প্রাণীদের চোখে কখনো পৃথিবীটা দেখেছেন
· Prothom Alo

পৃথিবীটা কি সত্যিই শুধু মানুষের? শহরের ব্যস্ত সড়কে ছুটে চলা মানুষের ভিড়, কংক্রিটের উঁচু ভবন, নতুন সড়ক কিংবা শিল্পকারখানার বিস্তার দেখে হয়তো এমনটাই মনে হয়। কিন্তু এই পৃথিবীর গল্পে মানুষ একা নয়। গাছের ডালে থাকা পাখি, মাঠে চরে বেড়ানো গরু, পথের ধারে আশ্রয় খোঁজা কুকুর কিংবা গভীর বনে টিকে থাকার লড়াই করা বন্য প্রাণী—সবাই এই পৃথিবীরই বাসিন্দা।
তবু মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা আর উন্নয়নের দৌড়ে তাদের পৃথিবী প্রতিদিন একটু একটু করে সংকুচিত হচ্ছে। বন কেটে তৈরি হচ্ছে শহর, জলাশয় ভরাট হয়ে উঠছে আবাসন, গাছের জায়গায় দাঁড়াচ্ছে ভবন। আমরা যাকে উন্নয়ন বলছি, একটি পাখির কাছে সেটিই হয়তো হারিয়ে যাওয়া বাসা, একটি বন্য প্রাণীর কাছে হারিয়ে যাওয়া বন, আর পথপ্রাণীর কাছে নিরাপদ আশ্রয়টুকু হারিয়ে ফেলা। এই বাস্তবতায় পৃথিবীকে শুধু মানুষের চোখে নয়, প্রাণীদের চোখ দিয়ে দেখার প্রয়োজন আরও বেশি।
Visit lej.life for more information.
একই পৃথিবীর সহযাত্রী
মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্ক দীর্ঘ। কৃষিকাজ থেকে পরিবহন, খাদ্য থেকে জীবিকা—সভ্যতার বিকাশে প্রাণী বহু ক্ষেত্রেই মানুষের সঙ্গী হয়েছে। আজও গবাদিপশু ও পোলট্রি আমাদের খাদ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মৌমাছিসহ নানা পরাগায়নকারী প্রাণী কৃষি উৎপাদন ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর বন্য প্রাণী? তারা প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাদের অনুপস্থিতি পুরো ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করতে পারে।
বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, জলদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত মানব কর্মকাণ্ডের চাপে আজ অসংখ্য প্রাণী অস্তিত্বের সংকটে। অনেক প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে, অনেক প্রাণী বাধ্য হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক আবাস ছেড়ে মানুষের বসতিতে প্রবেশ করতে। তখন সংঘাত তৈরি হচ্ছে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই এই সংঘাতের শুরুটা প্রাণীদের কাছ থেকে নয়; শুরু হয় তাদের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। তাই প্রাণী রক্ষার প্রশ্নটি এখন আর কেবল দয়া দেখানোর বিষয় নয়। এটি প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্নও।
প্রাণীকল্যাণ থেকে ‘ওয়ান হেলথ’
এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণা। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে আলাদা আলাদা বাক্সে আটকে দেখার সুযোগ নেই। তিনটি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রাণীর স্বাস্থ্য ও কল্যাণের অবনতি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষ ও প্রাণী—উভয়েই নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে। রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ভেটেরিনারি চিকিৎসা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ—সবকিছুর মধ্যেই তাই রয়েছে একটি অভিন্ন যোগসূত্র।
প্রাণীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে সুস্থ রাখা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সুস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ। ওয়ান হেলথের মূল দর্শন তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে প্রাণী ও পরিবেশের সুস্থতার দিকেও সমান নজর দিতে হবে।
শুধু বেঁচে থাকাই কি যথেষ্ট
একটি প্রাণী বেঁচে আছে—এটুকুই কি তার কল্যাণ নিশ্চিত করে? উত্তরটি নিশ্চয়ই ‘না’।
প্রাণীর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ আশ্রয়, রোগ হলে চিকিৎসা এবং অপ্রয়োজনীয় কষ্ট, ভয় ও যন্ত্রণা থেকে সুরক্ষা। পোষা প্রাণী, খামারের প্রাণী কিংবা বন্য প্রাণী—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের স্বাভাবিক প্রয়োজন ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ডিম, দুধ কিংবা মাংস উৎপাদনে শুধু উৎপাদনশীলতার দিকে তাকালেই হবে না। প্রাণীর সুস্বাস্থ্য, পরিচর্যা, উপযুক্ত আবাসন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। কারণ, সুস্থ প্রাণী শুধু ভালো উৎপাদনের সঙ্গেই যুক্ত নয়; এটি নিরাপদ ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
আংটি পরানোর প্রথা কবে শুরু হলোবদলটা শুরু হোক আমাদের থেকেই
বিশ্ব প্রাণী দিবস কেবল ক্যালেন্ডারে চিহ্নিত একটি দিন নয়। এটি আমাদের নিজেদের আচরণ নিয়ে ভাবার একটি সুযোগ।
রাস্তায় পড়ে থাকা একটি অসুস্থ কুকুরকে আমরা কীভাবে দেখি? গাছের ডালে বাসা বাঁধা পাখিটির জন্য আমরা কতটুকু জায়গা রাখি? শহরের উন্নয়নের পরিকল্পনায় জলাশয়, সবুজ এলাকা কিংবা প্রাণীদের চলাচলের পথের কথা কতটা ভাবি? বন্য প্রাণী যখন লোকালয়ে চলে আসে, তখন তাকে শুধু ‘বিপদ’ হিসেবে দেখি, নাকি তার হারিয়ে যাওয়া আবাসস্থলের কথাও ভাবি?
‘তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখা’ মানে হয়তো এই প্রশ্নগুলোই নতুন করে করা।
মানুষের প্রয়োজন অবশ্যই আছে, উন্নয়নও প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি অন্য প্রাণের অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করে, তবে তাকে টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না। আমরা যে পৃথিবীকে নিজেদের বলে দাবি করি, সেই পৃথিবী আসলে অসংখ্য প্রাণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া একটি বাসস্থান। সেখানে মানুষের যেমন বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তেমনি অন্য প্রাণেরও আছে বেঁচে থাকার, নিরাপদে থাকার এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রয়োজন। তাই পরিবর্তনের শুরুটা হতে পারে খুব ছোট কিছু আচরণ থেকে—একটি প্রাণীকে অকারণে কষ্ট না দেওয়া, পথপ্রাণীর প্রতি সহমর্মী হওয়া, পাখির জন্য একটু জল রাখা, গাছ ও জলাশয় রক্ষা করা, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস না করা।
প্রাণীদের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করা মানে মানুষের জন্যও একটি নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করা। তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে একবার দেখেই না হয় শুরু হোক আমাদের নতুন করে পৃথিবীকে চেনা।
শিক্ষার্থী, ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
দর্শক কেন আপনাকে শুনবে? ভালো উপস্থাপক হওয়ার পাঠ