গাছ থেকে ফল পেড়েই খাওয়া ঠিক, নাকি ধুয়ে খেতে হবে
· Prothom Alo

আজকাল ফেসবুক বা ইউটিউবে ঢুকলেই দেখা যায়, অনেক অনলাইন ফলের ব্যবসায়ী সরাসরি বাগানে দাঁড়িয়ে গাছ থেকে আম, পেয়ারা বা আপেল পেড়ে সঙ্গে সঙ্গে কেটে খাচ্ছেন। ফলের সেই তাজা আর রসালো রূপ দেখে যে কারও ভালো লাগতে বাধ্য! মনে হয়, ইশ, যদি এখনই বাগানে গিয়ে গাছ থেকে পেড়ে তাজা ফল খেতে পারতাম! বা অন্তত ওখান থেকে ফল কিনতে পারতাম!
Visit hilogame.news for more information.
গ্রীষ্মের ছুটিতে ছোট ভাইবোনদের নিয়ে বরই পাড়তে গেলে দেখা যায়, ঝুড়িতে ফল জমার চেয়ে ওদের পেটে যাচ্ছে বেশি! কিন্তু গাছ থেকে পেড়েই সোজা মুখে পুরে দেওয়াটা কি আসলেই নিরাপদ? বাজার থেকে কেনা ফল তো আমরা ধুয়েই খাই, তাহলে বাগানের তাজা ফলের ক্ষেত্রে নিয়মটা কী?
এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জেসিকা ব্র্যান্টলি-লোপেজ নামের একজন রেজিস্টার্ড ডায়াটিশিয়ান ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। চলো তাঁর থেকেই জেনে নিই, গাছ থেকে পেড়েই ফল খাওয়া নিয়ে বিজ্ঞান কী বলছে।
গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়া কি ঠিক
জেসিকার মতে, এককথায় উত্তর না। একটি বরই বা আপেল দেখতে যতই চকচকে আর পরিষ্কার লাগুক না কেন, সেটি খোলা আকাশের নিচে বড় হয়েছে। মাটি, পানি, প্রাণী আর মানুষের হাত থেকে সেখানে নানা রকম ব্যাকটেরিয়া আসতে পারে। তা ছাড়া বাগানে হয়তো নানা রকম কৃষিজ স্প্রে বা কীটনাশকও দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে? তুমি হয়তো মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তে পারো। তাই খাওয়ার আগে শুধু একটু ধুয়ে নিলেই এই ঝুঁকি থেকে বাঁচা যায়।
কালি আর স্বর্ণ দিয়ে যিনি আঁকেন নোবেলজয়ীদের ছবিবড়ই গাছে বসে পাকা বড়ই খাচ্ছে কোকিল। পাখি গাছে বসায় ফলের গায়ে পাখির বিষ্ঠা লেগে থাকতে পারে। ছবিটি খাগড়াছড়ি শহরের আনন্দনগর এলাকা থেকে তোলা।ফলের গায়ে কী কী লুকিয়ে থাকতে পারে
যেহেতু বরই বা যেকোনো ফল বাইরে জন্মায়, তাই এর গায়ে অনেক কিছুই লেগে থাকতে পারে। যেমন,
মাটি বা ধুলোবালি: বাচ্চারা অনেক সময় খেলতে গিয়ে মাটি মুখে দেয়, কিন্তু আমরা কি জেনেবুঝে মাটি খাব? যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে, মাটির নিজস্ব কোনো ক্ষতিকর দিক না থাকলেও এতে মেশানো রাসায়নিক সার, পরজীবী বা ছত্রাক তোমাকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। আর এগুলো ফলের গায়ে লেগে থাকলেও খালি চোখে তা দেখা যায় না।
পশুপাখির মলমূত্র: ফলের গায়ে পাখির বিষ্ঠা বা অন্য প্রাণীর মলমূত্র লেগে থাকতে পারে। আর এ থেকে জন্ম নিতে পারে রোগজীবাণু। বিশেষ করে পাখির বিষ্ঠা থেকে সিটাকোসিস নামে একটি শ্বাসতন্ত্রের রোগ হতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রোগ বাধানোর জন্য তোমাকে পাখির বিষ্ঠা খেতে হবে না; ফলের গায়ে লেগে থাকা শুকিয়ে যাওয়া বিষ্ঠার ধুলো শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে ভেতরে গেলেই তুমি আক্রান্ত হতে পারো! পোলট্রি ফার্মে কাজ করা কর্মী বা পাখির দোকানে কাজ করা মানুষদের এই ঝুঁকি বেশি থাকলেও, ধুলোমাখা বরইয়ে কামড় বসালে তোমারও এই রোগ হতে পারে।
অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া: শুধু পশুপাখি নয়, মাটি বা পানি থেকেও ফলের গায়ে ব্যাকটেরিয়া আসতে পারে। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির মতে, এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো লিস্টেরিয়া। এটি সাধারণত ফলের বোঁটার কাছে বা নিচের অংশে লুকিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মেয়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, লিস্টেরিয়া পেটে গেলে হজমের মারাত্মক সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের জন্য এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। ২০১৪ সালে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি ক্যারামেল আপেল থেকে লিস্টেরিয়ার এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। কারণ, ক্যারামেলের প্রলেপটি ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছিল। সম্প্রতি তাজা আপেল থেকে এমন প্রাদুর্ভাব না ঘটলেও, সাবধানের মার নেই!
অন্য মানুষের হাতের জীবাণু: ধরো, তুমি এমন একটা বাগানে গেছ, যেখানে প্রচুর মানুষের ভিড়। তোমার আগে হয়তো অনেকেই ফলটা নেড়েচেড়ে দেখেছে কিন্তু পাড়েনি। আপেলের গায়ের মোমের মতো আবরণ আর আর্দ্রতার কারণে সেখানে ফ্লু, শ্বাসতন্ত্রের রোগ বা নোরোভাইরাসের জীবাণু কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। ধোয়া ছাড়া সেই আপেল খেলে পরিণতি কী হবে, তা নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না!
কীটনাশক: বাগানের ফলের গায়ে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে। ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিস্টিকস সার্ভিসের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৭ শতাংশ আপেল চাষি কীটনাশক এবং ৭৫ শতাংশ ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেন। তাই পোকা ও রোগের হাত থেকে বাঁচাতে তোমার পাশের বাগানেও কোনো না কোনো স্প্রে ব্যবহার করার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও একবার কীটনাশক মাখা ফল খেলে তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এগুলো পেটে গেলে ক্যানসার এবং স্নায়বিক নানা জটিল রোগ হতে পারে।
পোকামাকড়: ফলের গায়ে পিঁপড়ে বা ছোট কোনো পোকা হেঁটে বেড়ানো খুব স্বাভাবিক। হয়তো তুমি টোকা দিয়ে সেটা ফেলেও দেবে। কিন্তু তুমি যদি অন্যমনস্ক থাকো আর খেয়াল না করেই পোকা সমেত কামড় বসিয়ে দাও? ব্যাপারটা ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে ওঠে!
