পুরান ঢাকার সরকারি এই ভবনের ছাদে পাখিদের জন্য ‘আকাশনীড়’
· Prothom Alo

পুরান ঢাকার জনসন রোডের তিনতলা একটি ভবনে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ভবনটির চারপাশে উঁচু উঁচু দালান। ফাঁকফোকরে কিছু গাছপালা আছে।
ইটপাথরের এই এলাকাতে সকাল ও সন্ধ্যার আগ দিয়ে আকাশে চিল, কবুতরসহ নানা পাখি ওড়াউড়ি করে। এখানে বানরেরও দেখা মেলে মাঝেমাঝে।
Visit newsbetting.cv for more information.
বিশেষ করে এই পাখিদের ‘আমন্ত্রণ’ জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভবনের ছাদের আয়তন প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট। ছাদটি এতদিন ফাঁকাই ছিল। তবে এখন সেখানে ফল-ফুলের গাছ, পাখিদের তৃষ্ণা মেটানোর ব্যবস্থা, গা-ভেজানোর জন্য ছোট জলাধারসহ নানা আয়োজন রাখা হয়েছে।
ছাদবাগানে এসেছে কিছু পাখিএই আমন্ত্রণে পাখিরা সাড়া দেবে, সেই অপেক্ষায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মরতরা।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ছাদে গিয়ে পাখিদের দেখা মেলেনি। তবে একটি বানরকে নির্ভয়ে ছাদ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেল।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভবনের ছাদের আয়তন প্রায় ১১ হাজার বর্গফুট। ছাদটি এতদিন ফাঁকাই ছিল। তবে এখন সেখানে ফল-ফুলের গাছ, পাখিদের তৃষ্ণা মেটানোর ব্যবস্থা, গা-ভেজানোর জন্য ছোট জলাধারসহ নানা আয়োজন রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা বললেন, অন্য সময় পাখি, বেজি, খরগোশ, কাঠবিড়ালির ও বানরের দেখা এখানে মেলে। তবে এখন মানুষের উপস্থিতি দেখে হয়তো এগুলো আসতে ভয় পাচ্ছে। তা ছাড়া ফুল-ফলের গাছগুলো এখনো সেভাবে বড় হয়নি। গাছে তেমন একটা ফলও নেই। মধু, ফল ছাড়াও এখানে এলে যে খাবার পাওয়া যাবে, তা হয়তো ওরা এখনো জানে না।
অবশ্য পরের দিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পাঠানো ভিডিও ফুটেজে দেখা গেল, আশপাশ থেকে কিছু পাখি ছাদবাগানে এসেছে। তারা ছাদে খাবার খাচ্ছে।
ছাদবাগানের গাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে‘পাখির রাজ্যে স্বাগতম’—এই স্লোগান সামনে রেখে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভবনে বানানো হয়েছে ছাদবাগান। ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি এই ছাদবাগানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আকাশনীড়’।
ফরিদা খানম, ঢাকা জেলা প্রশাসকছোটবেলায় গ্রামে বড় হয়েছি। পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনেছি। শহুরে ইটপাথরের নগরীতে সেই কিচিরমিচির হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই কিচিরমিচির ডাক নগরে ফিরিয়ে আনার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিভাগের কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা ‘আকাশনীড়’ উদ্বোধন করেন। জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার সহায়তায় এই উদ্যোগে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোটবেলায় গ্রামে বড় হয়েছি। পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনেছি। শহুরে ইটপাথরের নগরীতে সেই কিচিরমিচির হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই কিচিরমিচির ডাক নগরে ফিরিয়ে আনার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
গাছে ঝোলানো হয়েছে পাখির জন্য কৃত্রিমভাবে তৈরি দুটি বাসাগত ২২ এপ্রিল ঢাকা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নেন ফরিদা খানম। তিনি বলেন, সোলার প্যানেল বসানোর জন্য ভবনের ছাদে গিয়ে দেখেন, পুরোটা ফাঁকা পড়ে আছে। আকাশে পাখির ওড়াউড়ি দেখেন। তখন এই পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় বানানোর বিষয়টি মাথায় আসে। তারপর নগর সবুজায়নের সহায়ক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্রিন সেভারর্সের সার্বিক সহায়তায় পাখিকে প্রাধান্য দিয়ে ছাদবাগানটি করা হয়। এটি একদিন পাখিদের অভয়ারণ্য হবে। পাখিরা নির্ভয়ে এখানে আসবে, খাবে। তবে তার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে।
