আসমানীরা কি এখনো রসুলপুরে, নাকি কড়াইলে?

· Prothom Alo

‘সবার জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান’—বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য। প্রতিপাদ্যটি পড়তে গিয়ে মনে পড়ে কবি জসীমউদ্‌দীনের সেই আসমানীর কথা—

Visit newsbetting.club for more information.

‘আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,

রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।

বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,

একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।

একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,

তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।’

এত বছর পর আজ যদি আমরা আসমানীদের খুঁজতে বের হই, কোথায় যাব—রসুলপুরে, নাকি কড়াইলে?

প্রশ্নটি কোনো একজন আসমানীর ঠিকানা খোঁজার নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন, নগরায়ণ ও আবাসনব্যবস্থার প্রশ্ন। রসুলপুরের ভেন্না পাতার ছানি হয়তো বদলেছে; কিন্তু নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ বাসস্থানের সংকট কি বদলেছে?

কড়াইল বস্তিতে আগুন যে বার্তা দিয়ে গেল

আজকের আসমানীদের দেখা মেলে করাইল, সাততলা, ভাসানটেকসহ ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের অনানুষ্ঠানিক বসতিতে। কেউ গৃহকর্মী, কেউ রিকশাচালক, কেউ নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাঁদের শ্রম ছাড়া শহরের দৈনন্দিন জীবন প্রায় অচল। অথচ সেই শহরেই তাঁদের নিরাপদ ও সামর্থ্যের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ বাসস্থানের নিশ্চয়তা নেই। শহর তাঁদের শ্রম গ্রহণ করেছে; কিন্তু তাঁদের বসবাসকে এখনো পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৬ অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগত দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

দুটি নির্দেশনা পাশাপাশি রাখলে আবাসনের প্রশ্নটি শুধু কতটি ঘর বা ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে, সেখানে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্নটি হয়ে ওঠে—মানুষ কোথায় থাকবে, কোথায় কাজ করবে এবং কীভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও অন্যান্য নাগরিক সেবা পাবে।

ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই...

ঘর নির্মাণের পাটিগণিত নয়, নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে মানুষের বাসযোগ্যতাকে বাসস্থান শুধু চার দেয়াল ও একটি ছাদ নয়। এর সঙ্গে নিরাপত্তা, জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যাতায়াত, সামাজিক সম্পর্ক ও মর্যাদা জড়িত। প্রশ্ন হলো—আমরা কি শুধু নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চাই, নাকি বর্তমানে বসবাসকারী মানুষের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আনতে চাই?

করাইলের একজন গৃহকর্মীর কাছে তাঁর বর্তমান বাসস্থানের বড় সুবিধা কাছাকাছি কর্মস্থল। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ঘর তাঁর কর্মস্থলও হতে পারে। শ্রমজীবী মা সন্তানকে পরিচিত প্রতিবেশীর কাছে রেখে কাজে যেতে পারেন। কাছেই বাজার, বিদ্যালয়, চিকিৎসা ও পরিবহন। এসব অদৃশ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও বাসস্থানের অংশ।

তাই নতুন ফ্ল্যাট পেলেই আবাসন সমস্যার সমাধান হয় না। ভাড়া বা কিস্তি, পানি-বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও যাতায়াত মিলিয়ে ব্যয় যদি পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়, একসময় তাকে সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে দিতে হবে।

জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে দেশের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও বসতির সামগ্রিক কাঠামো—কোথায় শিল্প ও কর্মসংস্থান হবে, কোন শহর সম্প্রসারিত হবে এবং কোথায় কৃষিজমি, নদী, জলাভূমি, বন ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা সংরক্ষিত থাকবে।

