন। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় অবশেষে বন্ধ থাকা ঘড়িটি আবার প্রাণ ফিরে পেল—‘টিক... টিক... টিক...’।
ঘড়িটি তনিমার হাতে তুলে দিয়ে রহিম তার মাথায় হাত রাখলেন। মেয়েটি তার জমানো সব কয়েন টেবিলের ওপর রাখতে গেলে রহিম আলতো করে তা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আজ কোনো টাকা লাগবে না, খুকি। দাদিকে গিয়ে বলো, সময়ের চাকা আবার ঘুরতে শুরু করেছে। আর তাকে বোলো, তার ভাই এখনো প্রতিদিন সময় ঠিক করে অপেক্ষা করছে।’

তনিমা ঘড়িটি নিয়ে হাসিমুখে দৌড়ে চলে গেল। রহিম মেকার দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে ঝাপসা চোখে বহু বছর পর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সূর্যাস্ত দেখতে লাগলেন।

বন্ধু, রায়গঞ্জ বন্ধুসভা

Read full story at source