ছোটবেলায় ফিট থাকা শিশুরা বড় হয়ে বিষণ্নতায় কম ভোগে, নতুন গবেষণাঅর্গানিক বাগানের ফল কি নিরাপদ
অনেকে ভাবতে পারে, অর্গানিক বাগানে যেহেতু রাসায়নিক কীটনাশক দেওয়া হয় না, তাই সেখানকার ফল সরাসরি খাওয়া নিরাপদ। তবে এটি একটি ভুল ধারণা। অর্গানিক ফলও প্রাণী, মাটি, পানি ও মানুষের সংস্পর্শে আসে। তাই ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকি সেখানেও একই। তা ছাড়া অর্গানিক মানেই যে স্প্রে-মুক্ত, তা নয়; কিছু অনুমোদিত স্প্রে সেখানেও ব্যবহার করা হয়।
না ধুয়ে খেলে কি সত্যিই অসুস্থ হওয়ার ভয় আছে
হ্যাঁ। ফলের গায়ে কী আছে তার ওপর ভিত্তি করে তোমার হালকা পেটব্যথা, বমি বমি ভাব বা ডায়রিয়া থেকে শুরু করে মারাত্মক খাদ্যবাহিত রোগ হতে পারে। কিছু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে যে তোমাকে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হতে পারে। যেহেতু গাছ থেকে পাড়ার সময় তুমি জানো না ফলের গায়ে কী রাসায়নিক বা জীবাণু লেগে আছে, তাই না ধুয়ে খাওয়াটা অনেক বড় ঝুঁকি নেওয়ার শামিল।
বাগানে ফল ধোয়ার সঠিক উপায় কী
খুব সোজা! সাধারণ পানিতে একটু ঘষে ধুয়ে নিলেই ফলের গায়ের নোংরা ও ব্যাকটেরিয়া অনেকটাই দূর হয়ে যায়। এর জন্য কোনো সাবান বা বিশেষ কেমিক্যালের দরকার নেই। সাধারণ পানিই যথেষ্ট। অনেক বাগানেই ফল পাড়ার জায়গায় পানির কল বা বেসিন থাকে। আর না থাকলে বাসা থেকেই একটা পানির বোতল বা ছোট স্প্রে বোতল নিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
তবে এই নিয়ম শুধু গাছে ঝুলে থাকা অক্ষত ফলের জন্য। যদি কোনো ফল মাটিতে পড়ে থাকে, তবে দেখতে হবে তাতে কোনো ফাটা দাগ বা আঘাতের চিহ্ন আছে কি না। জেসিকা সতর্ক করে বলেন, ‘মাটিতে পড়া মানেই যে ফলটা নষ্ট, তা নয়। কিন্তু ফলের খোসা যদি একটুও ফেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তবে সেখান দিয়ে জীবাণু ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায়।’ তাই ফল যদি দেখতে একটুও খারাপ লাগে, তবে তা সেখানেই ফেলে আসা ভালো।
এআইয়ের সাহায্যে হাইকিং প্ল্যান করে পাহাড়ে আটকে পড়ল ১৬ বছরের কিশোর, হেলিকপ্টারে উদ্ধার গাছ থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে ড্রাগন ফল। পাঁচমাইল, খাগড়াছড়ি।সুপারমার্কেটের ফলও কি ধুয়ে খাওয়া জরুরি
অবশ্যই। বাজার থেকে কেনা ফলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। জেসিকা বলছেন, প্যাকিং করার সময় আপেলগুলো ধোয়া হলেও পরিবহন, লোকজনের নাড়াচাড়া বা দোকানে সাজিয়ে রাখার সময় এতে প্রচুর নোংরা ও ব্যাকটেরিয়া লেগে যায়।
এমনকি তুমি যদি আপেলের খোসা ছাড়িয়ে বা কেটে খেতে চাও, তবু কাটার আগে ফলটা ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। কারণ না ধুয়ে কাটলে খোসার ওপর থাকা ব্যাকটেরিয়া ছুরির মাধ্যমে ফলের ভেতরে চলে যেতে পারে।
সব কথার শেষ কথা হলো, গাছ থেকে পেড়ে হোক বা বাজার থেকে কিনে হোক, আপেল বা যেকোনো ফল তোমার বা ছোট ভাইবোনদের মুখের কাছে নেওয়ার আগে অন্তত একটু পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়ার অভ্যাস করলে বড় ধরনের বিপদের হাত থেকে বাঁচতে পারবে।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট
চাপিলা কি ইলিশের বিকল্প হতে পারে