যে পরিবার ফ্ল্যাট পাওয়ার পর সেই ফ্ল্যাটে থাকার সামর্থ্য হারায়, তার জন্য সেই ফ্ল্যাট আবাসন সমাধান নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই করাইল, সাততলা ও ভাসানটেকের প্রস্তাবিত উন্নয়ন উদ্যোগকে দেখতে হবে। অতীতের বিভিন্ন পুনর্বাসন ও বসতি উন্নয়ন উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের উদ্যোগে শুরু থেকেই সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি। আমরা চাই করাইল, সাততলা ও ভাসানটেকের উদ্যোগ সফল হোক এবং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ঢাকা মহানগরীসহ দেশের অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক বসতির উন্নয়নের কার্যকর মডেল গড়ে উঠুক।

স্লোগান থেকে বাস্তবায়ন পথনকশা: ১০টি করণীয়

প্রথমত, যেখানে সম্ভব বর্তমান স্থানেই বস্তি উন্নয়ন: নিরাপদ স্থানে গড়ে ওঠা বসতিতে মানুষকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে পানি, পয়োনিষ্কাশন, রাস্তা, বিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ঘরের মান উন্নত করতে হবে। স্থানান্তর হবে শেষ বিকল্প।

দ্বিতীয়ত, এক সমাধান সবার জন্য নয়: কোথাও বর্তমান স্থানেই উন্নয়ন, কোথাও বসতির বিন্যাস পুনর্গঠন, কোথাও মাঝারি উচ্চতার আবাসন, আবার কোথাও ঝুঁকির কারণে কাছাকাছি পুনর্বাসন প্রয়োজন হতে পারে। বহুতল ভবন একটি বিকল্প, একমাত্র বিকল্প নয়। নীতিগত সিদ্ধান্তের আগে সব বিকল্পের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও কারিগরি দিকের নির্মোহ তুলনামূলক বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তৃতীয়ত, জমির বন্দোবস্ত ও বসবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে: বস্তি উন্নয়নের শুরুতেই জমির মালিকানা ও ব্যবহারাধিকারের প্রশ্নের সমাধান প্রয়োজন। সরকারি বা সংস্থার জমিতে দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত, ইজারা কিংবা জনগোষ্ঠী বা সমবায়ের অনুকূলে ভূমি ব্যবহারের অধিকার বিবেচনা করা যেতে পারে। ব্যক্তিমালিকানাই একমাত্র সমাধান নয়। যে ব্যবস্থাই নেওয়া হোক, উন্নয়নের পর মূল বাসিন্দারা যেন সেখানে নিরাপদে থাকতে পারেন এবং ভবিষ্যতে উচ্ছেদ বা মূল্যবৃদ্ধির চাপে স্থানচ্যুত না হন, তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

চতুর্থত, আগে অধিকার, তারপর ভাঙা: সাময়িক স্থানান্তরের আগে বাসিন্দাদের নির্ভরযোগ্য তালিকা, অস্থায়ী আবাসন, জীবিকা সুরক্ষা এবং ফিরে আসার লিখিত নিশ্চয়তা প্রয়োজন। ভাড়াটিয়া, নারীপ্রধান পরিবার, অতিদরিদ্র, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষ যেন বাদ না পড়েন।

পঞ্চমত, সাশ্রয়ী আবাসনের হিসাব হতে হবে পরিবারের মোট ব্যয় দিয়ে: শুধু ভাড়া বা কিস্তি নয়; পানি-বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ, অন্যান্য সেবা ও যাতায়াতের খরচও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। আবাসনের ব্যয় মেটাতে গিয়ে খাদ্য, চিকিৎসা বা শিক্ষায় কাটছাঁট করতে হলে সেটি সাশ্রয়ী আবাসন নয়।

ষষ্ঠত, জীবিকাকে আবাসনের কেন্দ্রে রাখতে হবে: কর্মস্থল থেকে দূরে পুনর্বাসন একটি পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় বাজার ও সাশ্রয়ী যাতায়াত তাই আবাসন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সপ্তমত, বস্তিবাসীরা সুবিধাভোগী নন, উন্নয়নের অংশীদার: বসতির মানচিত্র, পরিবার শনাক্তকরণ, আবাসনের ধরন, মহল্লার নকশা, নির্মাণকাজ এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় তাঁদের অর্থবহ অংশগ্রহণ থাকতে হবে। বস্তিবাসীর জন্য পরিকল্পনা নয়; পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে বস্তিবাসীর নেতৃত্বে। বাংলাদেশে জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক বসতি উন্নয়নের যে অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, নতুন উদ্যোগে সেই সঞ্চিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