জেলা প্রশাসন ও গ্রিন সেভার্সের তথ্য বলছে, ছাদবাগানে ৫৮ প্রজাতির মোট ৪১৮টি গাছ লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৯টি ফুলের গাছ। ফলের গাছ ৪১টি।
এই উদ্যোগকে প্রকৃতির কাছে ফেরার একটি ‘ছোট্ট জানালা’ হিসেবে বর্ণনা করেন ঢাকা জেলা প্রশাসক।
ছাদের গাছগুলো ডালপালা ছেড়ে সবুজ হতে শুরু করেছে। সাদা জবা, গোলাপি বাগানবিলাসসহ নানা ফুল ফুটেছে। কামরাঙাসহ কিছু গাছে ফল উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।
জেলা প্রশাসন ও গ্রিন সেভার্সের তথ্য বলছে, ছাদবাগানে ৫৮ প্রজাতির মোট ৪১৮টি গাছ লাগানো হয়েছে।
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভবনের ছাদে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমএখানে বাগানবিলাস, রঙ্গন, টগর, অঞ্জলিকা, হাসনাহেনা, মধুমালতী, জারুল, কৃষ্ণচূড়া, কদম, কামিনী, জবা, রাধাচূড়া, বকুল, কাঠগোলাপ, গন্ধরাজ, মেলাপুটিয়া, নয়নতারা, গোলাপ, কলাবতী, ছাতিম, নাগলিঙ্গমসহ মোট ৩২৯টি ফুলের গাছ আছে। জলজ ফুলের মধ্যে আছে শাপলা ও পদ্ম।
আহসান রনি, প্রধান নির্বাহী, গ্রিন সেভার্সএটি একটি পরিকল্পিত ছাদবাগান। মূল বার্তাটি হচ্ছে, নগরবাসী চাইলেই ছাদবাগানকে পাখির অভয়ারণ্য বানানো যায়। পাখিরা আসবে, গোসল করবে, খাবে—তারপর চাইলে চলে যাবে। চাইলে ছাদে বাসাও বানাতে পারবে।লিচু, কামরাঙা, সফেদা, আম, পেয়ারা, জামরুল, করমচা, জলপাই, লটকন, আমড়া, লেবু, বড়ই, কলা, পেঁপে, চেরি, মালবেরিসহ ৪১টি ফলের গাছ এখানে লাগানো হয়েছে। পাশাপাশি আছে ওষধি নিমগাছ। আরও আছে নাগাচুয়া, পমেলিয়া, পান্তপাদক, এরিকা, চায়না ডল, সাইকাস, পাতাবাহার বাঁশ অর্নামেন্টাল (যা বিভিন্ন কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করবে) গাছ।
ছাদবাগানটি নিয়ে গ্রিন সেভারর্সের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের তিন মাসের একটি চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, গ্রিন সেভারর্সের কর্মীরা এই তিন মাস ছাদবাগানের দেখাশোনা করবেন। এরপর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মীরাই এই দায়িত্ব পালন করবেন।
ছাদটিতে পাখির নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে বাঁশের কৃত্রিম ঝোপঝাড়, পাখির ঘর ও বড় ক্যানোপিযুক্ত গাছের পরিবেশ।
পাখিদের জন্য রাখা হয়েছে জলাধার ও বার্ডস বাথখাঁচায় থাকে-এমন কিছু পাখিও রাখা হয়েছে ছাদে। এই পাখিগুলোর কিচিরমিচির ছাদে বসে শোনা যাচ্ছিল। জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, এগুলো শব্দ শুনে বাইরের পাখিরা আকৃষ্ট হয়ে এখানে আসবে, সেই ধারণা থেকে রেখেছেন। আপাতত এই পাখিরা অন্য পাখিকে আমন্ত্রণ জানানোর কাজটি করবে বলে তাঁরা মনে করছেন।
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের মতে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে নগরের ভবনগুলোর ছাদে সবুজায়নসহ পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারলে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
পাখির জন্য গাছের সঙ্গে রাখা হয়েছে মাটির পাত্রজেলা প্রশাসকের ছাদবাগানে উপস্থিত ছিলেন গ্রিন সেভার্সের প্রধান নির্বাহী আহসান রনি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত ছাদবাগান। মূল বার্তাটি হচ্ছে, নগরবাসী চাইলেই ছাদবাগানকে পাখির অভয়ারণ্য বানানো যায়। পাখিরা আসবে, গোসল করবে, খাবে—তারপর চাইলে চলে যাবে। চাইলে ছাদে বাসাও বানাতে পারবে।
আহসান রনি বলেন, কোনো সরকারিপ্রতিষ্ঠান চাইলে যে নগরের পরিবেশরক্ষা, পাখির জন্য আলাদা করে চিন্তাভাবনা করার কাজটা করতে পারে, তার উদাহরণ ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এই উদ্যোগ। এটি দেখে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানও উদ্যোগ নিতে পারে।
আকাশ নীড়ে পাখিদের ঠিকানা