অষ্টমত, মহল্লা হতে হবে জলবায়ু-সহনশীল ও দুর্যোগ-নিরাপদ: আলো-বাতাস, গাছ ও ছায়া, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি প্রবেশপথ এবং শিশুদের খেলার ও সামাজিক পরিসর নিশ্চিত করতে হবে। সামগ্রিকভাবে প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশকে পরিকল্পনার অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।

নবমত, উন্নয়নের পর মূল বাসিন্দাদের বিতাড়ন ঠেকাতে হবে: সরকারি বিনিয়োগের ফলে এলাকার মূল্য বাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের পরিবার যেন আর্থিক চাপে এলাকা ছাড়তে বাধ্য না হয়, তার আইনি, আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সুরক্ষা প্রয়োজন।

দশমত, বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় আবাসন কর্মসূচি প্রয়োজন: করাইল, সাততলা ও ভাসানটেকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের নগর ও জনপদে বিভিন্ন আয়শ্রেণির জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ঘরের সীমানা ছাড়িয়ে পরিকল্পনা—কিন্তু এই ১০টি করণীয়ই যথেষ্ট নয়। আবাসনসংকট শুধু ঘরের সংকট নয়; এটি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অসম স্থানিক বিন্যাসেরও ফল। এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি হতে হবে জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয়—তিন স্তরের সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা।

জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে দেশের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও বসতির সামগ্রিক কাঠামো—কোথায় শিল্প ও কর্মসংস্থান হবে, কোন শহর সম্প্রসারিত হবে এবং কোথায় কৃষিজমি, নদী, জলাভূমি, বন ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা সংরক্ষিত থাকবে।

আসমানীরা হয়তো শুধু রসুলপুরে নন, শুধু করাইলেও নন। তাঁরা ছড়িয়ে আছেন আমাদের শহর ও জনপদজুড়ে—যেখানে মানুষ শহর গড়েন, অর্থনীতিকে সচল রাখেন, অন্যের ঘর নির্মাণ করেন, অথচ নিজের পরিবারের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ একটি বাসস্থান নিশ্চিত করতে পারেন না।

আঞ্চলিক পর্যায়ে শহর, পৌরসভা, উপজেলা ও গ্রামীণ জনপদকে একটি কার্যকর অঞ্চল হিসেবে পরিকল্পনা করতে হবে। আবাসন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় ঘটিয়ে ছোট ও মাঝারি শহর এবং গ্রামীণ সেবাকেন্দ্র শক্তিশালী করতে হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে ভূমি ব্যবহার, আবাসন, কর্মসংস্থান, পরিবহন, নাগরিক সেবা ও পরিবেশকে একই পরিকল্পনায় আনতে হবে। কোথায় কোন আয়শ্রেণির আবাসন হবে, কোথায় ভাড়াভিত্তিক আবাসন প্রয়োজন এবং কোথায় বর্তমান বসতির উন্নয়ন হবে—এসব স্থানীয় পরিকল্পনায় নির্ধারিত হতে হবে।

সহজ করে বললে, জাতীয় পরিকল্পনা বলবে দেশ কোন দিকে যাবে; আঞ্চলিক পরিকল্পনা বলবে কোন অঞ্চলে কোন উন্নয়ন কোথায় হবে; আর স্থানীয় পরিকল্পনা নির্ধারণ করবে মানুষ বাস্তবে কোথায় এবং কীভাবে বসবাস করবে।

কিন্তু বাস্তবায়ন করবে কে?

এখানেই আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন—আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কি এই নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত? আবাসন, ভূমি, নগর পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার, পরিবহন, পানি, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। সমস্যা তাই শুধু প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি নয়; বড় সমস্যা দায়িত্বের অস্পষ্টতা, সমন্বয়ের ঘাটতি, বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং জবাবদিহির দুর্বলতা।

প্রয়োজন এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে জাতীয় পর্যায় নীতি, আইন ও অর্থায়নের দিকনির্দেশনা দেবে; আঞ্চলিক পর্যায় উন্নয়নের স্থানিক সমন্বয় করবে; স্থানীয় সরকার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে; আর বাসিন্দারা হবেন পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার অংশীদার।

নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরিই একমাত্র উত্তর নয়। শুরুতেই স্পষ্ট করতে হবে—কার দায়িত্ব কী, সিদ্ধান্ত নেবে কে, অর্থায়ন করবে কে, বাস্তবায়ন করবে কে এবং ফলাফলের জন্য জবাবদিহি করবে কে। ভালো নীতি দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে ভালো ফল দেয় না। তাই সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ও পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং তার সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন পথনকশা শুরু থেকেই থাকতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন কর্মসূচির অর্জন দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করা কঠিন হবে।

মানুষই হোক সাফল্যের মাপকাঠি

কত একর জমির উন্নয়ন হলো, কত কোটি টাকা ব্যয় হলো কিংবা কতটি ফ্ল্যাট নির্মিত হলো—এসব নির্মাণের পাটিগণিত। উন্নয়নের হিসাব অন্য, ১০ বা ২০ বছর পর কতটি মূল পরিবার সেখানে থাকবে? আবাসন ব্যয় কি তাদের সামর্থ্যের মধ্যে থাকবে? জীবিকা কি রক্ষা পাবে? ভাড়াটিয়া ও অতিদরিদ্র মানুষ কি উন্নয়নের অংশ হবেন? করাইলের সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই—আজ যাঁরা করাইলে থাকেন, উন্নয়নের ১০ বা ২০ বছর পরও কি তাঁরাই সেখানে থাকতে পারবেন? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমরা হয়তো জমি, ভবন ও শহরের দৃশ্যপট উন্নত করেছি; কিন্তু মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধান করিনি।

তাই আবার শিরোনামের প্রশ্নে ফিরে আসি—আসমানীরা কি এখনো রসুলপুরে, নাকি করাইলে? আসমানীরা হয়তো শুধু রসুলপুরে নন, শুধু করাইলেও নন। তাঁরা ছড়িয়ে আছেন আমাদের শহর ও জনপদজুড়ে—যেখানে মানুষ শহর গড়েন, অর্থনীতিকে সচল রাখেন, অন্যের ঘর নির্মাণ করেন, অথচ নিজের পরিবারের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ একটি বাসস্থান নিশ্চিত করতে পারেন না।

‘সবার জন্য বাসস্থান’ তাই শুধু স্লোগান নয়—এটি বাস্তবায়নের পরীক্ষা। শুধু ঘর বানালে হবে না; প্রয়োজন মানুষকেন্দ্রিক আবাসন নীতি, জাতীয়-আঞ্চলিক-স্থানীয় সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে সক্ষম, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান।

তবেই ‘সবার জন্য বাসস্থান’ স্লোগান থেকে বাস্তবায়নে যাবে। তবেই হয়তো একদিন আসমানীর ঠিকানা খুঁজতে আমাদের রসুলপুর থেকে করাইলে যেতে হবে না। আসমানীরাও এ দেশেরই নাগরিক। তাঁদের বাদ দিয়ে ‘সবার জন্য বাসস্থান’ যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় সবার বাংলাদেশ বিনির্মাণ। রসুলপুর থেকে করাইল—প্রতিটি আসমানীর নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠুক “সবার জন্য বাংলাদেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—আমরা হতে চাই তার অংশীদার।

  • শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, মখ্য সমন্বয়ক, স্থানিক পরিকল্পনা এবং সহসভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source